Bangladesh Culture: গান, নাটক, বাউল, লোকসংগীত থেকে চিত্রকলা—বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক পরিসর যেন এক গভীর নীরবতার মুখোমুখি। একের পর এক ঐতিহ্যবাহী শিল্পচর্চা থেমে গেলে শুধু শিল্পী নয়, হারিয়ে যেতে পারে বাঙালির বহু প্রজন্মের স্মৃতি, পরিচয়, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।কলমে লেখক,অনলাইন এক্টিভিস্ট এবং রাজনৈতিক কর্মী- সাহিন আরা সুলতানা
একবার ভাবুন তো.. বাংলাদেশে আর কোনো শিল্পী গান গাইছেন না,তৈরী হচ্ছে না কোনো সিনেমা কিংবা নাটক, বন্ধ হয়ে গেছে বাউল গানের আসর, রবীন্দ্র -নজরুল সংগীতের জলসা, ব্যান্ড কনসার্ট, বিলুপ্ত হয়ে গেছে জারি সারি,ভাটিয়ালি ,যাত্রাপালা, গাজীর গান, পালা গান মঞ্চ নাটক, রাস উৎসব,নৌকা বাইচের মতো বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন, ক্যানভাসে রঙের জাদু ছড়িয়ে ছবি আঁকছেন না কোনো চিত্রকর। বিবর্ন সেই বাংলাদেশকে কোন চোখে দেখবে সারাবিশ্ব!!
যারা বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিতে চায়, অন্ধকারে ঠেলে দিতে চায় এবং বিশ্বের কাছে দেশটিকে চরমপন্থী দেশ হিসেবে পরিচিত করতে চায়, তাঁরাই আজ শিল্প সংস্কৃতির পরিবেশ অবরুদ্ধ করে ফেলছে, বন্ধ করে দিতে চাইছে সংস্কৃতির চর্চা। বাংলাদেশের সংস্কৃতি খুবই বৈচিত্র্যময় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক।
আরও পড়ুন : পোড়া বাড়ির নীরব দেয়ালে কি লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের ইতিহাস?
একটি জাতির আত্মপরিচয়, মানবিক চেতনা এবং মননশীলতার প্রধান দর্পণ হলো তার শিল্প-সংস্কৃতি। হাজার বছর ধরে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, পারস্পরিক সৌহার্দ্য এবং পরমতসহিষ্ণুতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে বাঙালি সংস্কৃতি। গান, বাজনা, নাটক, চারুকলা এবং মেলা কিংবা লোকজ উৎসব কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ নয়, বরং তা সমাজকে কূপমণ্ডূকতা থেকে মুক্ত রাখার প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে শিল্প-সংস্কৃতির এই মুক্তাঙ্গন এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। ধর্মীয় উগ্রবাদ, অসহিষ্ণুতা এবং উগ্রপন্থী শক্তির ধারাবাহিক বাধায় আজ সংস্কৃতির চর্চা চরমভাবে সংকুচিত। এই পরিস্থিতি কেবল সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য ভয়ের কারণ নয়, বরং এটি সমগ্র সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের এক অশনিসংকেত।
সাম্প্রতিক সংকটের স্বরূপ ও আক্রমণাত্মক বাস্তবতা
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নানামুখী হামলা এবং বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দেশের ঐতিহ্যবাহী লোকজ উৎসব, মাজার ও উরস শরিফ, বাউল গান, নাটক এবং আধুনিক গানের কনসার্ট উগ্রবাদী গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। তথাকথিত ‘তৌহিদী জনতা’ বা কট্টরপন্থী নানা ধর্মীয় ব্যানারে এক ধরনের সামাজিক সেন্সরশিপ আরোপের চেষ্টা চলছে।
কোথাও প্রশাসনের অনুমতি থাকার পরও উগ্রপন্থীদের হুমকির মুখে শেষ মুহূর্তে কনসার্ট বাতিল করতে হচ্ছে, কোথাও ঐতিহ্যবাহী বাইচ প্রতিযোগিতা বা লোকমেলা বন্ধ করার জন্য মসজিদে বসে ফতোয়া দেওয়া হচ্ছে। এমনকি ছায়ানট বা উদীচীর মতো জাতীয় স্তরের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হামলা, ভাঙচুর ও হুমকির ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। গ্রামীণ জনপদে বাউল বা লোকশিল্পীদের হেনস্থা করা এবং মাজারগুলোতে নিয়মতান্ত্রিক হামলা চালানোর মাধ্যমে লোকসংস্কৃতির মূল শিকড় উপড়ে ফেলার চেষ্টা দৃশ্যমান। এই সুপরিকল্পিত ভীতির সংস্কৃতি আজ সমাজকে গ্রাস করছে।
মনস্তাত্ত্বিক ভয় এবং ‘আত্ম-সেন্সরশিপ’
সংস্কৃতির ওপর আঘাত সবসময় লাঠিসোঁটা বা ভাঙচুরের মাধ্যমে আসে না; এর সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয় মনস্তাত্ত্বিক স্তরে। ক্রমাগত উগ্র হুমকি এবং প্রশাসনের আপসকামী মনোভাবের কারণে শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী এবং আয়োজকদের মধ্যে এক গভীর ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
একজন নাট্য নির্দেশক বা চলচ্চিত্র নির্মাতা এখন স্বাধীনভাবে গল্প বলতে ভয় পাচ্ছেন。
কোনো দূরবর্তী জেলায় গিয়ে গান পরিবেশন করা নিরাপদ কি না, তা নিয়ে একজন সঙ্গীতশিল্পী দ্বিধায় ভুগছেন।
অনুষ্ঠান করলে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে কি না এবং তার ফলে আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতি হবে কি না, সেই আশঙ্কায় হলমালিক বা আয়োজকেরা পিছু হটছেন।
এই মনস্তাত্ত্বিক অবরুদ্ধতা জন্ম দিচ্ছে ‘আত্ম-সেন্সরশিপ’ বা স্ব-নিয়ন্ত্রণের, যা মুক্তচিন্তা ও শৈল্পিক স্বাধীনতার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়।
সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতা ও নৈতিক অবক্ষয়
শিল্প-সংস্কৃতির পথ রুদ্ধ হলে সমাজ কখনো শূন্য থাকে না; সেই শূন্যস্থান পূরণ করে উগ্রতা ও পাশবিকতা। সংস্কৃতির এই চরম সংকোচনের ফলে সামাজিকভাবে আমরা বেশ কিছু ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি:
