Andy Burnham Promises: যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে চলেছে। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নতুন নেতা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত হয়েছেন অভিজ্ঞ রাজনীতিক অ্যান্ডি বার্নাম। এর মধ্য দিয়ে আগামী সোমবার তিনি ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে চলেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে সফল প্রশাসনিক ভূমিকা এবং দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্ব পালনের পর এবার যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক দায়িত্বের পথে তিনি।
শুক্রবার লন্ডনে অনুষ্ঠিত লেবার পার্টির বিশেষ সম্মেলনে বার্নামের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। তিনি জানান, অন্য কোনও যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন না দেওয়ায় অ্যান্ডি বার্নাম সর্বসম্মতিক্রমে লেবার পার্টির নতুন নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। এর ফলে তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হতে চলেছেন।
লেবার পার্টির নেতৃত্বে অ্যান্ডি বার্নাম
দলের নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের প্রথম ভাষণেই আত্মবিশ্বাসী বার্তা দেন বার্নাম। তিনি বলেন, “আমি প্রস্তুত।”
এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মধ্যেই তিনি স্পষ্ট করে দেন, শুধু সরকার পরিচালনা নয়, বরং যুক্তরাজ্যের রাজনীতি ও প্রশাসনের ধরণ বদলাতেও তিনি প্রস্তুত।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের মধ্যে নতুন করে আশা ফিরিয়ে আনাই তাঁর প্রথম লক্ষ্য। একই সঙ্গে তিনি এমন এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চান, যেখানে দেশের প্রতিটি অঞ্চল সমান গুরুত্ব পাবে।
কিয়ার স্টারমারকে ধন্যবাদ
নিজের বক্তব্যের শুরুতেই বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বার্নাম। তিনি বলেন, কঠিন সময়ে স্টারমার লেবার পার্টিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দলকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছেন। সেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই তিনি এখন নতুন পথচলা শুরু করতে চান।
শুধু ইংল্যান্ড নয়, পুরো যুক্তরাজ্যের নেতা হতে চান
অ্যান্ডি বার্নাম তাঁর ভাষণে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, তিনি শুধুমাত্র ইংল্যান্ডের কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রতিনিধি নন।
তিনি বলেন, উত্তর ইংল্যান্ড তাঁকে রাজনৈতিক পরিচয় দিয়েছে। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে তিনি উত্তরাঞ্চলের মানুষের সমস্যা, উন্নয়ন ও অধিকারের প্রশ্নে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব হবে সমগ্র যুক্তরাজ্যের প্রতি।
তিনি স্পষ্ট করে জানান, তিনি—
ইংল্যান্ডের উত্তর ও দক্ষিণ,
পূর্ব ও পশ্চিম,
স্কটল্যান্ড,
ওয়েলস,
এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড—
সব অঞ্চলের মানুষের জন্য সমানভাবে কাজ করবেন।
নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে কী বললেন?
