নবরাত্রিতে নবদুর্গার আরাধনার কাহিনী

।। স্বর্ণালী তালুকদার ।। কলকাতা ।। 

দুর্গাপুজোর সঙ্গে আরও একটি উৎসব পালিত হয়, যেখানে মা দুর্গার নয়টি রূপের আরাধনা করা হয়। এই পুজো শুরু হয় মহালয়ার পরের দিন, অর্থাৎ প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত। ২০২১ সালে মহালয়ার তিথি পুজো শুরু হওয়ার অনেক আগে চলে গেলেও, নিয়ম অনুযায়ী দুর্গাপুজোর মাসের তিথি অনুযায়ী প্রতিপদে, অর্থাৎ ১৭ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে নবরাত্রির উৎসব। প্রতিবছরের মত বড় করে অনুষ্ঠানে করার বিষয়ে বাধা নিষেধ থাকলেও ঘরে বসে পুজোর নিয়ম রীতি পালনে কোনও বাদ রাখছেন না কেউই।

পুরান মতে, ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। রাবণবধ ও দেবী সীতাকে উদ্ধারের জন্য রামচন্দ্র অভয়াশঙ্করী দুর্গার অকালবোধন করে নবরাত্রির ব্রত পালন করেছিলেন। নবরাত্রির ব্রত পালন করা হয় আশ্বিনের শুক্লা প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত। পিতামহ ব্রহ্মা দেবী দুর্গার এই নয়টি রূপের নামকরণ করেছিলেন। শ্রীশ্রী চন্ডীতে দেবীর নয়টি রূপের কথা উল্লেখ করা রয়েছে।

সাধারণতঃ ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে নবরাত্রির উৎসব পালন করা হয়ে থাকে। নয় দিন ধরে মায়ের নয়টি শক্তিকে আরাধনা করা হয়ে থাকে। তাই দুর্গাপুজোর কিছু নিয়ম কানুনের সঙ্গে এই পুজোর বেশ সামঞ্জস্য রয়েছে। যদিও রয়েছে বহু বৈসাদৃশ্য। জেনে নিন, এই নয়দিন মায়ের কোন কোন রূপের আরাধনা করা হয়।

নবরাত্রি কথাটির শীর্ষক অর্থ নয়টি রাত। এই পুজো সাধারণতঃ রাতে করা হয়। সারাদিন উপোস থেকে রাতে মায়ের আরাধনা করে তবে খাবার খাওয়া যায়। এই পুজোর দিনগুলোতে বাড়িতে আমিষ খাওয়া নিষিদ্ধ থাকে। পেঁয়াজ, রসুনের মত সবজীও বাদ রাখা হয় দৈনন্দিন খাবারের তালিকা থেকে।

প্রথম রাতে পুজিত হন শৈলপুত্রী, মায়ের প্রথম রূপ। মা দুর্গা হলেন হিমালয় পর্বতের পুত্রী, এবং হিমালয়কে শৈল নামেও আরাধনা করা হয়। তাই শৈলপুত্রী রূপে পুজিত হন দেবী, যার বাহন ষাঁড়, এক হাতে ত্রিশূল এবং অন্য হাতে পদ্মফুল থাকে।

দ্বিতীয় দিন রাতে পুজিত হন দেবী ব্রক্ষ্মচারিনী রূপে। দেবী এইদিন জ্ঞান দান করেন পিতামহ ব্রক্ষ্মাকে এবং ভক্তদেরও তিনি ব্রক্ষ্মপ্রাপ্তি করিয়ে দেন। এইদিন মায়ের একহাতে থাকে রুদ্রাক্ষের জপমালা এবং অন্যহাতে কমন্ডলু। মায়ের মৃন্ময়ী রূপের আরাধনা করা হয় এই দিন।

