দশমহাবিদ্যায় ‘তারা’

1 min read

।। শর্মিলা মিত্র ।।

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জানা যায়, সতী বিনা আমন্ত্রণেই পিতৃগৃহে দক্ষের যজ্ঞে যেতে চাইলে তাঁকে বারণ করেন মহাদেব।সেই সময় স্বামীর অনুমতি পাওয়ার জন্য তাঁর তৃতীয় নয়ন থেকে আগুন বার করতে থাকেন ক্রুদ্ধ সতী।এবং কালী বা শ্যামায় রূপান্তরিত হন দেবী সতী।

দেবীর এই ভয়ঙ্কর মূর্তি দেখে মহাদেব সেসব এড়িয়ে যেতে উদ্যত হলে দশ মহাবিদ্যার রূপ ধারণ করে দশ দিক দিয়ে মহাদেবকে ঘিরে ধরেন দেবী সতী। আর এরপরই অনিচ্ছাকৃতভাবেই বাধ্য হয়ে দেবী সতীকে দক্ষের যজ্ঞে উপস্থিত থাকার অনুমতি দান করেন মহাদেব।

দেবী সতীর দশ মহাবিদ্যার দশটি রূপ হল কালী, ধূমাবতী, বগলামুখী, তারা, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ত্রিপুরসুন্দরী বা ললিতা-ত্রিপুরসুন্দরী বা ষোড়শী, কমলাকামিনী, ছিন্নমস্তা, এবং মাতঙ্গী।দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয় মহাবিদ্যা কালীর একটি বিশিষ্ট রূপ হলেন তারা। কালীর মতোই ভীষণা দেবী হলেন তারা।

তারামায়ের আটটি রূপ হল, তারা বা বামাকালী, নীলসরস্বতী, উগ্ৰতারা, নিত্যাতারা, কামেশ্বরীতারা, তারিণীতারা, বজ্রাতারা এবং একজটাতারা।বৌদ্ধধর্মেও প্রচলিত রয়েছে তারাদেবীর পুজো। জানা যায়, কালী অপেক্ষাও প্রাচীনতর তারার মূর্তিকল্পনা।

আরো পড়ুন : দশমহাবিদ্যায় ‘কালী’

বীরভূম জেলার রামপুরহাটে অবস্থিত প্রসিদ্ধ তারা মার মন্দির। দেবী পার্বতীর উগ্র রূপ হল তারা। এটি একটি সতীপীঠও।জানা যায়, বীরভূম জেলার রামপুরহাটে পড়েছিল দেবী সতীর নয়ন তারা বা তৃতীয় নয়ন। কথিত আছে, প্রথম মা তারার এই রূপটি দেখতে পান ঋষি বশিষ্ঠ। এবং এরপরই সতীকে তারা রূপে পুজো শুরু করেন তিনি।

অপর একটি কিংবদন্তি অনুসারে, জানা যায় যে, সমুদ্র মন্থনের সময় উত্থিত বিষ পান করার পর বিষের জ্বালায় শিবের কণ্ঠ জ্বলতে শুরু করলে সেই সময়ে শিবকে তাঁর আপন স্তন্য পান করিয়ে মহাদেবের জ্বালা নিবারণ করেন তারাদেবী।

জানা যায়, শিশু শিবকে স্তন্যপানরতা তারার মূল প্রস্তরমূর্তিটি একটি তিন ফুট উঁচু ধাতব মূর্তির মধ্যে রাখা রয়েছে। সেই ধাতব মূর্তিটিই সাধারণত দর্শনার্থীরা দর্শন করে থাকেন। এই মূর্তিটি তারা দেবীর ভীষণা চতুর্ভূজা, মুণ্ডমালাধারিণী এবং লোলজিহ্বা মূর্তি। এলোকেশী দেবীর মাথায় থাকে রুপোর মুকুট।

বহির্মূর্তিটি সাধারণত শাড়ি জড়ানো অবস্থায় গাঁদা ফুলের মালায় ঢাকা থাকে। মূর্তির মাথার উপরে থাকে একটি রূপোর ছাতা। মূর্তিটির কপালে থাকে সিঁদুর। মা তারার বিগ্রহের নীচে গোলাকার বেদীতে থাকে দুটি রূপোর পাদপদ্ম।সতীপীঠের পাশাপাশি তারাপীঠ একটি সিদ্ধপীঠও। অর্থাৎ, এখানে সাধনা করলে নাকি জ্ঞান, আনন্দ ও সিদ্ধি বা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হন সাধক। একজন বিখ্যাত তারা-সাধক হলেন বামাক্ষ্যাপা।

তন্ত্রসার অনুসারে তারার যে রূপ বর্ণিত হয়েছে, তা হল,

তারা প্রত্যালীঢ়পদা অর্থাৎ দক্ষিণপদ শববক্ষে স্থাপিতা। ভয়ংকরী, খর্বা, ভীষণা, মুণ্ডমালাভূষিতা, কটিতে ব্যাঘ্রচর্মাবৃতা, নবযৌবনা, লম্বোদরী, চতুর্ভূজা, পঞ্চমুদ্রা শোভিতা, মহাভীমা, লোলজিহ্বা, বরদা, দক্ষিণহস্তে ধৃতা খড়্গ কাতরি, বামহস্তদ্বয়ে ধৃতা কপাল ও নীলপদ্ম, ললাটে অক্ষোভ্য প্রভাতসূর্যের মতো গোলাকার তিন নয়নশোভা, পিঙ্গলবর্ণ একজটাধারিণী, ভীষণদন্তা, প্রজ্জ্বলিত চিতামধ্যে অবস্থিতা, করালবদনা, নিজের আবেশে হাস্যমুখী এবং শ্বেতপদ্মের উপর বিশ্বব্যাপ্ত জলের মধ্যে অবস্থিতা।

এছাড়াও তন্ত্রসারে তারার অন্য আরও একটি ধ্যানমন্ত্র বর্ণনা করা রয়েছে। তা হল, শ্যামবর্ণা ত্রিনয়না দ্বিভূজা, চতুর্দিকে বহুবর্ণা ও বহুরূপা শক্তির দ্বারা বেষ্টিতা, বরমুদ্রা ও পদ্মধারিণী, হাস্যমুখী মুক্তাভূষিতা, রত্নপাদুকায় পাদদ্বয় স্থাপনকারিণী তারাকে ধ্যান করবে।

অন্যদিকে, তারাকে কেবল শ্যামবর্ণা ও কালরূপিণী বলে উল্লেখ করা হয়েছে বৃহদ্ধর্ম পুরাণে। তন্ত্রসারে তারাকেই উল্লেখ করা হয়েছে মহানীল সরস্বতী বলে।

অন্নদামঙ্গল কাব্যে ভারতচন্দ্র রায় দেবী তারার যে রূপবর্ণনা করেছেন, তা হল,তারা রূপ ধরি সতী হইলা সম্মুখ। সর্পবান্ধা ঊর্দ্ধ এক জটাবিভূষণা। নীলবরণা লোলজিহ্বা করালবদনা। ত্রিনয়ন লম্বোদর পরা বাঘছাল। অর্দ্ধচন্দ্র পাঁচখানি শোভিত কপাল। চারি হাতে শোভে আরোহণ শিবোপর। নীল পদ্ম খড়্গ কাতি সমুণ্ড খর্পর।

তারাপীঠের ব্রহ্মশিলায় খোদিত তারামূর্তিটি দ্বিভূজা। সর্পযজ্ঞোপবীতে ভূষিতা এবং তার বাম কোলে শায়িত পুত্ররূপী শিব।