কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্মরণে

1 min read

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যিনি অনিলা দেবী ছদ্মনামেও লিখেছেন বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী যুগের কথা। প্রকৃতি, প্রেম, রহস্য রোমাঞ্চের উর্ধ্বে যে বিষন্নতাকে মানুষ এড়িয়ে চলত, সাহিত্যের পাতায় পাতায় সেই সব কাহিনী লিখেছিলেন তিনি। দেবদাসের করুণ পরিণতি কিংবা শ্রীকান্তের পল্লীগ্রামের জীবন ছেড়ে আগে এগিয়ে চলার যে চাপা কষ্টটা বুকের ভেতরে চিনচিনে ব্যাথা তৈরী করে, সেই ব্যথা নিরাময় হয় চোখের জলে।

ছোট ছোট দুঃখ, বেদনা, আনন্দ, বিষন্নতার কথা খুব সহজেই লিখে ফেলতেন তিনি। তাঁর লেখনীতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নানা সংকট ও সীমাবদ্ধ বাস্তবকে খুঁজে পাওয়া যেত। নিজের দক্ষতায়, কুশলতায় পাঠক মননে ছাপ তিনি সদাই বরণীয়। বাংলা ভাষা ছাড়াও বহু ভারতীয় ও বিদেশি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল তাঁর একাধিক লেখা। 

তাঁর লেখাতে পল্লী জীবন ও সমাজের সংকীর্ণতা কিভাবে হৃদয়কে রক্তাক্ত করতে পারে তারই বেদনাদায়কচিত্র ফুটে উঠেছে। মনোগত এবং বস্তুগত দৃষ্টিভঙ্গিতে দারিদ্রকে দেখেছিলেন তিনি, যা সংলাপ ভিত্তিক উপন্যাসের সাহায্যে পাঠকদের কাছে তুলে দিয়েছিলেন কথা শিল্পী। মুলতঃ নাটকীয় মোচড়ে থাকত তাঁর লেখা উপন্যাসের সমস্ত কাহিনীগুলি।

১৮৭৬ সালের আজকেরই দিনে ব্রিটিশ ভারতের প্রেসিডেন্সি বিভাগের হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে তিনি জন্ম নিয়েছিলেন। এক দরিদ্র ব্রাক্ষ্মন পরিবারে পাঁচ ভাই আর বোনের মধ্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন মেজভাই, তাঁকে ভালোবেসে ডাকা হত ন্যাড়া। 

তিনি লেখার প্রতি নিজের ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছিলেন পিতার সান্নিধ্যে এসে। কলেজে পড়াশোনা করার সময় একটি সাহিত্যসভাতে অংশগ্রহন করার জন্য লিখে ফেলেছিলেন বড়দিদি, দেবদাস, চন্দ্রনাথ, শুভদার মত সুন্দর সুন্দর উপন্যাস এবং ‘অনুপমার প্রেম’, আলো ও ছায়া, ‘বোঝা’, হরিচরণ’ এর গল্প। 

এরপর বেশ কিছুদিন তিনি বনেলী রাজ-এস্টেটে চাকরি করেন। সেই চাকরি ছেড়ে বেশ কিছু দিন সন্ন্যাস ধর্ম পালন করেন। পরে পিতার মৃত্যু হলে তিনি কলকাতা যাত্রা করেন এবং সেখানে উচ্চ আদালতের উকিল লালমোহন গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িতে হিন্দি বইয়ের ইংরেজি তর্জমা করার কাজ পান। এই কাজের জন্য মাসে ত্রিশ টাকা বেতন পেতেন তিনি। ‘কুন্তলীন’ প্রতিযোগিতায় মন্দির গল্পটি লিখে পাঠালে, তা সেরা গল্প হিসেবে পারিশ্রমিক পায়।

১৯০৩ সালে তিনি রেঙ্গুনে চাকরি করতে যান। ১৯১২ সালে এক মাসের ছুটি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন এবং ‘যমুনা’ নামে পত্রিকার জন্য রামের সুমতি গল্পটি পাঠান, যা প্রকাশিত হয় চৈত্র সংখ্যা। পরে  ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার জন্যেও লেখা পাঠাতে থাকেন তিনি। যমুনা পত্রিকার সম্পাদক ফনীন্দ্রনাথ পাল বড়দিদি উপন্যাসটিকে পুস্তকাকারে প্রকাশ করেন এবং এমসি সরকার অ্যান্ড সন্স ও গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড সন্স অন্যান্য উপন্যাসগুলি পুস্তকাকারে প্রকাশিত করার উদ্যোগ নেন।

তিনি নারীর মননকে চিনতে শিখিয়েছিলেন। চরিত্রহীন, পরিনীতা, দেবদাস, শ্রীকান্তের মত উপন্যাসে বার বার তিনি চিনিয়ে দিয়েছিলেন, নারীদের মনের ভেতর কেমন করে উথাল পাতাল হয়, বিচ্ছেদের বেদনা ভুলে গিয়ে অন্যের জন্য কেমন করে তারা সব হাসি মুখে মেনে নেন। নারীদের মননের প্রতি লেখকের বিশেষ লেখনী ভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে সর্বদা। এমনটাও বলা যায়, মানুষের মনের ভেতরের কষ্টটা, বিশেষত নারীর মুখের হাসির ভেতরের দুঃখ তিনি লিখে দিতে পারতেন সাবলীলভাবে।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কালজয়ী উপন্যাস রচয়িতা হিসেবে কথাশিল্পী চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি দীর্ঘরোগভোগের শিকার হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে কখনই সুখী ছিলেন না। হয়ত তারই প্রতিফলন চোখে পড়ত তাঁর লেখনীতে। তিনি আজও অমর হয়ে রয়েছে শ্রীকান্তের রাতদুপুরে মাছ ধরতে যাওয়ার উত্তেজিত মূহুর্তে, তিনি আজও অমলিন হয়ে থাকবে দেওঘরের স্মৃতিতে।