Chicken’s Neck Security: পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তা নিয়ে বড় দাবি করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের এই গুরুত্বপূর্ণ করিডরকে নিরাপদ রাখতে তৈরি করা হয়েছে একটি ত্রিকোণীয় সুরক্ষা গ্রিড। চোপড়া, কিশানগঞ্জ এবং ধূপড়িকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে শিলিগুড়ি করিডরজুড়ে নিরাপত্তা উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শাহের বক্তব্যে উঠে এসেছে সীমান্ত নিরাপত্তা, কাঁটাতার নির্মাণের জন্য জমি, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং শিলিগুড়ি করিডরের পরিকাঠামো শক্তিশালী করার মতো একাধিক বিষয়। পাশাপাশি জমি হস্তান্তর নিয়ে রাজ্য সরকারের পূর্ববর্তী ভূমিকা নিয়েও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করেছেন তিনি। তবে তাঁর বক্তব্যের এই অংশগুলি রাজনৈতিক অভিযোগ ও দাবি হিসেবেই সামনে এসেছে।
শিলিগুড়ি করিডর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
অমিত শাহের বক্তব্য অনুযায়ী, শিলিগুড়ি করিডর এমন একটি সংবেদনশীল এলাকা, যার সঙ্গে ভারতের আটটি রাজ্যের যোগাযোগের বিষয় জড়িত। একইসঙ্গে নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশের সীমান্ত এই অঞ্চলের নিরাপত্তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
এই সরু ভূখণ্ডের মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের যোগাযোগ তৈরি হয়। ফলে এই অঞ্চলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তার প্রভাব শুধু একটি জেলা বা একটি রাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
এই কারণেই কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা একটি কৌশলগত বিষয়। শাহের বক্তব্যে সেই গুরুত্বই বারবার উঠে এসেছে।
কী এই ত্রিকোণীয় সুরক্ষা গ্রিড?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা জোরদার করতে চোপড়া, কিশানগঞ্জ এবং ধূপড়ি—এই তিনটি ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এই তিনটি জায়গা থেকে পুরো করিডরের উপর নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়েছে।
অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট জায়গায় নিরাপত্তা কেন্দ্রীভূত না রেখে করিডরের বিভিন্ন প্রান্তে নিরাপত্তা উপস্থিতি তৈরি করাই এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য বলে শাহের বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে।
তবে এই ‘ত্রিকোণীয় সুরক্ষা গ্রিড’-এর নির্দিষ্ট বাহিনী কাঠামো, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা বা অপারেশনাল পদ্ধতি সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। তাই এই ব্যবস্থার কার্যকরী কাঠামো নিয়ে অতিরিক্ত কোনও দাবি না করে, শাহ যে তিনটি ঘাঁটির কথা বলেছেন, সেটুকুই নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
৫৬০ একর জমি নিয়ে কী বললেন শাহ?
শিলিগুড়ি করিডরকে আরও শক্তিশালী করার প্রসঙ্গে অমিত শাহ জমির বিষয়টিও সামনে আনেন। তাঁর দাবি, ভারতের বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরির জন্য ৫৬০ একর জমি প্রয়োজন ছিল।
এই জমি নিয়ে পূর্ববর্তী রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তোলেন তিনি। শাহের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া যায়নি বলেই সীমান্ত ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছু কাজ আটকে ছিল।
এই প্রসঙ্গে তিনি বর্তমান রাজ্য সরকারের প্রশংসা করেন। তাঁর দাবি, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১১২৯ একর জমি দেওয়া হয়েছে। আরও ২৯ একর জমি বাকি ছিল এবং সেটিও দেওয়ার আশ্বাস পাওয়া গিয়েছে বলে তিনি জানান।
এখানে উল্লেখযোগ্য, জমি সংক্রান্ত এই পরিসংখ্যান এবং পূর্ববর্তী সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি অমিত শাহের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হচ্ছে; সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের পাল্টা বক্তব্য এই তথ্যের মধ্যে নেই।
সীমান্তে কাঁটাতার নিয়েও বড় দাবি
সীমান্ত নিরাপত্তার প্রসঙ্গে অমিত শাহ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন—সীমান্তে কাঁটাতার নির্মাণ। তাঁর বক্তব্য, অনুপ্রবেশ রুখতে সীমান্তে কাঁটাতার অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু জমি সংক্রান্ত সমস্যার কারণে সেই কাজ দীর্ঘদিন বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
শাহের বক্তব্যে এই জমির সমস্যাকে সীমান্ত নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। তাঁর মতে, নিরাপত্তা বাহিনী থাকলেই নিরাপত্তা সম্পূর্ণ হয় না; প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রসঙ্গেই তিনি রাজ্য সরকারের জমি দেওয়ার বিষয়টিকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
শুধু বাহিনী নয়, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের উপরও জোর
শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অমিত শাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন—শুধু সেনা বা নিরাপত্তা সংস্থার উপস্থিতি দিয়ে কোনও এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণও প্রয়োজন।
অর্থাৎ সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ বলে তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত রয়েছে।
এই কারণেই সীমান্ত এলাকার পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নিরাপত্তার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা থাকলে সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পাওয়া এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা সম্ভব—এমন ধারণাই এই বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে।
দিল্লি-শিলিগুড়ি রেল করিডর নিয়েও পরিকল্পনার কথা
শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে অমিত শাহ ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে দিল্লি-শিলিগুড়ি রেল করিডর তৈরির পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেছেন।
এই ধরনের যোগাযোগ পরিকাঠামো তৈরি হলে উত্তরবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হতে পারে। একইসঙ্গে কৌশলগত দিক থেকেও দ্রুত যোগাযোগের পরিকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
তবে এই রেল করিডরের প্রকল্পের বিস্তারিত রুট, সময়সীমা বা নির্মাণের নির্দিষ্ট পর্যায় সম্পর্কে এখানে অতিরিক্ত তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে এই মুহূর্তে এটিকে কেন্দ্রীয় বাজেট-সংক্রান্ত ঘোষণার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
অমিত শাহের বক্তব্যে শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা নিয়ে তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে—ত্রিকোণীয় নিরাপত্তা গ্রিড, সীমান্ত পরিকাঠামোর জন্য জমি এবং কাঁটাতার নির্মাণ। এর পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও নিরাপত্তা পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করেছেন তিনি।
‘চিকেনস নেক’ ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে কেন্দ্রের নজর নতুন নয়। তবে এবারের সফরে ত্রিকোণীয় সুরক্ষা গ্রিডের কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরে অমিত শাহ যে বার্তা দিয়েছেন, তা হল—শিলিগুড়ি করিডরকে নিরাপত্তার দিক থেকে আরও শক্তিশালী করার উপর কেন্দ্র বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
#chickensnecksecurity #siliguricorridor #amitshah #bordersecurity #westbengal #ssb #indiansecurity














