প্রথম কলকাতা ডিজিটাল ডেস্ক: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে অবশেষে বাড়ি ফিরলেন বসিরহাটের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দম্পতি অনুকূল পোদ্দার ও রেবা রায় পোদ্দার। নেপালে তীর্থযাত্রায় গিয়ে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিলেন তাঁরা। পরিস্থিতি এমনই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে, সামান্য দেরি হলেই তাঁদের গাড়িটিও ভয়াবহ স্রোতের মধ্যে পড়ে যেতে পারত। কিন্তু শেষ মুহূর্তে চালকের সিদ্ধান্তে গাড়ি ঘুরিয়ে নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্তই তাঁদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বসিরহাটের এই দম্পতি কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার উদ্দেশে নেপালে গিয়েছিলেন। ২৬ আগস্ট তাঁরা কাঠমান্ডু থেকে রসুয়াগাধির দিকে যাচ্ছিলেন। গন্তব্য ছিল নেপাল-চিন সীমান্তের দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু পথেই তাঁদের সামনে এমন দৃশ্য আসে, যা মুহূর্তের মধ্যে বদলে দেয় পুরো যাত্রার ছবি। পাহাড়ের দিক থেকে জল নেমে আসতে দেখা যায়, চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় মানুষ ও স্কুলপড়ুয়ারা নিরাপদ জায়গার দিকে ছুটতে শুরু করেন। সেই সময় চালক আর ঝুঁকি নেননি। গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে তাঁদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যান।
পাহাড়ের দিকে নেমে আসছিল জল, আতঙ্কে ছুটছিলেন মানুষ
অনুকূল ও রেবা পোদ্দারের বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁরা একটি গাড়ির বহরের সঙ্গে যাচ্ছিলেন। সকাল সাড়ে ছটা নাগাদ যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রায় দু’ঘণ্টা যাওয়ার পর চালকের নজরে আসে দূরে পাহাড়ের গা বেয়ে জল নেমে আসছে। তার সঙ্গে দেখা যাচ্ছিল সাদা ধোঁয়ার মতো একটি দৃশ্য, যা নদীর দিক থেকে দ্রুত এগিয়ে আসছিল।
প্রথমে বিষয়টি তাঁদের কাছে পরিষ্কার ছিল না। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যায়। স্থানীয় মানুষজন দৌড়োতে শুরু করেন। স্কুলপড়ুয়ারাও নিরাপদ জায়গার দিকে ছুটছিল। শিশুদের কান্না এবং মানুষের আতঙ্ক তাঁদের বুঝিয়ে দেয়, সামনে বড় বিপদ তৈরি হয়েছে।
চালক তখন গাড়িটিকে উঁচু জায়গার দিকে সরিয়ে নিয়ে যান। পরে তাঁদের যাত্রা দলের পরিচালকের কাছে ফোনে খবর আসে যে, সামনে যাওয়ার পথে একটি সেতু হড়পা বানের জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে। ফলে ওই পথে আর এগোনোর কোনও সুযোগ ছিল না। পরিস্থিতি বুঝে তাঁদের দল ফিরে আসে।
অনুকূল পোদ্দার জানিয়েছেন, তাঁদের মূল পরিকল্পনা ছিল ২৭ আগস্ট তিব্বতের দিকে যাওয়া। কিন্তু বিপর্যয়ের কারণে সেই পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়। তাঁরা পরে নেপালের বিরগঞ্জে পৌঁছন এবং সেখান থেকে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করেন।
চালকের এক সিদ্ধান্তেই বদলে গেল যাত্রার পরিণতি
এই যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে চালকের সময়োচিত সিদ্ধান্ত। বিপদের আভাস পাওয়ার পর তিনি গাড়ি নিয়ে আর সামনে এগোননি। বরং দ্রুত গাড়ি ঘুরিয়ে নিরাপদ জায়গার দিকে চলে যান। পরে জানা যায়, তাঁরা যে পথে এগোচ্ছিলেন, সেই পথের একটি অংশ হড়পা বানের জলের তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
অনুকূল পোদ্দারের কথায়, চালক যদি সেই সময় গাড়ি ঘুরিয়ে না নিতেন, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারত। তিনি চালকের দ্রুত সিদ্ধান্তের জন্য কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন। রেবা পোদ্দারও জানিয়েছেন, সেই মুহূর্তে তাঁরা বুঝতে পারেননি বিপর্যয়ের ব্যাপকতা কতটা। কিন্তু স্থানীয়দের ছুটে পালানোর দৃশ্য তাঁদের আতঙ্কিত করে তোলে।