সংস্কৃতির মূল সুর হলো সহনশীলতা। যখন সংস্কৃতির চর্চা কমে যায়, তখন মানুষের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা লোপ পায়। সামান্য কারণে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা ‘মব কালচার’ (Mob Culture) তৈরি হওয়ার পেছনে এই সাংস্কৃতিক শূন্যতাই দায়ী।
লালন, হাছন, কিংবা জসিমউদ্দীন যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সুর বেঁধেছিলেন, তা আজ খণ্ডিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। লোকউৎসবগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো আমাদের হাজার বছরের লোকজ ইতিহাসের অপমৃত্যু।
উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রধান কৌশল হলো ধর্ম এবং সংস্কৃতিকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে বোঝানো হচ্ছে যে, গান-বাজনা কিংবা লোকসংস্কৃতি ধর্মের পরিপন্থী। অথচ, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাস্তবতা ভিন্ন। এ দেশের মানুষ যুগে যুগে একই সাথে ধর্মপ্রাণ থেকেছে এবং একই সাথে জারি, সারি, কীর্তন, নবান্ন ও বৈশাখী উৎসব পালন করেছে। ধর্ম মানুষের নৈতিকতার শিক্ষা দেয়, আর সংস্কৃতি প্রসারিত করে মানুষের মনন। সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা কখনো ধর্মের বিরোধী নয়, বরং তা মানুষের মধ্যকার পাশবিক প্রবৃত্তি দূর করে প্রকৃত মানবিক গুণসম্পন্ন নাগরিক তৈরিতে সহায়তা করে।
রাষ্ট্র ও প্রশাসনের আপসকামি ভূমিকা
অনেক ক্ষেত্রে উগ্রপন্থীদের হুমকির মুখে প্রশাসন সুরক্ষার ব্যবস্থা না করে উল্টো আইন-শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। এই ধরনের আপসকামিতা উগ্রবাদী চক্রকে আরও বেশি উৎসাহিত করে। যদিও সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়া এক ধরনের ‘অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি’ এবং সরকার সংস্কৃতিচর্চা নির্বিঘ্ন রাখতে আইনি পদক্ষেপ নেবে; তবে মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব প্রতিফলন এখনও দৃশ্যমান নয়। রাষ্ট্রকে তার প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক এবং মৌলিক অধিকার, তথা মতপ্রকাশ ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার পূর্ণ নিশ্চয়তা দিতে হবে।
এই অন্ধকারের পরিবেশ থেকে বের হয়ে আসতে হলে আমাদের বহুমুখী এবং সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, উৎসব বা শিল্পীদের ওপর যারা হামলা বা হুমকি দিচ্ছে, তাদের রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। মব কালচারের মাধ্যমে সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।
তৃণমূল পর্যায়ে সাংস্কৃতিক জাগরণ তৈরি করতে হবে,কেবল রাজধানী বা বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক না রেখে, দেশের প্রতিটি উপজেলা এবং গ্রাম পর্যায়ে নাট্যদল, সঙ্গীত একাডেমি, সাহিত্য ক্লাব এবং লোকজ উৎসবগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।
প্রতিটি স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত বিতর্ক, নাটক, সঙ্গীত প্রতিযোগিতা এবং দেয়াল পত্রিকা প্রকাশের মতো কর্মকাণ্ড বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। শিক্ষার সাথে সাংস্কৃতিক মূল্যের সমন্বয় ঘটাতে হবে।
সুশীল সমাজ, প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ জনগণকে এই উগ্রতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। পাড়ায় পাড়ায় সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে যুব সমাজকে সংগঠিত করতে হবে।
প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক এই পটপরিবর্তন দেশের বিনোদন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা বয়ে এনেছে। দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে যে ধাক্কা লেগেছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিনোদন খাতে। বড় বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট স্পনসর এবং বিজ্ঞাপনদাতারা নতুন প্রকল্পে অর্থ ঢালতে ভয় পাচ্ছেন।
সংস্কৃতি কোনো কৃত্রিম বা ধার করা পোশাক নয় যে কেউ চাইলেই তা ফতোয়া বা লাঠির জোরে খুলে নিতে পারবে। এটি এ দেশের মাটির গভীরে প্রোথিত এক শাশ্বত চেতনা। তবে এই চেতনাকে টিকিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্র এবং সমাজকে আজ এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। উগ্রতার কাছে মাথা নত করলে শেষ পর্যন্ত একটি জাতি হিসেবে আমাদের মেধা, মনন ও বৈচিত্র্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
তাই আজ সময় এসেছে সংস্কৃতির আলো দিয়ে এই সামাজিক অন্ধকারকে দূর করার। শিল্প-সংস্কৃতির মুক্তাঙ্গন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল একটি মানবিক, প্রগতিশীল এবং সাম্যবাদী বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
নেপালে ভয়াবহ বিপর্যয়! নিখোঁজ ১০৫ ভারতীয়, ভেসে গেল গ্রাম থেকে সেতু











