Imran Khan Hospital Transfer: পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই তাঁকে আদিয়ালা জেল থেকে হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত—এমনটাই জানিয়েছে আপনি যে প্রতিবেদনের সূত্র দিয়েছেন। ইমরান খানের চিকিৎসা নিয়ে পাকিস্তানে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও আইনি টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর ডান চোখের গুরুতর সমস্যাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে তাঁর ডান চোখে কেন্দ্রীয় রেটিনাল শিরা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমস্যা ধরা পড়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ইমরান খানকে হাসপাতালে স্থানান্তরের বিষয়টি শুধু চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর দল দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, তাঁকে আরও উন্নত চিকিৎসা এবং তাঁর পছন্দের চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসার সুযোগ দিতে হবে। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার জানিয়েছে, কারাগারেই চিকিৎসা দেওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দিয়ে পরীক্ষা করানো হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতাল স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
চোখের সমস্যাই এখন মূল উদ্বেগ
ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তাঁর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি। আদালতে জমা দেওয়া একটি প্রতিবেদনে তাঁর ডান চোখে কেন্দ্রীয় রেটিনাল শিরা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এই সমস্যার কারণে তাঁর দৃষ্টিশক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার অভিযোগও সামনে আসে।
চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিতে তাঁকে চোখের বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল। এর আগে ইমরান খানকে ইসলামাবাদের পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চোখের চিকিৎসাও করানো হয়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে তাঁর চোখে চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল যাওয়ার তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছে।
একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তাঁর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি নিয়ে গুরুতর সমস্যা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে পরবর্তী একটি চিকিৎসা-পরীক্ষায় দৃষ্টিশক্তির কিছুটা উন্নতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে ইমরান খানের চিকিৎসা পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে।
কারাগারে চিকিৎসা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক
ইমরান খানের চিকিৎসা নিয়ে পাকিস্তান সরকার এবং তাঁর দল—দুই পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জেলের মধ্যেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দিয়ে তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। এমনকি পাঁচ সদস্যের একটি চিকিৎসক দল আদিয়ালা জেলে গিয়ে তাঁর চোখ পরীক্ষা করেছিল বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে ইমরান খানের দল দাবি করেছে, তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং পরিবারের সদস্যদের যথেষ্টভাবে যুক্ত না করে চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তাঁর দলের পক্ষ থেকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল, ইসলামাবাদে চিকিৎসার দাবি তোলা হয়েছিল।
এই বিরোধের মধ্যেই ইমরান খানকে হাসপাতাল স্থানান্তরের বিষয়টি আদালত ও সরকারের নজরে আসে। স্বাস্থ্য পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে তাঁকে কারাগারের বাইরে চিকিৎসা দেওয়ার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এর আগে একাধিকবার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল
ইমরান খানকে এর আগেও আদিয়ালা জেল থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁর ডান চোখের চিকিৎসার জন্য ইসলামাবাদের পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। চিকিৎসার অংশ হিসেবে চোখে বিশেষ ধরনের ওষুধের ইঞ্জেকশন দেওয়ার কথাও প্রকাশ্যে এসেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তাঁর নিজের অনুরোধের ভিত্তিতেই তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার সংসদে জানিয়েছিলেন, চোখের চিকিৎসাটি কারাগারের হাসপাতালেও করা সম্ভব ছিল, তবে ইমরান খান নিজেই পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।
ফলে এবার হাসপাতাল স্থানান্তরের নির্দেশ নতুন কোনও চিকিৎসা-পর্বের সূচনা করছে, নাকি আগের চিকিৎসারই ধারাবাহিকতা—সেদিকেও নজর রয়েছে।
ইমরানের দল কী দাবি করছে?
ইমরান খানের দল শুরু থেকেই তাঁর চিকিৎসা নিয়ে আরও স্বচ্ছতা দাবি করেছে। দলের বক্তব্য, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং পরিবারের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকরাও আগে উন্নত চোখের চিকিৎসা এবং রেটিনা বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পরীক্ষার দাবি জানিয়েছিলেন। একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, ইমরান খানের চিকিৎসকদের মতে তাঁর চোখের সমস্যার পাশাপাশি অন্যান্য শারীরিক বিষয়ও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ইমরানের দল এই বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রশ্নের পাশাপাশি মানবিক ও সাংবিধানিক অধিকারের বিষয় হিসেবেও তুলে ধরেছে। তাঁদের বক্তব্য, একজন বন্দির ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার থাকা উচিত এবং চিকিৎসার বিষয়ে পরিবার ও ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের ভূমিকা থাকা দরকার।
সরকারের বক্তব্য কী?
পাকিস্তান সরকার অবশ্য জানিয়েছে, ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সরকারি চিকিৎসক দল তাঁর পরীক্ষা করেছে এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এর আগে পাকিস্তানের সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী তারিক ফজল চৌধুরী জানিয়েছিলেন, ইমরান খানকে তাঁর স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং একটি চিকিৎসা বোর্ড গঠন করা হবে। সরকার একই সঙ্গে মানবিক ও আইনি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানিয়েছিল।
তবে চিকিৎসা কীভাবে হবে, কোন হাসপাতালে হবে এবং কারা তাঁর চিকিৎসায় যুক্ত থাকবেন—এই প্রশ্নগুলি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক পুরোপুরি থামেনি।
আদালতের নির্দেশ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ইমরান খানের ক্ষেত্রে আদালতের হস্তক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে অভিযোগ, সরকারি চিকিৎসা এবং উন্নত চিকিৎসার দাবি—সবকিছু একই সঙ্গে সামনে এসেছে। ইসলামাবাদ হাইকোর্টও এর আগে তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার জন্য একটি চিকিৎসা বোর্ড গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল। সেই বোর্ডের রিপোর্টের ভিত্তিতে তাঁকে কারাগারের বাইরে স্থানান্তর করা হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল।
আদালতের নির্দেশে কারা কর্তৃপক্ষকে তাঁর স্বাস্থ্যের বিষয়ে পরিবারকে অবহিত রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে চিকিৎসার পাশাপাশি তাঁর পরিবার ও আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার নিয়েও আদালতের নির্দেশ ছিল।
ফলে শীর্ষ আদালতের হাসপাতাল স্থানান্তরের নির্দেশ ইমরান খানের চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইমরান খানের রাজনৈতিক অবস্থানও নজরে
ইমরান খান ২০২৩ সাল থেকে কারাগারে রয়েছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও সাজা রয়েছে। তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ দীর্ঘদিন ধরে তাঁর মুক্তি এবং উন্নত চিকিৎসার দাবি করে আসছে।
তাই তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে যে কোনও সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। বিশেষ করে হাসপাতালে স্থানান্তরের মতো পদক্ষেপ তাঁর দল, সমর্থক এবং বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিতে পারে।
ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে এর আগেও প্রতিবাদ হয়েছে। তাঁর চিকিৎসা নিয়ে বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে ইসলামাবাদে অবস্থান-বিক্ষোভের কথাও প্রকাশ্যে এসেছিল।
সব মিলিয়ে, আদিয়ালা জেল থেকে হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ ইমরান খানের চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এখন নজর থাকবে—কোন হাসপাতালে তাঁকে নেওয়া হয়, কোন চিকিৎসকরা তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব নেন এবং তাঁর চোখের সমস্যার চিকিৎসায় পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়। একই সঙ্গে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে যে উন্নত ও স্বাধীন চিকিৎসার দাবি তোলা হয়েছে, সেটি কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।













