বাংলাদেশে করোনা সংকটেও কমেনি সড়ক মৃত্যু

1 min read

।। মীর আব্দুল আলীম ।।

বিশ্বজুড়ে আতংক সৃষ্টিকারী করোনাও কি এদেশের সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে পারছে? করোনাকালেও সমানতালে সড়ক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। মহামারীর কারনে যখন যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অর্ধেক কমে গেলেও এ সময়ে বিগত জুন মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় সারা দেশে ৩৬৮ জন নিহত ও ৫১৮ জন আহত হয়েছেন। প্রতিদিন গড়ে ১২টিরও বেশি জীবন কেড়ে নিয়েছে ঘাতক ট্রাক বাস ও অন্য যন্ত্রদানব।

দুর্ঘটনার সব তথ্য যেহেতু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পায় না সেহেতু বলা যায়হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। একই সময় রেলপথে ২০টি দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহতও চারজন আহত হয়েছে। নৌ-পথে ১৭ টি দুর্ঘটনায় ৪৫ জন নিহত ও ৬০জন আহত এবং ১০জন নিখোঁজ রয়েছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।

দেখা গেছে একদিনে (৮ জুন) ২২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত এবং ২৫ জন আহত হয়। মোট দুর্ঘটনার ৫১ দশমিক ১২ শতাংশ গাড়ি চাপা দেওয়ার ঘটনা, ২৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ খাদে পড়ে, ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ বিবিধ কারণে, ১ দশমিক ১২ শতাংশ ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষ এবং ০ দশমিক ৫৬ শতাংশ চাকায় ওড়না পেছিয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে। মে মাসের তুলনায় জুন মাসে সড়ক দুর্ঘটনা ৫৬ দশমিক ১৪ শতাংশ, নিহত ৫৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ ও আহতের হার ৪৩
দশমিক ৮২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মে মাসে ২১৩টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৯২ জন। এছাড়াও আহত হয়েছেন আরও ২৬১ জন। নিহতের মধ্যে ৩৯ জন নারী ও ২৪ জন শিশু রয়েছে।
সড়ক নিরাপত্তায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম, দুর্নীতি ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি ও জবাবদিহিতার অভাবে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ফিটনেসবিহীন গাড়ি, দ্রুতগতি, অদক্ষ চালক, চালকের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা, বেতন ও
কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা ও দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ ১০টি কারণ তুলে ধওে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন প্রতিবেদন দাখিল করেছে ।

সড়ক দুর্ঘটনামানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি কেড়ে নিলেও তা বাস-ট্রাক চালকদেরসংবেদনশীলতায় প্রভাব বিস্তার করতে ব্যর্থ হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনাজনিত অপরাধ রোধে যে আইন আছে তাতে অপরাধীর জন্য কড়া শাস্তির বিধান থাকলেও তার কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী দেশের ট্রাফিকব্যবস্থার যাচ্ছেতাই অবস্থা। দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনতে দক্ষ চালক বাড়ানো, সব মহাসড়কে রোড ডিভাইডার, চালকদের কাজের সময় নির্ধারণ, চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করাসহ বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।

নানা অনিয়মের কারনে এদেশে প্রতিদিন সড়কে মূল্যবান প্রাণ যাচ্ছে। রাজীবের হাত যাচ্ছে, কারো পা যাচ্ছে, মাথা যাচ্ছে, মিশুক-মনির, সাইফুর রহমানদের জীবন যাচ্ছে। থামছে না সড়কে মৃত্যু মিছিল। আমরা বিশেষ দু’একজনের জন্য আহ্উ হ্ করি। প্রতিদিন কত খালিদ, কত হৃদয় পঙ্গু হচ্ছে, জীবন দিচ্ছে তার খোঁজ কি রাখি? আমরা কেন মৃত্যুর মিছিল রোধ করছি না? কেবল আলোচিত ঘটনায়
মন্ত্রী, এমপিরা ছুটে যায়,স্বজন কিংবা লাশের পাশে। আমরা মায়া কান্না করি; লাভ কি তাতে?

এদেশে আইন হয় আইনের প্রয়োগ হয়না কখনো। দ:ুক্ষজনক হলেও সত্য এদেশে আইন নিযন্ত্রণ করেন সড়ক পরিবহন নেতারা। আরও কষ্টের কথা হলো এদেশের সড়ক পরিবহনের শীর্ষ নেতা (শাহজাহান খান) সরকার দলেরর শীর্ষ পদের। সড়ক নিরাপদ করতে নয়া আইন হয়েছে। তা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে ১ নভেম্বর ২০১৯ থেকে। শুরুতে তর্জন গর্জন শুনেছি। ভালো লেগেছে। পরে দেখলাম শ্রমিক নেতাদের
দেনদরবারে হঠাৎ থমকে গেছে সরকার ও প্রশাসনের আইন প্রয়োগের কার্যক্রম। সড়ক নিয়ে আন্দোলনে নামা নিরাপদ সড়ক চাই এর প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস কাঞ্চন উল্টো শাহজাহান খানের হুমকির মুখে পড়েন। থমকে গেছে সড়ক আন্দোলনও।

