সতীপীঠ জুরানপুর

।। শর্মিলা মিত্র ।।

সতীর ৫১ পীঠের পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, দক্ষের যজ্ঞে মহাদেবের অপমান সহ্য করতে না পেরে যজ্ঞকুন্ডে আত্মাহুতি দেন দেবী সতী। তারপর সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে তান্ডবলীলায় মাতেন স্বয়ং মহাদেব। মহাদেবকে শান্ত করতে না পেরে বিশ্ব সংসারকে রক্ষা করতে সুদর্শন চক্রের সাহায্যে সতীর দেহ খন্ড বিখন্ড করে দেন শ্রীবিষ্ণু। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে সতীর দেহ খন্ডগুলি। পৃথিবীর বুকে পড়া মাত্রই প্রস্তরখন্ডে পরিণত হয় সতীর দেহের খন্ডগুলি। সেই বিশেষ বিশেষ স্থানগুলি পরিণত হয় এক একটি সতীপীঠে।

সতীর ৫১ পীঠের মধ্যে অন্যতম হল সতীপীঠ জুরানপুর। নদীয়া জেলার কালীগঞ্জ থানার অন্তর্গত এক প্রান্তে হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত এই জুরানপুর সতীপীঠ। প্রাচীন কালে কালীঘাট বা কালীপীঠ নামেও পরিচিত ছিল এই সতীপীঠ।

সড়কপথের কৃষ্ণনগর হয়ে এখানে পৌঁছানো যায়। অন্যদিকে বর্ধমানের কাটোয়ার ঘাট পেরিয়ে নদীয়ার বল্লভপুরে ঘাটে নেমে পৌঁছে যাওয়া যায় সতীপীঠ জুরানপুরে।বিশাল বাঁধের ধারে এক বিস্তৃত প্রান্তরের মধ্যে পঞ্চবটীর মূলে শিলারূপী দেবীর অধিষ্ঠান। খোলা আকাশের নীচে অবস্থিত এই সতীপীঠ।

পীঠতন্ত্র অনুসারে কালীপীঠে দেবীর মুন্ড পড়েছিল। এখানে দেবী জয়দুর্গা নামে পরিচিত। দেবীর ভৈরব হলেন ক্রোধীশ। পঞ্চবটীর সামনেই পীঠ ভৈরব ক্রোধীশের ছোট্ট মন্দির।

অন্যদিকে, শিবচরিত মতে এই জুরানপুর সতীপীঠের দেবী হলেন চন্ডেশ্বরী আর তাঁর ভৈরব হলেন চন্ডেশ্বর।দেবী এখানে রুদ্রানী রূপে বিরাজিতা। সেজন্য শুম্ভ নিশুম্ভ বিনাশিনী দেবী জয়দুর্গাকে পীঠদেবী রূপে পুজো করা হয়।

বাহুল্য বর্জিত এই পীঠ অন্য সব সতীপীঠ থেকে একদমই আলাদা। এখানে একজন পুরোহিতই দেবীর নিত্য পুজো করেন।ক্রোধীশ ভৈরবের মন্দিরের পাশেই রয়েছে গর্ভ গৃহ। জানা যায়, এটি আসলে একটি সুরঙ্গ। যা নাকি আগে গঙ্গা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যদিও বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে জানা যায়, প্রশাসনের নির্দেশে সেই সুরঙ্গ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

একটা সময় জঙ্গলে ঘেরা হওয়ার কারনে জানা যায় বহু সাধকের সাধন স্থল ছিল এই জুরানপুর। স্থানীয় ভাবে জানা যায়, তারাপীঠ যাবার আগে বামদেব এখানে সাধনা করেছিলেন। জানা যায় আরও অনেক সাধকই এখানে সাধনা করেছিলেন। শিবনাথ শাস্ত্রীও এখানে সাধনা করেছিলেন বলে জানা যায়। মন্দিরের পাশেই এখনও রয়েছে শিবনাথ শাস্ত্রীর মন্দির এবং তাঁর সাধিত শিব।

ক্রোধীশ ভৈরবকুন্ড কেন্দ্র করে শ্রাবন মাসে বিশেষ উৎসবের আয়োজন করা হয়। ভক্তদের ঢল নামে সেই উৎসবকে কেন্দ্র করে।

ত্রিভুবন মোহিনী জগৎজননী এখানে প্রকৃতি রূপে বিরাজমান।কথিত আছে, সাধক রাজারাম এখানে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। দেবী কালিকা তার সাধনায় তৃপ্ত হলে সাধক রাজারাম দেবীকে ঘরণী হিসেবে পেতে চেয়েছিলেন। এরপর দেবীর স্বপ্নাদেশেই বিয়ে হয় রাজারামের। এরপর শোনা যায় জুরানপুরের বটতলাতেই অদৃশ্য হয়ে যান দেবী।

অন্যদিকে আরও একটি জনশ্রুতি হল, মনীশ চক্রবর্তী নামে এক ব্যক্তি স্বপ্নাদেশে দীঘি থেকে অষ্টধাতুর একটি জয়দুর্গার মূর্তি পেয়েছিলেন। এখনও প্রতিদিন সকালে সেই অষ্টধাতুর মূর্তিটিকে শিলারূপে দেবীর পাশে বসিয়ে পুজো করা হয়। আবার সন্ধ্যাবেলায় শীতল ভোগের পর মূর্তি একটি ঘরে রেখে আসা হয়।সব মিলিয়ে এই অনাড়ম্বর সতীপীঠের মাহাত্মই আলাদা।