Prothom Kolkata

Popular Bangla News Website

বারবার বহিরাগত বলছেন, তবে কি পঞ্চপান্ডবের ভয়ে কাঁপছে তৃণমূল!

1 min read

।। প্রথম কলকাতা ।।

পঞ্চাশের দশকে ইস্টবেঙ্গলের ভারত কাঁপানো মাঝমাঠ তথা ফরোয়ার্ড লাইনের কথা ফুটবলপ্রেমীরা আজকেও স্মরণ করেন। সেই দলের প্রধান পাঁচ ফুটবলার ছিলেন আমেদ খান, আপ্পারাও, সালে, বেঙ্কটেশ এবং ধনরাজ। সেই থেকে কলকাতা ময়দানে পঞ্চপান্ডব কথাটি মিথ হয়ে যায়। ইস্টবেঙ্গলের পঞ্চপান্ডবের ঝলকানিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠত মাঠ। শুধু ইস্টবেঙ্গলের সমর্থকরা বলে নন, মোহনবাগান সমর্থকদের প্রশংসাও আদায় করে নিতেন তাঁরা। সম্প্রতিককালে বাংলার রাজনীতিতে ফিরে এসেছে সেই পঞ্চপান্ডবের কথা। সৌজন্যে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যকে পাঁচটি জোনে ভাগ করে একেকটিতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে ৫ কেন্দ্রীয় নেতার ওপর।

তাঁরা হলেন সুনীল দেওধর, হরিশ দ্বিবেদী, বিনোদ তাওড়ে, বিনোদ শোনকর এবং দুষ্যন্ত গৌতম। আর তাঁদের বহিরাগত বলে প্রতিদিন নিয়ম করে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপিকে তোপ দেগে চলেছে। ভারতবর্ষ একটা অখন্ড দেশ বলেই মনে করেন তামাম দেশবাসী। সেখানে বহিরাগত মানে একটাই দাঁড়ায়, কেউ দেশের বাইরে থেকে এসেছেন কিনা। সাধারণভাবে তাঁকেই আমরা বহিরাগত বলে মনে করি। কিন্তু তৃণমূল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণেই যে বিজেপির ৫ কেন্দ্রীয় নেতাকে বহিরাগত বলে তোপ দেগে চলেছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে যাচ্ছে শ্যামসুন্দর শর্মার কথা। এই নামটি কি এখন মনে আছে বর্তমান তৃণমূল নেতৃত্বের? তৃণমূলের যে নেতানেত্রীরা নিয়মিত বিজেপিকে বহিরাগত ইস্যুতে নিশানা করছেন তাঁদেরও কি নামটা স্মরণে আছে? থাকলে তাঁদের মনে পড়বে ২০১২ সালের উত্তরপ্রদেশে বিধানসভার একটি উপনির্বাচনের কথা। সেখানে মন্ট বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী শ্যামসুন্দর শর্মা জয়ী হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে মনিপুর সহ বিভিন্ন রাজ্যে তৃণমূল নির্বাচনে লড়াই করেছে এবং তাদের দল থেকে জিতে বিধায়করা বিধানসভায় গিয়েছেন। অতীতে লোকসভা নির্বাচনেও পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বেশ কয়েকটি রাজ্যে তৃণমূল প্রার্থী দিয়েছে।

এক সময় বলিউড কাঁপানো অভিনেতা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায় দিল্লিতে তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছিলেন। তাতে তো অন্যায় কিছু করেনি তৃণমূল। কারণ বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল তৃণমূল সর্বভারতীয় দলের মর্যাদা পেয়েছে।একটা সর্বভারতীয় দল দেশের মধ্যে বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী দেবে, এটাই তো স্বাভাবিক। রাজ্যের নেতা-নেত্রীরা বিভিন্ন ইস্যুতে ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যে যাবেন নিজেদের কর্মসূচির কথা বলতে, এটাই তো রাজনীতির চেনা ছন্দ। সাম্প্রতিক অতীতে তৃণমূল নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিহারে গান্ধী ময়দানে ভাষণ দিয়েছেন বিজেপির বিরুদ্ধে হওয়া একটি জনসভায়।

সেই জনসভার উদ্যোক্তা ছিল আরজেডি। একইভাবে গত লোকসভা নির্বাচনের আগে তেলেগু দেশম পার্টির সুপ্রিমো চন্দ্রবাবু নাইডুর উদ্যোগে অন্ধ্রপ্রদেশে যে বিশাল জনসভা হয় সেখানেও বক্তব্য রাখতে গিয়েছিলেন মমতা। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার অনেক আগেই মমতা দেশ জোড়া খ্যাতি অর্জন করেন। এক কথায় তিনি একজন প্রথম সারির জাতীয় রাজনীতিক। কিন্তু মজার কথা হল তৃণমূল যখন বিভিন্ন রাজ্যে গিয়ে রাজনীতি করছে, কোথাও বড় সমস্যা হলে সেখানে প্রতিনিধিদল পাঠাচ্ছে, কিন্তু বাংলায় বিজেপি বা কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতারা আসলে তাঁর অসুবিধাটা কোথায়? কংগ্রেস নেতা তথা স্বনামধন্য আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি এ রাজ্যে এসে তৃণমূলের সমর্থনে রাজ্যসভার সদস্য হয়েছেন।

