মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের বিষয়ে কতটা জানা বাকি? বিশেষ আলোচনায় জানালেন মনোবিদ

।। শুভশ্রী মুহুরী ।। কলকাতা ।।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি সমীক্ষা বলছে সারা বিশ্বে প্রায় ৪৫ লক্ষ মানুষ মানসিক সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। এবং প্রতি বছর প্রায় ২.২ লক্ষ মানুষ বিভিন্ন মানসিক সমস্যা থেকে আত্মহত্যা করছেন। মানবশরীরে যতরকম রোগ হয় তার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা হয় মানসিক সমস্যাকে। তবে মনোবিদেরা বলছেন, মানসিক সমস্যা অন্যান্য রোগের মতোই। এটিকে বরং আলাদা করে দেখলেই সমস্যা বাড়ে।

আজ মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে এসএসকেএম হসপিটালের সাইকিয়াট্রি এপিডেমিওলজি বিভাগের প্রধান ডাঃ রিয়াল দাস তাঁর মূল্যবান সময় দিয়ে ‘প্রথম কলকাতা’র একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। কী বলছেন তিনি জেনে নিন……

১) কখন বুঝতে পারা যায় মানসিক সমস্যা হচ্ছে?
উঃ মানসিক সমস্যা অনেক রকম হতে পারে। তবে সার্বিকভাবে বলতে গেলে কিছু প্রাথমিক উপসর্গ রয়েছে। প্রথমত, মুড সুইং। যে মানুষটি হয়তো কথা বলতে ভালোবাসতেন সে হঠাত করেই চুপ করে গিয়েছেন। আবার দেখা যায়, যে মানুষটি খুব শান্ত ছিলেন সে হঠাত করেই বিরক্ত হতে শুরু করেছেন। দ্বিতীয়ত, মন খারাপ। যেকোনো মানুষের একদিন বা দুদিন মন খারাপ থাকতে পারে। তবে সেটি যদি প্রাত্যহিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তখন বুঝতে হবে মানসিক সমস্যা শুরু হচ্ছে।

২) মানসিক সমস্যা হচ্ছে যখন বুঝতে পারছেন, তখন প্রথমেই কার সাথে কথা বলা উচিৎ?
উঃ যদি সে পরিবার সঙ্গে থাকেন তাহলে প্রথমেই পরিবারকে বলা উচিৎ যে তাঁর চিকিৎসার প্রয়োজন। আর যদি একা থাকেন তাহলে সরাসরি মনোবিদের সাথে পরামর্শ করা উচিৎ।

৩) পুরো বিষয়টি শুনে পরিবারের কী প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিৎ?
উঃ তিনি যদি এসে বলতেন তাঁর ডায়াবেটিস হয়েছে অথবা চিকিৎসার মাধ্যমে সেরে ওঠা যায় এমন কোনো রোগ হয়েছে তখন যেমন প্রতিক্রিয়া দেওয়া উচিৎ, মানসিক সমস্যার কথা বললেও ঠিক তেমন প্রতিক্রিয়া দেওয়া উচিৎ। মনে রাখতে হবে যার মানসিক সমস্যা হয়েছে তাঁর কোনো দোষ নেই। তাই চিৎকার চেঁচামিচি না করে তাঁর প্রতি যত্নশীল হতে হবে। পরিবারকেই এগিয়ে এসে তাঁকে মনোবিদের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

৪) হয়তো অভিভাবকের মানসিক সমস্যা সম্পর্কে ধারণা নেই, তখন কি করা উচিৎ?