তাই রাস্তায় আগের চেয়ে বেপরোয়া চালক। যা হবার তাই হচ্ছে সড়কে। মাঝে মাঝে আইন প্রয়োগের
কথা উঠলে; বড় কোন দুর্ঘটনায় সরকার মহলের হুঙ্কার শুনলে তৃপ্ত হই এই ভেবে যে এই বুঝি সড়ক নিরাপদ হচ্ছে। নিরাপদ সড়কের জন্য হাজারো হুঙ্কার আন্দোলন, ধর্মঘট, মিছিল, সমাবেশ কতকিছুই না হয়; সড়ক আর নিরাপদ হয় না। সড়ক অব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমানে জনগণ সোচ্চার হচ্ছে, দাবি উঠেছে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার। কিন্তু তা কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেল। এবিষয়ে কেউ মাথা
ঘামাচ্ছে বলে বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয়না। যে দেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নামে।

রাষ্ট্রের সর্ব্বোচ্চ পদের নেতৃবৃন্দ অঙ্গীকার করা সত্ত্বেও কোন কাজ হয়না। একটি সুসভ্য দেশে কিভাবে
সম্ভব হতে পারে? চালক, পথচারী সব ক্ষেত্রে আইন না মেনে চলার প্রবণতা এতটাই প্রকট যে আতঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না। বাস ও ট্রাক চালকরা তো সড়কপথে যথেচ্ছতা প্রদর্শনকে নিজেদের অধিকার বলে ভাবেন। দেশের যানবাহন চালকের সিংহভাগ প্রশিক্ষণ ছাড়াই গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পেয়েছেন।
যানবাহনের তুলনায় ড্রাইভিং লাইসেন্সের সংখ্যা কম থাকা কোনো সুস্থতার প্রমাণ নয়। ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্ব যাদের তাদের মধ্যে সততার সংকট থাকায় প্রশিক্ষিত চালক হলেই ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যাবে সে নিশ্চয়তা নেই বললেই চলে।

হাইওয়েতে মানুষ বা মানুষ চালিত বাহন চলাচল বন্ধ করে তাদের জন্য বিকল্প রাস্তা তৈরি করা প্রয়োজন। বীমা আইনের আওতায় বীমার টাকা তোলার বিষয়টি আরও সহজ করা দরকার। পুলিশ ও বিআরটিএ এর কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা জরুরি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ আসল লাইসেন্সকেও জালের অভিযোগে অভিযুক্ত করারও নজির রয়েছে। এতে সাধারণ জনগণ লাঞ্চিত হয় জনদুর্ভোগ বাড়ে। সড়কে বা মহাসড়কে উল্টোপথে রিঙা, টেঙি, থ্রি হুইলার, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল সহ যে কোন চলাচল কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। ক্রটিপূর্ণ যানবাহন সড়কে, মহাসড়কে উল্টোপথ গাড়ী চালানো যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। চালকদের অসাবধানতা, অদক্ষতা ও লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালক। অতিরিক্ত মাল ও যাত্রী বোঝাই, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় পথ অবরোধ, পথ-সভা, হরতাল প্রভৃতি কারণে যানজট সৃষ্টির ফলে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে।

এর ফলে অনেক সময় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। ওভারব্রিজের স্বল্পতা, অসাবধানে রাস্তা পারাপার বা রাস্তা
পারাপারের নিয়ম মেনে না চলা। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার যে চিত্র তা সত্যি ভয়াবহ এবং দুঃখ জনক। দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে ছিনিয়ে নিচ্ছে মানুষের অমূল্য জীবন।

দেশের উচ্চ আদালত ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে না চলতে নির্দেশনা দিয়েছেন। ফিটনেসবিহীন গাড়ি এখনও সড়কে চলছে। সরকার সিথিল হলে আইনের প্রয়োগ না হলে সড়কে মানুষতো মরবেই। উচ্চ আদালত ফিটনেসবিহীন গাড়িতে জ্বালানি সরবরাহ না করতেও নির্দেশনা দিয়েছে। জালানী পাম্প গুলোতে সাইনবোর্ডও লাগিয়ে দেয়া হয়েছে “ ফিটনেস ছাড়া জালানী সর্বরাহ করা হয় না”। সে নির্দেশ এখন অকার্যকর। হয়তো তা কার্যকর হবে না কখনো। এদেশে হাইকোর্টের নির্দেশকেও বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখায় তারা। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার পাকা রাস্তা রয়েছে যার মধ্যে মাত্র ৪০% হাইওয়ে সম্পন্ন এবং মোটরযানের সংখ্যা প্রায় ৪ লক্ষাধিক, রিঙা, ভ্যান, সাইকেল, ঠেলাগাড়ি, অটোরিঙা অগণিত এর কোন হিসেবে নেই।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে উন্নত দেশের তুলনায় যা প্রায় ৩০ গুণের বেশি। সর্বদিক বিবেচনা করে দেখা যায় যে আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য এককভাবে কেউ দায়ী নয়। নানাধিক কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের ট্রাফিক ব্যবস্থার দিকে আমরা নজর দিতে পারি। প্রয়োজনে ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং হাইওয়ে পুলিশকে শক্তিশালি করে অথবা সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে ভয়াবহ সড়কের নৈরাজ্য হতে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব বলে আমরা মনে করি।

সড়কে এভাবে মৃত্যু কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ কঠিন কোন কাজ নয়। প্রয়োজন সংশ্লিষ্টটদের স্বদিচ্ছা। সকলের সামগ্রিক চেষ্টা এবং আন্তরিকতার মাধ্যমে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।

 লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও গবেষক

এম/বি