Taslima Nasrin Kolkata Return: প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ নির্বাসন শেষে কলকাতায় ফিরে রবীন্দ্রসদনের মঞ্চ থেকে নিজের জীবনের যন্ত্রণা, নির্বাসনের অভিজ্ঞতা, বাক্স্বাধীনতার লড়াই, বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা এবং মৌলবাদের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে তুলে ধরলেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে একাধিক আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য।
“আগস্ট আমার জন্মের মাস, আগস্ট আমার নির্বাসনের মাস, আর আজ থেকে আগস্ট আমার প্রত্যাবর্তনের মাস”
তসলিমা নাসরিন বলেন,
“আগস্ট আমার জন্মের মাস। আগস্ট আমার নির্বাসনের মাস। আর আজ থেকে আগস্ট আমার প্রত্যাবর্তনের মাস হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
তিনি বলেন, এই প্রত্যাবর্তন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ফিরে আসা নয়, এটি বাক্স্বাধীনতারও এক প্রতীকী বিজয়।
“আজ নির্বাসনের উপর বাক্স্বাধীনতার জয় হল”
দীর্ঘদিন পর কলকাতায় ফিরে তিনি বলেন,
“আজ নির্বাসনের উপর বাক্স্বাধীনতার জয় হল।”
তাঁর কথায়, একজন লেখককে নির্বাসনে পাঠানো যায়, কিন্তু তাঁর চিন্তা, ভাষা এবং লেখাকে কখনও নির্বাসিত করা যায় না।
“রাতের অন্ধকারে আমার নিজের দেশ আমার জন্য দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল”
নিজের নির্বাসনের স্মৃতি তুলে ধরে তসলিমা বলেন,
“রাষ্ট্র আমাকে আমার নিজের দেশ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। রাতের অন্ধকারে আমার নিজের দেশ আমার জন্য দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।”
বাংলাদেশ ছেড়ে আসার সেই বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা স্মরণ করতে গিয়ে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।
“বন্ধ দরজাও চিরকাল বন্ধ থাকে না”
কলকাতায় ফিরে তিনি বলেন,
“ভয় কিংবা অন্যায় কোনোটাই চিরস্থায়ী নয়। বন্ধ দরজাও চিরকাল বন্ধ থাকে না।”
তিনি জানান, যে শহর একদিন তাঁকে বিদায় জানাতে বাধ্য হয়েছিল, আজ সেই শহরই তাঁকে ভালোবাসা ও সম্মানের সঙ্গে ফিরিয়ে নিয়েছে।
“যে শহর আমাকে কাঁদিয়ে তাড়িয়েছিল, আজ সেই শহরই আমাকে মমতায় ফিরিয়ে নিয়েছে”
আবেগঘন কণ্ঠে তসলিমা বলেন,
“যে শহর একদিন আমাকে কাঁদিয়ে তাড়িয়েছিল, আজ সেই শহরই আমাকে পরম মমতায় ফিরিয়ে নিয়েছে।”
কলকাতার মানুষের ভালোবাসাকে তিনি জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি বলে উল্লেখ করেন।
শিবনারায়ণ রায় ও অম্লান দত্তকে স্মরণ
নিজের বক্তব্যের শুরুতেই তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন প্রখ্যাত চিন্তাবিদ শিবনারায়ণ রায় এবং অম্লান দত্ত-কে।
তাঁর কথায়,
“তাঁদের মানবিকতা, সাহস এবং সমর্থন আমি আজও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি।”
“আমি তো শুধু সহজ কথা লিখেছিলাম”
মৌলবাদ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন,
“আমি তো শুধু সহজ কথা লিখেছিলাম। আমি কি কাউকে বোমা মেরেছিলাম? তবুও আমাকে কেন এই শাস্তি দেওয়া হল?”
তাঁর বক্তব্য, একজন নিরস্ত্র লেখকের বিরুদ্ধে এই ধরনের আচরণ কোনও গণতান্ত্রিক সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
“একজন লেখককে সরিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু লেখাকে নয়”
তিনি বলেন,
“একজন নিরস্ত্র লেখককে সরিয়ে সাময়িক নীরবতা আনা যায়, কিন্তু লেখাকে কখনও হত্যা করা যায় না।”
সত্য ও স্বাধীন চিন্তা শেষ পর্যন্ত নিজের পথ খুঁজে নেয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মৌলবাদ ও ভণ্ড প্রগতিশীলদের কড়া সমালোচনা
তসলিমা নাসরিন বলেন,
“ইসলামী জিহাদিরা সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে বোমাকে হাতিয়ার করে। আর তথাকথিত সেকুলার বামপন্থীরা ব্যবহার করে কুৎসা ও অপবাদ।”
তাঁর দাবি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত দুই দিক থেকেই এসেছে।
“রাজনীতি ভাগ করেছে, কবিতা জুড়েছে”
দুই বাংলার সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন,
“রাজনীতি যখন বাংলাকে ভাগ করেছে, কবিতা তখন দুই বাংলার মধ্যে সেতু তৈরি করেছে। কাটাতার কখনও ভূখণ্ড, ভাষা কিংবা মানুষের মনকে ভাগ করতে পারে না।”
“এক বাংলায় আমার জন্ম, আরেক বাংলায় আমি ঘর পেয়েছিলাম”
বাংলা ভাষার প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন,
“এক বাংলায় আমার জন্ম, আরেক বাংলায় আমি ঘর পেয়েছিলাম। ইউরোপ আমাকে নাগরিকত্ব দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ঘর তো তৈরি হয় ভাষা আর ভালোবাসায়।”
রাজনৈতিক প্রচারের জন্য আসিনি
তসলিমা স্পষ্ট ভাষায় বলেন,
“আমি কোনও রাজনৈতিক প্রচারের জন্য এখানে আসিনি। অশুভ মতাদর্শের বিরুদ্ধে কথা বলা আমার মৌলিক অধিকার।”
২০০৭ সালের কলকাতা ছাড়ার স্মৃতি
তিনি স্মরণ করেন ২০০৭ সালের ২২ নভেম্বর-এর সেই ঘটনাকে, যখন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সিদ্ধান্তে তাঁকে তড়িঘড়ি কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল।
তাঁর কথায়,
“আমার বই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পরে আদালত সেই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করলেও আমাকে এই শহর ছেড়ে যেতে হয়েছিল।”
শেষ বার্তা
বক্তব্যের শেষে তসলিমা নাসরিন বলেন,
“ভয়, নিষেধাজ্ঞা কিংবা নির্বাসন কোনওদিনই মুক্ত চিন্তার শক্তিকে পরাজিত করতে পারে না। সত্য, মানবতা এবং বাক্স্বাধীনতার পক্ষে আমার লড়াই ভবিষ্যতেও চলবে।”
দীর্ঘ নির্বাসনের পর রবীন্দ্রসদনের মঞ্চে তাঁর এই বক্তব্য শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ ছিল না; বরং বাক্স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর অটুট আস্থার এক শক্তিশালী বার্তা হিসেবেই উঠে আসে।