গাড়ি ঘুরিয়ে তাঁদের নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার পর দলটি আবার কাঠমান্ডুর দিকে ফিরে আসে। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষা না করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নেপাল থেকে বিরগঞ্জ, তারপর ট্রেনে দেশে ফেরার পথ
বিপর্যয়ের পর দম্পতিকে নেপালের বিভিন্ন জায়গা পেরিয়ে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে হয়। তাঁরা প্রথমে বিরগঞ্জে পৌঁছন। সেখান থেকে শনিবার সকালে রক্সৌল হয়ে দেশে ফেরার পথে রওনা হন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের বিমানে কলকাতায় ফেরানোর ব্যবস্থার কথাও জানানো হয়েছিল। কিন্তু দম্পতি শেষ পর্যন্ত ট্রেনেই ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।
রবিবার তাঁরা মিথিলা এক্সপ্রেসে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছন। এরপর বসিরহাট থানার পুলিশ তাঁদের সঙ্গে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়। রাজ্য প্রশাসনের ব্যবস্থায় নিরাপদে তাঁদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়। বাড়ি ফেরার পর বসিরহাট পুলিশ তাঁদের স্বাগত জানায়।
দীর্ঘ যাত্রার পর অবশেষে বাড়ি ফিরলেও নেপালের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার আতঙ্ক এখনও তাঁদের মনে রয়েছে। যে যাত্রা ছিল তীর্থযাত্রা, সেটিই একসময় পরিণত হয়েছিল প্রাণ বাঁচানোর লড়াইয়ে।
একই যাত্রায় থাকা আরেক দম্পতি এখনও নিখোঁজ
অনুকূল ও রেবা পোদ্দার নিরাপদে ফিরলেও তাঁদের পরিচিত আরেক বসিরহাটের দম্পতিকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক স্বপন মণ্ডল এবং তাঁর স্ত্রী মৌ মণ্ডলও একই সময়ে নেপালে গিয়েছিলেন। তবে তাঁরা অন্য একটি ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে ছিলেন।
অনুকূল পোদ্দারের সঙ্গে স্বপন মণ্ডলের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। তাঁরা একই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন বলেও জানা গিয়েছে। নেপাল যাওয়ার ক্ষেত্রেও দু’টি দল একই সময়ে কলকাতা থেকে রওনা হয়েছিল। কিন্তু আলাদা ভ্রমণ সংস্থার কারণে তাঁদের যাত্রাপথের ব্যবস্থায় কিছুটা পার্থক্য ছিল।
স্বপন মণ্ডল ও তাঁর স্ত্রী নেপালের বিপর্যয় কবলিত এলাকায় পৌঁছেছিলেন। শেষবার তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের পর থেকে তাঁদের কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফলে অনুকূল ও রেবা পোদ্দার নিরাপদে বাড়ি ফিরলেও তাঁদের পরিচিত ওই দম্পতিকে নিয়ে উদ্বেগ এখনও রয়েছে।
বাড়ি ফিরলেও নেপালের সেই ভয়াবহ দৃশ্য ভুলতে পারছেন না
নেপালের বিপর্যয় থেকে বেঁচে ফেরা বসিরহাটের এই দম্পতির যাত্রাপথে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানই যেন তাঁদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। পাহাড়ের গা বেয়ে জল নেমে আসা, স্থানীয় মানুষ ও শিশুদের আতঙ্কে ছুটে যাওয়া, পথের সেতু ভেসে যাওয়ার খবর—সব মিলিয়ে তাঁদের তীর্থযাত্রা মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত চালকের তৎপরতায় গাড়ি ঘুরিয়ে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছন তাঁরা। পরে নেপাল থেকে বীরগঞ্জ হয়ে রক্সৌল এবং সেখান থেকে ট্রেনে দেশে ফেরেন। রবিবার হাওড়া স্টেশনে পৌঁছনোর পর বসিরহাট পুলিশের সহায়তায় বাড়িতে ফেরেন অনুকূল ও রেবা পোদ্দার।
তাঁদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে পরিবারে স্বস্তি ফিরেছে। কিন্তু একই যাত্রার সঙ্গে যুক্ত স্বপন মণ্ডল ও মৌ মণ্ডলের এখনও কোনও সন্ধান না মেলায় উদ্বেগের ছবিটিও থেকে গিয়েছে। একদিকে দুই মানুষ ভয়াবহ বিপদ পেরিয়ে বাড়ি ফিরেছেন, অন্যদিকে একই এলাকার আরেক দম্পতির খোঁজ এখনও মেলেনি—নেপালের সেই বিপর্যয়ের মধ্যে এই দুই ছবিই পাশাপাশি সামনে এসেছে।
#BasirhatCouple #NepalFlood #AnukulPoddar #RebaRoyPoddar #NepalDisaster #Basirhat #FloodSurvival #NepalPilgrimage
আরও দেখুন :













