লাভপুরের লাল মাটির ঘাসবনে মাথা তুলছে পদ্ম


।। ময়ুখ বসু ।।


একদিকে করোনা, অন্যদিকে উৎসবের মরশুম। আর এই দুইয়ের সঙ্গে বাংলার মাটিতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভোটের উত্তাপ। রাজ্যের কোন জেলার কোন কোন বিধানসভা এলাকায় কোন রাজনৈতিক দলের অবস্থান কেমন তা নিয়ে এখন থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কোন কেন্দ্রে কোন রাজনৈতিক দল শেষে হাসি হাসবেন তা জানতে আমাদের নজর সর্বক্ষণ রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভাতে।

ভোটের আগেই ভোটের হাওয়া আপনাদের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে আমাদের এই প্রয়াস। আজকের বিধানসভা কেন্দ্র বীরভূম জেলার লাভপুর বিধানসভা কেন্দ্র। এই কেন্দ্রের মোট ভোটারসংখ্যা আনুমানিক ১ লক্ষ ৮৬ হাজার ৮৫২ জন। ১৯৫৭, ১৯৬২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৭২, ১৯৭৭, ১৯৮২, ১৯৮৭, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৬ সালে এই কেন্দ্রে জয় লাভ করে সিপিএম। ১৯৬৭ সালে এই কেন্দ্রের দখল নেয় কংগ্রেস। ২০১১ সালে এসে এই কেন্দ্রে দখল নেয় তৃণমূল।

২০১১ সালে তৃণমূলের প্রার্থী মণিরুল ইসলাম ৭৮ হাজার ৬৯৭ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তিনি পান ৪৭,৬৮ শতাংশ ভোট। সেই সময় দ্বিতীয় স্থান দখলে নেয় সিপিএমের নবনীতা মুখার্জী। তিনি পান ৭৫ হাজার ৬৯১ টি ভোট। যা ছিলো ৪৫,৮৬ শতাংশ ভোট। তৃতীয় স্থান দখল করে বিজেপি প্রার্থী কাশীনাথ মিশ্র। তিনি পান ১০ হাজার ৬৬৮ টি ভোট। যা ছিলো ভোট শতাংশের হিসাবে ৬,৪৬ শতাংশ। লালামাটির এই দেশে বাম সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলের যে ব্যাপকহারে বাড়বাড়ন্ত ঘটেছিলো সেকথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

তবে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে থেকেই এই কেন্দ্রে ঘটতে শুরু করে ছন্দপতন। শাসক শিবিরে একদিকে যেমন ভাঙ্গনের রেখা স্পষ্ট হতে শুরু করে, তেমনি, শাসক বিরোধীতায় বাম শিবিরের একটা বড়ো অংশ নীতি আদর্শকে চুলোয় দিয়ে হেলে পড়তে শুরু করে গেরুয়া শিবিরের দিকে। ফলে এই কেন্দ্রে শক্তি বাড়াতে শিরু করে বিজেপি। এমনকী ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগেই কেন্দ্রের দাপুটে তৃণমূল নেতা তথা বিধায়ক মণিরুল ইসলাম মুকুল রায়ের হাত ধরে যোগ দেন বিজেপিতে।

আরো পড়ুন : ২০২১ বিধানসভা ভোট , গোর্খা জনমুক্তি মোর্চাই ঘাম ঝরাবে শাসকের

যা নিয়ে অবশ্য বিজেপির অভ্যন্তরে ক্ষোভ বিক্ষোভ কম হয়নি। তবে সেই সব অংক সরিয়ে রাখলে মোদ্দা বিষয়, এই কেন্দ্রে শাসক যে তাদের সাংগাঠনিক রাশ শক্ত হাতে ধরে রাখতে পারেনি তা মণিরুলের বিজেপিতে যোগদান প্রমান করে দিয়েছিলো। লাভপুর কেন্দ্রে একটা সময় সিপিএমের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি থাকলেও ২০১১ সালে রাজ্যে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই বাম ভোটব্যাংকের একটা বড়ো অংশ চলে যায় তৃণমূল শিবিরে। তবে সেটা বেশীদিন স্থায়ী হয়নি।

মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে শাসক শিবিরের গোষ্ঠীকোন্দল, নানা দুর্নীতি সামনে চলে আসায় সেই বাম ভোটব্যাংকেও ফাটল ধরতে শুরু করে। যারমধ্যে একটা অংশ সরাসরি শাসক বিরোধীতার তাগিদে বিজেপিতে নাম লেখাতে শুরু করে। আর তাছাড়া এই কেন্দ্রের বেশ কিছু শাসক দলের নেতাদের সঙ্গে মুকুল রায়ের সখ্যতার মাত্রা যথেষ্ট ভালো থাকায় মুকুল রায়ের থাবা সরাসরি এই কেন্দ্রে পড়তে অসুবিধা ঘটেনি।

যারফলে শক্ত ভিতের উপর দাড়িয়েও তৃণমূলের জমিতে পদ্ম পাপড়ি মেলেছে। তবে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রের জমি ধরে রাখতে গেলে শাসককে তাদের সাংগাঠনিক শক্তিকে সবার আগে পাকাপোক্ত করতে হবে। কারন, সংগঠনে সামান্য স্যাবোতাজ ঘটলেই এই কেন্দ্রের যাবতীয় হিসেব নিকেশ ওলট পালট হয়ে যেতে পারে।

তবে এই কেন্দ্রে যদি বাম কংগ্রেস জোট হয় সেক্ষেত্রে বাম ভোটব্যাংক যদি নিজেদের ঘরে ফিরে আসে তাহলে জোট রাজনীতি এখানে শেষ কথা বলতে পারে। যদিও সেই সম্ভাবনা খুবই কম বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারনা। এই কেন্দ্রে মূলত শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে সমানে সমান টেক্কা নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বিজেপির। তবে রাজনৈতিক অংক মেনে যদি শাসক ঠিকঠাক ঘুটি সাজাতে পারে তাহলে শাসকের স্বস্তি আসতেই পারে।

Categories