সেই অর্থে অভিষেক মনু সিংভিও তাহলে বহিরাগত। তবে কি বহিরাগত শব্দটির সংজ্ঞা নতুন করে লিখতে চাইছে তৃণমূল? সবচেয়ে বড় কথা গত কয়েকদিন ধরে ধারাবাহিক সাংবাদিক সম্মেলন করে বহিরাগত ইস্যুটিকে নিয়ে তৃণমূল কার্যত বাঙালি এবং অবাঙালির মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করতে চাইছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। বাংলার রাজনীতিতে এমনটা অতীতে কোনো দিন হয়নি। তাহলে তো এখানে জাতি দাঙ্গার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যেতে পারে।

যেটা একটা সময় হয়েছিল মহারাষ্ট্রে। শিবসেনা থেকে বেরিয়ে নতুন দল তৈরি করেছিলেন রাজ ঠাকরে। সেই নতুন দল মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনার একটা প্রধান কর্মসূচি হয়ে উঠেছিল মহারাষ্ট্র থেকে বিহার এবং উত্তর প্রদেশের লোকজনদের তাড়িয়ে দেওয়া। যা নিয়ে রাজ্যের পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে কিন্তু মুম্বাই তথা মহারাষ্ট্রে রাজের নয়া দল একেবারেই প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। কোনো নির্বাচনে তারা একটা, দুটোর বেশি আসন জিততে পারেনি। তাই যেভাবে বিজেপির ৫ কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন তৃণমূল নেতৃত্ব, তাতে মনে পড়ে যায় পড়শি রাজ্য অসমের কথা। সেখানে যখন বাঙালি খেদাও অভিযান শুরু হয়েছিল তখন তার নিন্দায় সরব হয় সব মহল।

তবে কি আগামী দিনে আমাদের রাজ্যে এমন কোনো ঘটনা ঘটতে পারে? দু’দিন আগেই রাজ্যের মন্ত্রী তথা বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ব্রাত্য বসু যেভাবে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে বাঙালি-অবাঙালি দ্বন্দ্ব উস্কে দিয়েছেন, তা কিন্তু শিক্ষিত বাঙালি সমাজ ভালোভাবে গ্রহণ করছে না। তৃণমূল নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপসহীন সংগ্রামের কাহিনী সকলেরই জানা। লড়াই-সংগ্রাম আন্দোলনের মঞ্চে তাঁর একটা উজ্জ্বল ইতিহাস আছে। সেই কারণেই তিনি সিপিএম তথা বামেদের ৩৪ বছরের শাসন কালকে সরিয়ে দিয়ে তৃণমূলকে ক্ষমতায় আনতে পেরেছেন রাজ্যে।

সেই জন্য তাকে কুর্নিশ জানাতে দ্বিধা করেন না তামাম রাজনীতিক তথা রাজনৈতিক দলগুলি। তাই মনে হচ্ছে তবে কি এবার মমতা ভয় পেয়ে গিয়েছেন বিজেপিকে? প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এঁটে উঠতে পারছেন না বলে তবে কি পাঁচ কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে বহিরাগত তত্ত্ব নিয়ে আসছেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে? এই প্রশ্ন শুধু রাজনৈতিক মহলের নয়, এই প্রশ্ন গোটা রাজ্যের মানুষের। এমনকি তৃণমূলের বহু সৎ, নিষ্ঠাবান কর্মী-সমর্থকরা পর্যন্ত অবাক হয়ে গেছেন দলের নেতাদের এমন বক্তব্যে। বিজেপি একটি সর্বভারতীয় দল। তাদের দলের নেতারা প্রতিটি রাজ্যে যাবেন, প্রচার করবেন, সাংগঠনিক দিক দেখবেন এটাই তো স্বাভাবিক।

এ রাজ্যে বিধানসভা ও লোকসভা, প্রতিটি নির্বাচনেই প্রার্থী দেয় মায়াবতীর দল বহু জন সমাজ পার্টি। এমনকি মহারাষ্ট্রের দল শিবসেনা রাজ্যের বিভিন্ন নির্বাচনে প্রতিবছরই প্রার্থী দেয়। সমাজবাদী পার্টি, আর জে ডি প্রভৃতি দলগুলিও রাজ্যে প্রার্থী দেয়। এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রতিটি নির্বাচনের আগে এক একটি রাজ্যে দলের তরফে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে আসছে বছরের পর বছর ধরে।

কিন্তু সেই সব বিষয় নিয়ে তৃণমূল কোনো দিন প্রশ্ন তোলেনি। আসলে প্রশ্ন তোলবার তো জায়গাই নেই। কংগ্রেস, বিজেপি বা অন্যান্য দলগুলি তো কোনো ভুল কাজ করছে না। কিন্তু বর্তমানে তৃণমূল যেভাবে বিজেপির পঞ্চপান্ডবকে বহিরাগত তকমা দিয়ে বাজার গরম করতে চাইছে, তাতে সকলেই মনে করছে যে জোড়াফুল শিবির একেবারেই ঠিক কাজ করছে না। এতে তৃণমূলের হিতে বিপরীত হতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।