উঃ পরিবারের উচিৎ মনোবিদের সাথে কথা বলা। সেক্ষেত্রে মনোবিদ তাঁদের সবটা বুঝতে সাহায্য করতে পারেন।

৫) মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে বন্ধুদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ন?
উঃ কারোর মধ্যে যখন পরিবর্তন আসে তা কাছের বন্ধু অনুভব করতে পারেন। তখন তাঁর উচিৎ সরাসরি সেই বিষয়ে আলোচনা করা। বন্ধুর সাথে অনেক কথা বলা যায় এক্ষেত্রে অনেকটা সমস্যার সমাধান করা যায়।

৬) বর্তমানে মানসিক সমস্যা থেকে নেশার প্রতি ঝোঁক তৈরী হয়েছে, এইভাবে কী আদৌ সমস্যার সমাধান হয়?
উঃ না, বরং এই নেশার জন্য অন্যান্য শারীরিক সমস্যা শুরু হয়।

৭) মানসিক সমস্যা থেকে মুক্তির কোনো ঘরোয়া সমাধান রয়েছে?
উঃ মানসিক অবসাদ বা যেকোনোরকম মানসিক সমস্যার প্রধান কারণ চাপ বা স্ট্রেস। সেক্ষেত্রে এর সবচেয়ে ভালো ঘরোয়া সমাধান হচ্ছে এক্সারসাইজ। আমরা যখন শারীরিক ওয়ার্কয়াউট করি তখন আমাদের শরীর থেকে এন্ডোরফিন নামে একটি হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোনটি হচ্ছে অ্যান্টি স্ট্রেস হরমোন। যা অনেক ঘন্টার জন্য মনকে ভালো রাখতে সক্ষম। তবে মনে রাখতে হবে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ মিনিট এক্সারসাইজ করতে হবে। এছাড়াও যোগা করা যায় বা কিছুক্ষণ হাঁটা যায়।

৮) অনেকের ধারণা রয়েছে মনোবিদেরা যে ওষুধ খেতে বলছেন তা শরীরের জন্য ভালো নয়। এই বিষয়ে কী বলবেন?
উঃ এই ধারণা একেবারেই ভুল ধারণা। মনের রোগের বিভিন্ন রকম ওষুধ হয়। কিছু ওষুধ একটু কড়া হয়। তবে এমন ওষুধ অনেকদিন ধরে খেতে হয় এমনটাও না। একমাস পেশেন্টকে পর্যবেক্ষন করে সেই ডোজ কমানো হয়। এই ওষুধগুলো থেকে একটু ক্লান্তিভাব বা ওজন বেড়ে যায় ঠিকই তবে বড় কোনো সমস্যা হয় না।

৯) অনেকেই মনোবিদের কাছে গিয়ে নিজের কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন। সেক্ষেত্রে কি করা উচিৎ?
উঃ যেকোনো মনোবিদ কাউন্সিলিং করার আগে পেশেন্টের সাথে বন্ধুত্ব তৈরী করেন। একটি সম্পর্ক যখন তৈরী হয় তখন নিঃসংকোচে থেরাপিস্টের কাছে সমস্ত সমস্যা খুলে বলা যায়।

১০) অনেকেরই মানসিক সমস্যা থেকে আত্মহত্যার প্রতি ঝোঁক বাড়ে। এক্ষেত্রে পেশেন্টের কী করা উচিৎ?
উঃ যারা আত্মহত্যার কথা ভাবেন, তাঁরা মনে করেন কোনোদিকে কোনো অপশন নেই। কিন্তু মনে রাখতে হবে জীবন অনেক মূল্যবান এবং যেকোনো সমস্যা সমাধানের অনেক অপশন রয়েছে। এবং তাঁদের তৎক্ষণাৎ মনোবিদের সাথে পরামর্শ করতে হবে।

১০) মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজ এখনও সচেতন নয়। এক্ষেত্রে কী করনীয়?
উঃ মানসিক সমস্যার বিষয়ে অনেকে কথা বলতে চান না। প্রথমেই এই বিষয় নিয়ে কথা বলা উচিৎ। মানসিক সমস্যা মানেই সে পাগল নয় এটা সমাজকে বুঝতে হবে। এবং সমাজকে মানসিক সমস্যা নিয়ে নানান রকম তথ্য দিতে হবে। যাতে তাঁদের মধ্যে জ্ঞান এবং সচেতনতা তৈরী হয়।