করোনার কারণে কোরবানির পশুর চামড়া কেনা নিয়ে ধন্ধে আড়তদাররা

।। মনির ফয়সাল, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ ।।

দ্রুত দিন ঘনিয়ে কোরবানের ঈদ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রাকে করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাটে আসতে শুরু করেছে কোরবানি পশু। কিন্তু এখনও পর্যন্ত নির্ধারণই করা হয়নি চামড়ার দাম!

এদিকে করোনার কারণে কোরবানির পশুরা চামড়া কেনা নিয়েও ধন্ধে রয়েছেন আড়তদাররা। তারওপর ঢাকার ট্যানারিগুলোতে আড়তদারদের পাওনা অর্ধশত কোটি টাকা এখনও বকেয়াই রয়ে গেছে। সবমিলিয়ে চলতি বছর কোরবানির পশুর চামড়া কেনা নিয়ে কঠিন অবস্থায় রয়েছেন চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়ার আড়তদাররা।

গত বছর কোরবানির ঈদে নজিরবিহীনভাবে কাঁচা চামড়ার দাম পড়ে য়ায়। দাম অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় চামড়া বিক্রি না করে রাস্তায় ফেলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায় অন্তত দুই কোটি টাকার চামড়া। এবারও এমন শঙ্কায় শঙ্কিত চামড়া ব্যবসায়ীরা।

এদিকে করোনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজার মন্দা হওয়ায় আড়তদার থেকে কাঁচা চামড়া কেনা নিয়ে ধন্ধে রয়েছেন ট্যানারি মালিকরা। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকার ট্যানারিগুলো সিন্ডিকেট করায় মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের ন্যায্য মূল্য দিতে পারেন না আড়তদাররা।

চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির আহ্বায়ক মাহবুব আলম বলেন, চামড়া সংগ্রহ করতে প্রতিবছর ট্যানারি মালিকরা আড়তদারদের টাকা দিতেন। কিন্তু এ বছর ট্যানারি মালিকরা আড়তদারদেরকে এখনো টাকা দেননি। ট্যানারি মালিকরা টাকা না দিলে আড়তদাররা চামড়া কিনতে পারবেন না।

তিনি আরও বলেন, বেশিরভাগ মৌসুমি ব্যবসায়ীর অভিজ্ঞতা না থাকায় চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। তারা প্রতিযোগিতা করে বেশি দামে চামড়া কিনে ফেলে। পরে বিক্রি করতে না পেরে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। এবারও চামড়া নষ্ট হওয়ার সম্ভবনা বেশি। কারণ গরম পড়ছে বেশি। গরমে কাঁচা চামড়া দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।

সূত্র জানায়, চামড়া ব্যবসার সঙ্গে চট্টগ্রামে ২০ থেকে ৩০ হাজার লোক জড়িত। চট্টগ্রামে গত বছর কোরবানির ঈদে সংগ্রহ করা ৬ লাখ চামড়ার মধ্যে ৪ লাখ চামড়া চলে যায় ঢাকার ট্যানারিগুলোতে। গত বছর চট্টগ্রামের ট্যানারি মালিকরা ঢাকায় ৩০ কোটি টাকার চামড়া বিক্রি করে। কিন্তু তা থেকে ৫০ শতাংশ টাকা এখনো বকেয়া। এর সঙ্গে রয়েছে আগের বকেয়া। সবমিলিয়ে যা প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা।

আড়তদারদের অভিযোগ, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের শর্ত অনুযায়ী চামড়া বিক্রি করার পরও বকেয়া টাকা পরিশোধ করা হয়নি। এতে অর্থ সংকটে ভুগছে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা।

জানা যায়, স্বাধীনতার পর চট্টগ্রামে ২২টি ট্যানারি ছিল। এর মধ্যে নানা কারণে বন্ধ হয়ে যায় ২১টি ট্যানারি। বর্তমানে নগরের কালুরঘাটে টি কে গ্রুপের ট্যানারিটিই অবশিষ্ট আছে। প্রতিবছর তারা চট্টগ্রাম থেকে ২০ শতাংশ কাঁচা চামড়া কিনে বাকি চামড়া ঢাকার ট্যানারিতে বিক্রি করে দেয়। এ অবস্থায় চামড়ার দাম নিয়ে নয়ছয় করার সুযোগ পান ঢাকার ট্যানারি মালিকরা।

চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. কাদের বলেন, ঢাকার ট্যানারি মালিকরা গত বছরের বকেয়া টাকা এখনো দেননি। সবমিলিয়ে তাদের কাছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বকেয়া। আবার সরকারের পক্ষ থেকে এখনো চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়নি। এ কারণে ট্যানারি মালিকরাও কোনো দাম নির্ধারণ করতে পারেনি। সবমিলিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। সরকার কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের কম সুদে ব্যাংক ঋণ দিলে আড়তদাররা ঘুরে দাঁড়াতে পারতেন।

যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রামের একমাত্র ট্যানারি টি কে গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রিফ লেদার লিমিটেডের পরিচালক (অপারেশন্স অ্যান্ড সেলস) মো. মোকলেছুর রহমান বলেন, মনে হচ্ছে করোনার কারণে এ বছর কোরবানি কম হতে পারে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারও মন্দা। তাই কোরবানিতে কী পরিমাণ চামড়া ক্রয় করবো তা এখনও ঠিক করা হয়নি।

তিনি বলেন, ২০১৭ সাল থেকে চামড়াশিল্প সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। তার ওপর করোনার কারণে অর্থনীতি আরো খারাপ অবস্থায়।

তিনি আরও বলেন, প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানির আমাদের প্রধান বাজার হচ্ছে চীন। মোট চামড়ার ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশই চীনে রপ্তানি হয়। এছাড়া আমেরিকা, ইতালি, স্পেন, জাপান এবং থাইল্যান্ডেও রপ্তানি করা হতো। কিন্তু করোনার কারণে দেশগুলোতে রপ্তানি বন্ধ থাকায় উৎপাদিত পণ্য নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছি।

এম/বি