India Economy: বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলির অন্যতম ভারত, অথচ অর্থনীতির আকারের আন্তর্জাতিক তালিকায় এক ধাপ পিছিয়ে এখন ষষ্ঠ স্থানে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের নামমাত্র মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ৩.৯২ ট্রিলিয়ন ডলার বলে জানানো হয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী জাপান ও ব্রিটেন ভারতের উপরে রয়েছে। সম্প্রতি সংসদে কেন্দ্রের তরফে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের এপ্রিল ২০২৬-এর বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ভারতের অর্থনীতি কি সত্যিই দুর্বল হয়ে পড়েছে? নাকি ডলারের তুলনায় টাকার দর পড়ে যাওয়া এবং জিডিপি হিসাবের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণেই বিশ্ব তালিকায় ভারতের অবস্থান বদলে গিয়েছে? দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বিশ্লেষণ বলছে, এই র্যাঙ্কিং পরিবর্তনের পেছনে মূলত দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—নতুন জিডিপি হিসাব এবং টাকা-ডলারের বিনিময়মূল্যের পরিবর্তন।
অর্থাৎ, ‘ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতি’ শিরোনামটি যতটা চমকপ্রদ, তার ভিতরের অর্থনৈতিক গল্পটি তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৫ থেকে ৬ নম্বরে ভারত, আসল ছবিটা কী?
এক সময় ভারত ব্রিটেনকে পিছনে ফেলে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি হয়েছিল। সেই সময় থেকেই জার্মানি ও জাপানকে টপকে আরও উপরে ওঠার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। ২০২২ সালে ভারত ব্রিটেনকে ছাপিয়ে পঞ্চম স্থানে উঠেছিল। পরে ২০২৫ সালে নীতি আয়োগের তৎকালীন প্রধান নির্বাহী আধিকারিকও দাবি করেছিলেন যে ভারত জাপানকে টপকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পরবর্তী হিসাব সেই ছবিকে বদলে দেয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল যখন বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির আকার তুলনা করে, তখন শুধু দেশের নিজস্ব মুদ্রায় জিডিপি দেখে না। সেই জিডিপিকে মার্কিন ডলারে রূপান্তর করা হয়। ফলে দেশের অর্থনীতি নিজস্ব মুদ্রায় বাড়লেও, সেই সময়ে মুদ্রার দর যদি ডলারের তুলনায় কমে যায়, তাহলে ডলারে হিসাব করা অর্থনীতির আকার প্রত্যাশার তুলনায় ছোট দেখাতে পারে।
ভারতের ক্ষেত্রেও সেটিই বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালে ভারতের অর্থনীতির ডলারে মূল্যায়ন প্রায় ৩.৯২ ট্রিলিয়ন ডলার। ব্রিটেনের তা প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন এবং জাপানের ৪.৪৪ ট্রিলিয়ন ডলার। ফলে ভারত ষষ্ঠ স্থানে নেমে যায়।
তবে এই র্যাঙ্কিংকে ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সরাসরি দুর্বলতার সমার্থক হিসেবে দেখলে ছবিটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
টাকার দর পড়তেই কেন বদলে গেল ভারতের অবস্থান?
বিশ্বের অর্থনীতির আকার সাধারণত তুলনা করা হয় একটি অভিন্ন মুদ্রায়। সেই মুদ্রা হল মার্কিন ডলার। এখানেই ভারতের জন্য বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে। গত এক বছরে মার্কিন ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার মূল্য কমেছে। ফলে দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও ডলারে রূপান্তর করার পর সেই বৃদ্ধির একটা অংশ হারিয়ে যাচ্ছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতের জিডিপি স্থানীয় মুদ্রায় বাড়লেও নতুন হিসাব এবং বিনিময় হারের পরিবর্তন দুটোই ডলারে প্রকাশিত অর্থনীতির আকারকে প্রভাবিত করেছে। নতুন জিডিপি সিরিজে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের ভারতের জিডিপি আগের হিসাবের তুলনায় কমিয়ে প্রায় ৩৪৫ লক্ষ কোটি টাকা করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, টাকার দরও চাপের মধ্যে ছিল। একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকা ছিল প্রায় ৮৪.৬, যা ২০২৫ সালে প্রায় ৮৮.৫-এ নেমে আসে। অর্থাৎ একই পরিমাণ ভারতীয় অর্থকে ডলারে রূপান্তর করলে আগের তুলনায় কম ডলার পাওয়া যাচ্ছে।
এই কারণেই অর্থনীতির র্যাঙ্কিংয়ে ওঠানামা হয়েছে। তাই ভারতের ষষ্ঠ স্থানে নেমে যাওয়াকে শুধু ‘অর্থনীতি ছোট হয়ে যাওয়া’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
জিডিপির নতুন হিসাবও বদলে দিল পুরনো ছবি
ভারতের অর্থনীতির পরিমাপের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে। নতুন ভিত্তিবর্ষ এবং সংশোধিত হিসাবের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির আকার পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে আগের জিডিপি সিরিজে ভারতের অর্থনীতির আকার কিছুটা বেশি দেখানো হচ্ছিল বলে নতুন হিসাব থেকে ইঙ্গিত মিলেছে।
এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়েও।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আগের হিসাবের ভিত্তিতে ২০২৫ সালে ভারতের জিডিপি প্রায় ৪.১ ট্রিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছিল। নতুন হিসাবের পরে তা প্রায় ৩.৯ ট্রিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। এই পরিবর্তনের ফলে জাপান ভারতের সামনে চলে আসে। একই সঙ্গে টাকার দুর্বলতা এবং ব্রিটিশ পাউন্ডের তুলনামূলক শক্ত অবস্থান ব্রিটেনকেও ভারতের উপরে তুলে দেয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। জিডিপির হিসাব সংশোধন মানেই দেশের কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, মানুষের উৎপাদন কমে যাওয়া বা অর্থনীতির বাস্তব আকার এক ধাক্কায় হারিয়ে যাওয়া নয়। অর্থনীতির পরিমাপের পদ্ধতি পরিবর্তন হলে পুরনো হিসাবের সঙ্গে নতুন হিসাবের পার্থক্য তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তাহলে কি ভারতের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বলা যাবে না। কারণ আন্তর্জাতিক অর্থনীতির র্যাঙ্কিং এবং দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুটি আলাদা বিষয়।
ভারত এখনও বড় অর্থনীতিগুলির মধ্যে অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল দেশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ভারতীয় অর্থনীতির বাস্তব প্রবৃদ্ধি আগামী বছরগুলিতেও শক্তিশালী থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থাৎ একদিকে ভারত ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রবৃদ্ধি এখনও উল্লেখযোগ্য। এই দ্বৈত ছবিটিই এবারের আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
র্যাঙ্কিংয়ে ব্যবহৃত নামমাত্র জিডিপি মূলত অর্থনীতির মোট আর্থিক মূল্যকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের বিনিময় হারে ডলারে প্রকাশ করে। ফলে বিনিময় হার দ্রুত বদলালে র্যাঙ্কিংও বদলাতে পারে। এই কারণে জাপানের মতো বড় অর্থনীতিও বিভিন্ন সময়ে মুদ্রার ওঠানামার কারণে আন্তর্জাতিক তালিকায় উপরে-নিচে হয়েছে।
ভারতের ক্ষেত্রেও তাই বর্তমান ষষ্ঠ স্থানকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের চূড়ান্ত ছবি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
সামনে কি আবার ৪ নম্বরে ফিরবে ভারত?
এখানেই রয়েছে আশার বড় দিক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই পিছিয়ে পড়া দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালে ভারত আবার বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির জায়গায় ফিরে আসতে পারে। তবে জার্মানিকে পিছনে ফেলে তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে ওঠার সম্ভাবনা এখন ২০৩১ সালের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ ভারতের সামনে পথ বন্ধ হয়ে যায়নি, বরং সময়সীমা কিছুটা পিছিয়েছে।
এখানে ব্রিটেন ও জাপানের অর্থনীতির গতিপথও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের অর্থনীতি যদি প্রত্যাশিত হারে বাড়তে থাকে এবং টাকার মূল্য খুব বেশি না পড়ে, তাহলে ডলারে হিসাব করা জিডিপির আকার দ্রুত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জাপান ও ব্রিটেনের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে ধীর হলে ভারত আবার তাদের টপকে যেতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চিন এখনও অনেকটাই এগিয়ে। ২০২৬ সালের পূর্বাভাসে মার্কিন অর্থনীতির আকার প্রায় ৩২.৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার এবং চিনের প্রায় ২০.৮৫ ট্রিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে প্রথম দুই দেশের সঙ্গে পরের সারির অর্থনীতিগুলির ব্যবধান এখনও বিশাল।
৩ নম্বরের দৌড়ে ভারতের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ কোথায়?
ভারতের জন্য এখন শুধু জিডিপির পরিমাণ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি টাকার স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানির মতো ক্ষেত্রগুলিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কারণ বিশ্ব র্যাঙ্কিং যদি ডলারে হিসাব করা হয়, তাহলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মুদ্রার বিনিময় হারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে জিডিপি দ্রুত বাড়লেও যদি টাকা একই সময়ে ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক তালিকায় সেই প্রবৃদ্ধির পুরোটা প্রতিফলিত নাও হতে পারে।
এই কারণে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ার লক্ষ্য পূরণ করতে হলে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার পাশাপাশি মুদ্রা ও সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাও ধরে রাখতে হবে।
#IndiaEconomy #IndianEconomy #IndiaGDP #EconomicGrowth #GlobalEconomy #WorldEconomy #GDPRanking #IndiaNews #EconomicNews