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বার্নাম জানান, নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, তাঁর মন্ত্রিসভায় লেবার পার্টির বিভিন্ন মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং যোগ্যতাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে বার্নামের পাঁচ বড় অঙ্গীকার
দায়িত্ব গ্রহণের আগেই অ্যান্ডি বার্নাম ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে পাঁচটি বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিশ্রুতিগুলি বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামো, অর্থনীতি এবং জনপরিষেবায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
১. ক্ষমতার বড়সড় বিকেন্দ্রীকরণ
বার্নামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি হলো কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকা ক্ষমতার বড় অংশ স্থানীয় প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া।
বর্তমানে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার থেকেই নেওয়া হয়। বার্নাম মনে করেন, এতে দেশের অন্যান্য অঞ্চল অনেক সময় বঞ্চিত হয়।
তাই তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—
আঞ্চলিক মেয়রদের আরও প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার নিজের এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারবে।
অর্থ বরাদ্দ ও উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের স্বাধীনতা বাড়ানো হবে।
তাঁর ভাষায়, এটি হবে যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে ক্ষমতার সবচেয়ে বড় পুনর্বিন্যাস।
২. ম্যানচেস্টারে গড়ে উঠবে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় কার্যালয়
শাসনব্যবস্থাকে শুধু লন্ডনকেন্দ্রিক রাখার বিরোধিতা করেছেন বার্নাম।
তিনি ঘোষণা করেছেন, ম্যানচেস্টারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সম্প্রসারিত শাখা তৈরি করা হবে, যার নাম হবে “নাম্বার ১০ নর্থ”।
এই কার্যালয় থেকে—
আঞ্চলিক উন্নয়ন,
অবকাঠামো,
শিল্প,
কর্মসংস্থান,
স্থানীয় প্রশাসন
সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সমন্বয় করা হবে।
এর মাধ্যমে রাজধানীর বাইরে থেকেও দেশের উন্নয়ন পরিচালনার একটি নতুন মডেল তৈরি করতে চান তিনি।
৩. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় আবাসন প্রকল্প
যুক্তরাজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই সাশ্রয়ী আবাসনের সংকট রয়েছে।
এই সমস্যা সমাধানে বার্নাম ঘোষণা করেছেন, তাঁর সরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক আবাসন নির্মাণ কর্মসূচি গ্রহণ করবে।
এর আওতায়—
নতুন কাউন্সিল হাউস তৈরি হবে।
নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য কম খরচে বাড়ির ব্যবস্থা করা হবে।
আবাসন সংকট কমানো হবে।
নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।
৪. গণপরিষেবায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা
বার্নাম মনে করেন, সাধারণ মানুষের জন্য অত্যাবশ্যক পরিষেবাগুলোর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়ানো দরকার।
তাই তিনি জানিয়েছেন—
রেল পরিবহন,
জল সরবরাহ,
জ্বালানি,
অন্যান্য জনকল্যাণমূলক পরিষেবা
এসব ক্ষেত্রে সরকারি ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা হবে।
এর উদ্দেশ্য হলো, সাধারণ মানুষ যাতে কম খরচে এবং নির্ভরযোগ্য পরিষেবা পান।
৫. উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা
অ্যান্ডি বার্নাম যুক্তরাজ্যকে আগামী দশকের অন্যতম উদ্ভাবনী অর্থনীতিতে পরিণত করতে চান।
তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—
বিজ্ঞান গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো হবে।
প্রযুক্তি শিল্পকে আরও উৎসাহ দেওয়া হবে।
নতুন উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা হবে।
সৃজনশীল শিল্পের বিকাশ ঘটানো হবে।
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রেখেই উন্নয়নের পথ তৈরি করতে হবে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা
৫৬ বছর বয়সি অ্যান্ডি বার্নাম যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে নতুন মুখ নন।
তিনি—
প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী,
দীর্ঘদিনের সংসদ সদস্য,
প্রায় এক দশক গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র,
এবং সম্প্রতি মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে প্রায় ৫৫ শতাংশ ভোট পেয়ে আবারও ওয়েস্টমিনস্টারে নির্বাচিত হয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর এই প্রত্যাবর্তন শুধু একজন নেতার রাজনৈতিক সাফল্য নয়; বরং যুক্তরাজ্যের প্রশাসনিক দর্শনে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
এখন নজর সোমবারের দিকে
আগামী সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে অ্যান্ডি বার্নামের। এরপরই তিনি নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করবেন এবং ধাপে ধাপে নিজের ঘোষিত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করবেন।
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, আঞ্চলিক উন্নয়ন, আবাসন সংকট দূরীকরণ, গণপরিষেবায় সরকারি ভূমিকা বৃদ্ধি এবং উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার যে রূপরেখা তিনি দিয়েছেন, তা বাস্তবে কতটা সফল হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে যুক্তরাজ্যসহ আন্তর্জাতিক মহলের।
#AndyBurnham #UKPrimeMinister #LabourParty #UnitedKingdom #BritishPolitics #WorldNews #UKGovernment #Politics #BreakingNews #AndyBurnhamPromises

