সতীর ৫১ পীঠের অন্যতম পীঠ ত্রিপুরমালিনী

1 min read

।। শর্মিলা মিত্র ।।

সতীর ৫১ পীঠের পৌরাণিক কাহিনী আমাদের সকলেরই জানা। সেই কাহিনী অনুসারে, দক্ষের যজ্ঞে মহাদেবের অপমান সহ্য করতে না পেরে যজ্ঞকুন্ডে আত্মাহুতি দেন দেবী সতী। তারপর সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে তান্ডবলীলায় মাতেন স্বয়ং মহাদেব। মহাদেবকে শান্ত করতে না পেরে বিশ্ব সংসারকে রক্ষা করতে সুদর্শন চক্রের সাহায্যে সতীর দেহ খন্ড বিখন্ড করে দেন শ্রীবিষ্ণু। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে সতীর দেহ খন্ডগুলি। পৃথিবীর বুকে পড়া মাত্রই প্রস্তরখন্ডে পরিণত হয় সতীর দেহের খন্ডগুলি। সেই বিশেষ বিশেষ স্থানগুলি পরিণত হয় এক একটি সতীপীঠে। প্রত্যেক হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পরম পবিত্রের জায়গা সতীর এই ৫১ পীঠ।

সতীর ৫১ পীঠের মধ্যে অন্যতম সতীপীঠ ত্রিপুরমালিনএই পীঠ ভারতের পাঞ্জাবে অবস্থিত। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জানা যায়, ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে দেবীর দেহ খন্ডবিখন্ড হওয়ার সময়ে এই জলন্ধরে পড়েছিল দেবীর বাম স্তন। অন্যদিকে, কালিকাপুরান মতে, জলন্ধরে পড়েছিল দেবীর দুটি স্তনই।

এই সতীপীঠে দেবী পূজিতা হন ত্রিপুরমালিনী রূপে। আর দেবীর ভৈরব হলেন ভীষণ। ভিন্নমতে, এই সতীপীঠে দেবীর নাম বিশ্বমুখ। আচার্য শঙ্করের অষ্টাদশ পীঠ বর্ণনায় এই পীঠ সম্পর্কে জানা যায় । তন্ত্রসার গ্রন্থ মতে, যে চারটি মূল পীঠের কথা জানা যায় সেই চারটি পীঠ হল জালন্ধর, উড্ডীয়ান, পূর্ণগিরি ও কামরূপ।

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জানা যায়, বহু আগে জালন্ধর নামে এক অসুর ছিল। তার স্ত্রীর নাম ছিল বৃন্দাদুতি। জানা যায়, সেই অসুর ব্রহ্মার কাছে এই বর পায় যে, যতদিন তার স্ত্রী বৃন্দার সতীত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে ততদিন তার মৃত্যু হবে না । এইভাবে স্ত্রীর সতীত্বের জোরে স্বর্গ- মর্ত- পাতাল দখল করে নেয় অসুর জালন্ধর। এরপর, একদিন নারদ মুনির মুখে দেবী পার্বতীর রূপের বর্ণনা শুনে দেবীকে প্রাপ্তির আশায় কৈলাশ আক্রমণ করে বসে ওই অসুর।

কৈলাশে শিব আর অসুর সৈন্যের মধ্যে মহাযুদ্ধের সময়ে যখন বৃন্দার সতীত্বের তেজ জালন্ধরের প্রাণ রক্ষা করছিল, কথিত আছে, সেই সময়ে ভগবান বিষ্ণু জালন্ধর অসুরের ছদ্মবেশে গিয়ে বৃন্দার সতীত্ব ভঙ্গ করার পরই ত্রিশূলে জালন্ধর অসুরের মস্তক ছেদন করে তাকে বধ করেন শিব।

এরপর পুরো বিষয়টি জানার পর ভগবান বিষ্ণুকে শিলা হবার অভিশাপ দেন বৃন্দা। এবং নিজের দেহ ত্যাগ করে পরজন্মে তুলসী দেবী রূপে জন্ম নেন তিনি।আবার অন্য আর একটি কাহিনী জানা যায় যে, ভগবান বিষ্ণু দেবশিল্পী বিশ্বকর্মাকে দিয়ে জালন্ধর অসুরের মৃত মায়াবী শরীর গঠন করে বৃন্দাকে দেখালে বৃন্দা বিধবা হয়েছে ভেবে শাঁখা সিঁদুর পরিত্যাগ করে সতী ধর্ম বিসর্জন করেন। আর তারপরই জালন্ধর অসুরের বধ হয়। যদিও এই বিষয়ে আরও অনেক কাহিনী আছে বলে জানা যায়।

অনেক কাহিনীর মধ্যে গণেশ পুরান মতে জানা যায় যে, একদা তুলসী দেবী গণেশকে বিবাহ করার জন্য ক্রমশ বাধ্য করতে থাকলে গণেশের অভিশাপে অসুর কূলে জন্ম নেন তুলসী দেবী। আর অন্যদিকে, ভগবান বিষ্ণুকে বৃন্দা শাপ দেওয়ার পর শাপ ফিরিয়ে নিলে আংশিক রূপে শিলাতে পরিণত হন ভগবান বিষ্ণু। সেই কারনেই তাঁকে বলা হয় শালগ্রাম শিলা।

কথিত আছে, এই ত্রিপুরমালিনী পীঠে সমাধি দেওয়া হয়েছিল জালন্ধর অসুরকে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরান মতে, জানা যায়, সমাধি দেওয়ার সময় অসুরের মাথা ছিল বিপাশা নদীর উত্তর দিকে। মুখ ছিল জ্বালামুখী পীঠের দিকে, শতুদ্র ও বিপাশা নদীর মধ্যে ছিল অসুরের পৃষ্ঠ দেশ।

ত্রিপুরমালিনী দেবীর মন্দির বেশ সুন্দর। মন্দিরের প্রবেশ পথে রয়েছে একটি কুণ্ড। সেখানে অবস্থিত মা বৈষ্ণবী দেবীর মন্দির।সামনে রয়েছে দেবী ত্রিপুরমালিনীর মন্দির। মন্দিরের ডান পাশে রয়েছে ভৈরব মন্দির। স্থানীয় লোকেরা এই ভৈরবকে কালভৈরব বলে ডাকেন।

মন্দিরে নিয়ম রয়েছে একটি করে প্রদীপ সকলকেই জ্বালাতে হয়।  মন্দির গর্ভে রয়েছে লক্ষ্মী, সরস্বতী, মা বৈষ্ণবীর তিনটি মূর্তি। মন্দিরের পাশে ঢাকা একটা ঘরে মায়ের শয্যা স্থান। কথিত আছে, দুপুরের ভোগ গ্রহণের পর সেখানে বিশ্রাম গ্রহণ করেন দেবী।