মসলার বাজারে নেই বেচা-বিক্রি, দুশ্চিন্তাই ব্যবসায়ীরা

1 min read

।। মনির ফয়সাল, বাংলাদেশ ।।

কোরবান আসলে সরগরম ও জমজমাট হয়ে উঠতো দেশের ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা পার করত ব্যস্ত সময়। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার বেচা-বিক্রি হতো ব্যবসায়ীদের। স্বস্তি মেলার সময় মিলতো না বন্ধের দিন শুক্রবার ও শনিবারেও। কিন্তু চলতি বছর করোনার প্রভাবে ব্যতিক্রমধর্মী চিত্রের দেখা মিলছে দেশের সর্ববৃহৎ ভোগ্যপণ্যের এ বাজারে। এলাচ, দারুচিনি, জিরা, গোল মরিচসহ মসলার দাম কম ও সরবরাহ থাকার পরও দেখা নেই ক্রেতাদের। পাইকারী এই বাজারে মন্দাভাব বিরাজ করায় দুশ্চিন্তাই রয়েছে ব্যবসায়ীরা। এমন চলতে থাকলে চলতি বছরে দেউলিয়া হতে পারে অনেক ব্যবসায়ী।

সরজমিনে বাজার ঘুরে দেখা যায়, রমজান মাসে ভারতের জিরা কেজি প্রতি বিক্রি হয়েছে ৪৫০ টাকায় এখন বিক্রি হচ্ছে ২৪০-২৪৫ টাকায়। ইরানী জিরা রমজানে বিক্রি হয়েছে ৩৫০-৩৬০ টাকায় এখন ২৮০-৩০০ টাকা। তার্কি জিরা রমজানে ৩০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ২৭৫-২৮০ টাকা। সিরিয়া থেকে আমদানি করা জিরা বিক্রি হচ্ছে ৩৪০ টাকা, রমজানে তা ৪৯০-৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল। মিষ্টি জিরা ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিসমিস রমজানে ২৫৫-২৬০ টাকা আর এখন ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এলাচি রমজানে ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন ২ হাজার ৪৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লবঙ্গ রমজানে বিক্রি হয়েছিল ৭০০ থেকে ৭৮০ টাকা আর এখন ৫৯০ থেকে ৬০০ টাকা। দারুচিনি রমজানে ৩১০ থেকে ৩৪০ টাকা আর এখন ২৫০ থেকে ২৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ইলিয়াছ মার্কেট ও জাফর মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং মসলা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হাসান মুরাদ প্রথম কলকাতাকে বলেন, দেশের এই পাইকারি বাজারে করোনার প্রভাব বেশি পড়েছে। রমজান মাসে যেখানে জিরা ৪৫০ টাকায় বিক্রি করেছি এখন তা ২৫০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এলাচি ৩ হাজার ২০০ টাকার জায়গায় ২ হাজার ৫০০ টাকায় এখন বিক্রি করতে হচ্ছে। অন্যান্য বছর কোরবানির ২০ থেকে ২৫ দিন আগে থেকে বেচা-বিক্রি শুরু হলেও এখন তার দেখা নাই। ভৈরব, ভোলা ও নরসংদীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে আগে মসলা নিয়ে যেতো কোরবানি উপলক্ষ্যে। কিন্তু এবছর প্রচুর পরিমাণে সরবরাহ থাকলেও চাহিদা নেই। আগে যেখানে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার বিক্রি হতো এখন হচ্ছে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা।

মসলার এই পাইকারী বাজারে দেখা যায়, জাইফল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩৫০ টাকা দরে। গত মাসে বিক্রি হয়েছিল ৬৫০ টাকায় এবং রমজানে বিক্রি হয়েছিল ৭০০ টাকা দরে। যত্রিক বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ২ হাজার ২৫০ টাকা দরে, রমজানে বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ৯০০ টাকায়। গোল মরিচ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩৭০ টাকা। গত মাসে বিক্রি হয়েছিল চারশত টাকা দরে। ভারতের লাল মরিচ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১৭০ টাকা দরে, রমজান মাসে বিক্রি হয়েছিল ২৩০ টাকায়। দেশি লাল মরিচ বিক্রি হচ্ছে ১২৫ টাকা দরে, রমজানে ২৪০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। ধনিয়া কেজিতে ৭৫ টাকা থেকে কমে এখন বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকা দরে।

এদিকে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গরম মসলা আমদানি হয় ৫১ হাজার ৮৯৪ টন। শুল্ক করসহ এসব মসলার আমদানিমূল্য পড়েছে ১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। পাইকারি বাজারে এই মসলা বেচাকেনা হয় তিন হাজার কোটি টাকায়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় মসলার আমদানি প্রায় এক শতাংশ বেড়েছে।

মসলা ব্যবসায়ী গুলিস্তান ট্রের্ডের আবদুর রাজ্জাক প্রথম কলকাতাকে বলেন, অন্যান্য বছর যেভাবে কোরবানি হতো এবছর অনেক কম কোরবানি হওয়ায় বেচা-বিক্রি নেই। এছাড়া রেস্টুরেন্ট, কমিউনিটি সেন্টারসহ অনেক বড় বড় হোটেল বন্ধ থাকায় ব্যবসা আগের মতো হচ্ছে না খাতুনগঞ্জে।

এদিকে খাতুনগঞ্জে কোরবান উপলক্ষ্যে দেখা যায়, ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২২ টাকা দরে, মধ্যমানের পেঁয়াজ ১০ থেকে ১৫ টাকায় ও দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা দরে। যেখানে তিন মাস আগে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল পেঁয়াজ। আদা বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ৬০ থেকে ৬২ টাকা দরে। কয়েকদিন আগে তা ১২০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। মিয়ানমার থেকে আমদানি করা আদা বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ৯৫ টাকা দরে। রসুন বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ৬২ টাকা দরে। গত মাসে তা ৬৫ থেকে ৭০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল।

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মসলা আমদানিকারক মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রথম কলকাতাকে বলেন, স্বাধীনতার পরে একটা ব্যতিক্রমধর্মী কোরবানি ঈদ পালন করতে যাচ্ছি। যেখানে আগে কোরবানের সময় মসলা বাজার জমজমাট থাকতো, এখন তা পুরোপুরি ঠাণ্ডা বিরাজ করছে। আগে লোকসান হলেও লাভ আর লোকসানের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য ছিলো। কিন্তু এবার শুধু লোকসানের মুখ দেখছে ব্যবসায়ীরা। এমন হলে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা দেউলিয়া হয়ে যাবে ২০২০ সালে।

এম/বি