Prothom Kolkata

Popular Bangla News Website

এবার মমতার সঙ্গে টক্কর নিজের জেলার বাইরে, নজরে রাঢ়বঙ্গ

1 min read

।। প্রথম কলকাতা ।।

অবিভক্ত মেদিনীপুরকে পাখির চোখ করেছে বিজেপি। পূর্ব-পশ্চিম মেদিনীপুরের পাশাপাশি ঝাড়গ্রাম ধরে মোট আসন সংখ্যা ৩৫। একটা সময় পুরোটাই অবিভক্ত মেদিনীপুরের মধ্যে ছিল। এখান থেকে সিংহভাগ আসনে জয় পাওয়ার ক্ষেত্রে শুভেন্দু অধিকারীর (Subhendu Adhikari) ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে নির্বাচনে। সেই লক্ষ্যেই বিজেপি এখন থেকেই আদাজল খেয়ে নেমে পড়েছে। গত ১৯ ডিসেম্বর বিজেপিতে যোগদানের পর অবিভক্ত মেদিনীপুরে একের পর এক কর্মসূচি গ্রহণ করে চলেছেন শুভেন্দু। বলাবাহুল্য তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সরাসরি টক্কর দিচ্ছেন তিনি। রবিবার শুভেন্দু সভা করছেন রাঢ়বঙ্গের অন্যতম জেলা পুরুলিয়ায়। উল্লেখ্য ১৯ জানুয়ারি পুরুলিয়া আসছেন মমতা। তার আগেই শুভেন্দু সেখানে নতুন করে জমি দখলের চেষ্টায় নেমে পড়েছেন।

এতদিন মেদিনীপুরে যে সমস্ত সভা বা মিছিল হয়েছে তার মধ্যমণি ছিলেন শুভেন্দু। শুক্রবার নন্দীগ্রামের সভাতেও সেটাই দেখা গিয়েছে। ইতিমধ্যেই কাঁথিতে দুটি সভা করেছেন তিনি। এর পাশাপাশি সভা করেছেন গোপীবল্লভপুর, সবং, গড়বেতা, তমলুক, দাঁতন প্রভৃতি জায়গায়। এই সমস্ত জায়গা শুভেন্দুর খাসতালুক বলেই পরিচিত। তবে দলে যোগ দেওয়ার পর তিনি প্রথম সভা করেছিলেন বর্ধমানের পূর্বস্থলীতে। তবে সেই সভা ছিল বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের। শুভেন্দু সেখানে হাজির থেকে বক্তব্য রেখেছিলেন। কিন্তু দুই মেদিনীপুরে তিনি যে সমস্ত কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, সেগুলিতে টিম শুভেন্দু কাজ করেছে। রবিবার প্রথম ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুভেন্দু পুরুলিয়ায় রোড শো এবং জনসভা করছেন। আজ পুরুলিয়ার কাশিপুরে সভা এবং মিছিল হবে। উল্লেখ্য গত লোকসভা নির্বাচনে পুরুলিয়ায় জয় পেয়েছিল বিজেপি। জেলার অধিকাংশ বিধানসভা আসনে এগিয়ে রয়েছে তারা।

শুভেন্দুর সঙ্গে বিজেপিতে যোগদান করেছেন এই জেলার একমাত্র কংগ্রেস বিধায়ক সুদীপ মুখোপাধ্যায়। উল্লেখ্য তৃণমূলে থাকাকালীন এই জেলায় দলের সাধারণ সম্পাদক গৌতম রায় প্রথম শুভেন্দুর সমর্থনে একটি কার্যালয় খুলেছিলেন। আমরা দাদার অনুগামী বলে সেই কার্যালয় থেকে মানুষকে পরিষেবা দিতে শুরু করেছিলেন তাঁরা। বলাবাহুল্য তিনিও পরে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। অর্থাৎ এটা পরিষ্কার অবিভক্ত মেদিনীপুরের বাইরেও শুভেন্দুর একটা সমান্তরাল সংগঠন রয়েছে। একটা সময় তৃণমূল যুব সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই জেলার দায়িত্ব নিয়ে কর্মীসভা এবং জনসভা করেছেন। কিন্তু তাতে দলের হাল ফেরেনি। লোকসভা নির্বাচনেও তৃণমূলের খারাপ ফল অব্যাহত ছিল। ১৯ জনুয়ারি পুরুলিয়া সফরে যাচ্ছেন মমতা। বাঁকুড়া থেকে মমতা জানিয়েছিলেন এবার থেকে প্রতিটি জেলার তিনিই পর্যবেক্ষক। অর্থাৎ প্রতিটি জেলার সংগঠনের যাবতীয় খুঁটিনাটি নিজের হাতে দেখবেন তিনি।

