সতীপীঠ বক্রেশ্বর

1 min read

।। শর্মিলা মিত্র ।।

সতীর ৫১ পীঠের ইতিহাস অনুসারে, দক্ষের যজ্ঞে মহাদেবের অপমান সহ্য করতে না পেরে যজ্ঞকুন্ডে আত্মাহুতি দেন দেবী সতী। আর তারপরই সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে তান্ডবলীলায় মাতেন স্বয়ং মহাদেব। মহাদেবকে শান্ত করতে না পেরে সুদর্শন চক্রের সাহায্যে সতীর দেহ খন্ড বিখন্ড করে দেন শ্রীবিষ্ণু। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে সতীর দেহ খন্ডগুলি। পৃথিবীর বুকে পড়া মাত্রই প্রস্তরখন্ডে পরিণত হয় সতীর দেহের খন্ডগুলি। সেই বিশেষ বিশেষ স্থানগুলি পরিণত হয় এক একটি সতীপীঠে। প্রত্যেক হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পরম পবিত্রের জায়গা সতীর এই ৫১ পীঠ।

সতীর ৫১ পীঠের মধ্যে অন্যতম হল সতীপীঠ বক্রেশ্বর। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার পাপহরা নদীর তীরে অবস্থিত এই বক্রেশ্বর মন্দির।

 পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জানা যায়, এখানে পড়েছিল দেবী সতীর দুই ভ্রুর মধ্যবর্তী অংশ। আবার মতান্তরে বলা হয়ে থাকে যে এখানে পড়েছিল দেবীর তৃতীয় নয়ন।বক্রেশ্বরের অধিষ্ঠিত দেবী হলেন মহিষাসুরমর্দিনী। আর তাঁর ভৈরব হলেন বাবা বক্রেশ্বর বা বক্রনাথ।

দেবী মহিষাসুরমর্দিনীর পিতলের মূর্তিটির রূপ দশভূজা দুর্গার। জানা যায়, ওই পিতলের দশভূজার মূর্তির নিচে একটি গর্তের ভিতর রাখা রয়েছে দেবীর দেহাংশটি।

অন্যদিকে, দেবী মহিষাসুরমর্দিনীর ভৈরব বাবা বক্রেশ্বর বা বক্রনাথকে কেন্দ্র করে রয়েছে আরও পাঁচটি শিবলিঙ্গ। সেগুলি হল কুবেরেশ্বর, সিদ্ধেশ্বর, জোতিলিঙ্গেশ্বর, কালারুদ্রশ্বর ও জম্ভশ্বর। আর প্রত্যেকটি শিব মন্দিরের পাশে রয়েছে এক একটি উষ্ণ জলকুন্ড। সেগুলি হল ভৈরবকুন্ড, ক্ষারকুন্ড, অগ্নিকুন্ড, জীবৎসকুন্ড, সৌভাগ্যকুন্ড, সূর্যকুন্ড, ব্রহ্মাকুন্ড এবং শ্বেতকুন্ড।

জানা যায়, বক্রেশ্বর জায়গাটির সঙ্গে জন্ম কাহিনী জড়িয়ে রয়েছে অষ্টবক্র মুনির নামও।প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই জায়গাটি আগে জঙ্গলে ভর্তি ছিল। তখন জায়গাটির নাম ছিল ডিহি।

প্রচলিত কাহিনী অনুসারে, জানা যায়, গর্ভস্থ সন্তানকে অভিশাপ দেন অষ্টবক্র মুনির বাবা বেদজ্ঞানে পারদর্শী কহোর মুনি।আর সেই অভিশাপের ফলেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন অষ্টাবক্র মুনি। মাত্র বারো বছর বয়সেই সর্বশাস্ত্র বিষয়ে পণ্ডিত হয়ে ওঠেন অষ্টাবক্র।

এরপর, পরবর্তী সময়ে বাবার আশীর্বাদ পেয়ে ডিহি গ্রামে পৌঁছে আটটি কুন্ডের জল যেখানে মিশছে সেখানে স্নান করেন তিনি। এরপরই, তাঁর শারীরিক প্রতিবন্ধকতা দূর হয়।

অন্য একটি জনশ্রুতি অনুযায়ী, ওই জঙ্গল থেকেই একটি শিবলিঙ্গের সন্ধান পান অষ্টবক্র মুনি। লিঙ্গের সামনে গভীর সাধনায় মগ্ন হন তিনি। এইভাবে অনেক বছর কঠিন সাধনা করার পর তার উপর সন্তুষ্ট হয়ে তাকে শারীরিক বিকৃতি থেকে মুক্তি লাভের বর দেন মহাদেব।

জানা যায়, পরবর্তীকালে অষ্টবক্রের নামানুসারে সেই শিবলিঙ্গের নামকরণ হয় বক্রনাথ, এবং বক্রেশ্বর নামে পরিচিতি পায় ডিহি গ্রাম।প্রত্যেক বছরই সতীপীঠ বক্রেশ্বরের টানে সেখানে আসেন ভক্তরা। রেখ-দেউলরীতির স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি বক্রেশ্বরের দুধসাদা সুউচ্চ শিব মন্দিরের ঠিক দক্ষিণ দিকে রয়েছে দেবী মহিষাসুরমর্দিনীর মন্দির।মন্দিরের বেদিতে অধিষ্ঠিত রয়েছেন পিতলের তৈরি দশভূজার দুর্গা মূর্তিটি।

এম/বি

Categories