কারণ জেলা পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে বহু প্রশ্ন উঠেছে অতীতে। তাতে শুরু হয়েছে গোষ্ঠীকোন্দল। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চান না মমতা। ইদানিং দেখা যাচ্ছে তৃণমূলের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছেন শুভেন্দু। সৌগত রায়, কল্যাণ বন্দোপাধ্যায়, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, মদন মিত্র, ফিরহাদ হাকিমসহ তৃণমূলের সর্বস্তরের নেতারা শুভেন্দুকে প্রকাশ্যে নিশানা করছেন আক্রমণাত্মক ভাষায়। তবে এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) সরাসরি শুভেন্দুর নাম করে কোনো কথা বলেননি। ৭ জানুয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর নন্দীগ্রামে যাওয়ার কথা ছিল। সেই তারিখ পরিবর্তিত হয়েছে। ১৮ জানুয়ারি যাবেন তিনি। পরদিন মমতা যাবেন পুরুলিয়া। তাই নন্দীগ্রাম এবং পুরুলিয়ায় মমতা গিয়ে শুভেন্দুর পাশাপাশি বিজেপিকে কিভাবে আক্রমণ করেন, নিজের দলকে নতুন কি দিশা দেখান বিধানসভা নির্বাচনের আগে, সেদিকে নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের। এদিকে শুভেন্দু সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূল যুব সভাপতির নাম না করে তাঁদের পিসি-ভাইপো বলে ধারাবাহিকভাবে তোপ দেগে চলেছেন। ঝাড়গ্রামের সভা বাদ দিলে শুভেন্দুর প্রতিটি কর্মসূচিতে উপচে পড়েছে ভিড়।

আরো পড়ুন : কাকে ক্যান্সার বলে কটাক্ষ করলেন সুজাতা মন্ডল খাঁ ?

তিনি যে একজন যথার্থ জননেতা, সেটা বারবার প্রমাণ হয়েছে। এবার পুরুলিয়াতে সেটা শুভেন্দুর প্রমাণ করার পালা। বস্তুত বিধানসভা নির্বাচনের আগে পরস্পরকে আক্রমণের নিরিখে লড়াইটা সরাসরি শুভেন্দুর সঙ্গে তৃণমূলের হয়ে গিয়েছে। আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে লড়াইটা শুভেন্দু বনাম মমতা হচ্ছে, এমন প্রেক্ষাপট কিন্তু পুরোপুরি তৈরি। আসলে শুভেন্দু শুধু নিজে দল ছেড়েছেন তা নয়, তাঁর সঙ্গে দল ছেড়েছেন বেশ কয়েকজন বিধায়ক এবং সাংসদসহ বিভিন্ন জেলার সাংগঠনিক নেতৃত্ব। অর্থাৎ শুভেন্দু একেবারে তৃণমূল স্তরে আঘাত করেছেন জোড়াফুল শিবিরকে। বলাবাহুল্য এটা একমাত্র তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল। যেভাবে তৃণমূলে ধস নেমেছে শুভেন্দু দল ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, তাতে মুখে স্বীকার না করলেও তারা যে নির্বাচনের আগে রীতিমত সিঁদুরে মেঘ দেখছে, সেটা পরিষ্কার। শুক্রবার হঠাৎই জরুরি ভিত্তিতে তৃণমূলকে কেন ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক ডাকতে হল, তার সদুত্তর নেই কারোর কাছে। অর্থাৎ শুভেন্দু ফ্যাক্টর রীতিমতো আতঙ্ক ধরিয়ে দিয়েছে তাঁদের।

এই পরিস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারী নিজের জেলার বাইরেও যে সমান প্রাসঙ্গিক, সেটা আজ তাঁর প্রমাণ করার পালা। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই শুভেন্দু দৌড়েই চলেছেন। উল্টোদিকে মমতাও যে বসে থাকবেন না, সেটাও নিশ্চিত। অর্থাৎ নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসবে, ততই মমতা-শুভেন্দুর সংঘাত সম্পূর্ণ অন্য মাত্রায় চলে যাবে। যেখানে শুভেন্দু সভা করছেন, সেখানেই দেখা যাচ্ছে পাল্টা সভা করছে তৃণমূল। একই পথে হাঁটছে বিজেপিও। এক কথায় বলা যায় সেয়ানে সেয়ানে লড়াই হচ্ছে। তাঁদের টক্করে রীতিমতো জমে উঠেছে রাজ্য রাজনীতি। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, মনে রাখবেন রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে আমিই তৃণমূলের প্রার্থী। আপনারা আমাকে ভোট দিন। এবার মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি সেকথা বলেননি।

কিন্তু বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, সব জায়গায় তাঁকে দেখেই যেন মানুষ ভোট দেন। বলাবাহুল্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) ক্যারিশমা, ব্যক্তি মমতার আন্দোলনের ইতিহাস, সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে একটা অন্য উচ্চতায় তুলে নিয়ে গিয়েছে। সেদিক থেকে শুভেন্দু পিছিয়ে। কিন্তু তরুণ-তুর্কি নেতা শুভেন্দু এমন অসম লড়াইকেও যে ভয় পান না, সেটা বহুবার বোঝা গিয়েছে। না হলে তিনি তৃণমূল ছাড়ার মতো এত বড় রিস্ক নিতেন না। তিনি ভাল করেই জানেন তাঁর লড়াইটা কতটা কঠিন। তা সত্ত্বেও এই চ্যালেঞ্জটা তিনি গ্রহণ করেছেন। শুধুমাত্র সেই কারণেই শুভেন্দু এখন সবচাইতে আলোচিত চরিত্র, আলোচিত নাম। সেটা সবাইকে কিন্তু স্বীকার করে নিতেই হবে। প্রবল লড়াকু মেজাজের পাশাপাশি সাংগঠনিক দক্ষতা শুভেন্দুর প্রধান ইউএসপি। মূলত সেটাকে কাজে লাগিয়েই তিনি মমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছেন। নিজের জেলার বাইরে আজ তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রথম কর্মসূচি। সেটা কতটা সফল হয়, পুরুলিয়ার মানুষের কাছ থেকে তিনি কতটা সাড়া পান, সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক মহল।