তৃতীয় দিনের রাতে নবদুর্গার চন্দ্রঘণ্টা রূপের। দেবীর মাথায় থাকে চাঁদ এবং হাতে থাকে ঘন্টা। কথিত রয়েছে দেবীদুর্গাকে দেবরাজ ইন্দ্র ঘণ্টা দান করেছিলেন, যাতে গজরাজ ঐরাবতের মহাশক্তি সমাহিত ছিল। যুদ্ধের সময় মা এই ঘন্টা ব্যবহার করেছিলেন, এবং সেই চাঁদের রূপের অধিকারিনী হয়েছিলেন। তাই দেবীর এই রূপের নাম চন্দ্রঘন্টা।

চতুর্থ রাতে দেবী কুষ্মাণ্ডার রূপে পুজিত হন। এখানে উষ্মার অর্থ হল তাপ। পুরান মতে, দুর্বিষহ ত্রিতাপ হল কুষ্মা, যিনি ত্রিতাপকে নিজের পেটে বা অন্ডে ধারণ করার ক্ষমতা রাখেন। দেবী এই রূপ ধারণ করার পরেই মহাবিশ্বের সৃষ্টি রচনা করেছিলেন, যেই কারণে তিনি বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে পুজিত হন।  দেবী এখানে সিংহবাহিনী। কখনও দশ হাত কখনও আট হাতে পুজিত হন তিনি।

দেবী দুর্গার পঞ্চম রূপ হল স্কন্দমাতা। দেবসেনাপতি কার্তিক ঠাকুরের অপর নাম স্কন্দ এবং দেবী কার্তিক দেবের বা স্কন্দের মাতা। এই দিন দেবী মায়ের রূপে পুজিত হন। দেবী এইদিন চার হাত বিশিষ্ট রূপে পুজিত হন। এক হাতে কোলে বসেছেন কার্তিক। বাঁ হাতে বরাভয় দিচ্ছেন জগৎ সংসারকে।

পুরাণ মতে, ঋষি কাত্যায়নের কন্যারূপে দেবী জন্ম নিয়েছিলেন। দেবীর কাছে তিনি প্রার্থনাা করেছিলেন একটি কন্যাসন্তানের জন্য। ঋষির বন্দনায় তুষ্ঠ হয়ে দেবী নিজেই সন্তানরূপে ঋষি কাত্যায়নীর ঘর আলো করেছিলেন। ষষ্ঠদিনে দেবী কাত্যায়নী রূপে পুজিত হন।

সপ্তম রাতে কালরাত্রি রূপে দেবী পুজিত হন। অনন্ত মহাকাশে নৃত্যরত কালভৈরবের দেহাাংশ থেকে জন্ম নেন দেবী যোগনিদ্রা মহাকালিকা, যিনি কৃষ্ণবর্না হওয়ায় কালরাত্রি নামেও পরিচিত। দেবী এখানে ভীষণদর্শনা এবং এলোকেশী, গলায় বজ্রের মালা, নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে ভয়ংকর অগ্নিশিখা বের হয়। দেবীর বাহন গাধা। দৈত্য, দানব, রাক্ষস, ভূত, প্রেত সহ সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাশ করেন দেবী কালরাত্রি।

অষ্টম রাতে পুজো হয় মহাগৌরি রূপের।  দেবী এখানে সন্তানবৎসলা, শিবসোহাগিনী। মায়ের প্রসন্ন মুর্তির রাধনা করা হয় এই দিন। জীবনের পাপ স্খলন করতে দেবী মহাগৌরীর আরাধনা করা হয়। কথিত রয়েছে, দেবী আসলে কৃষ্ণবর্ণা, তবে মহাদেব তাঁকে গঙ্গাজল দিয়ে স্নান করিয়ে দিলে তিনি গৌরবর্ণ ধারণ করেন।

নবম রাতে দেবী সিদ্ধিদাত্রী রূপে পুজিত হন। এই দিন দেবী পদ্মের উপর অধিষ্ঠিত থাকেন। অপরূপ লাবণ্যময়ী চতুর্ভুজা, ত্রিনয়নী, প্রাতঃসূর্যের মত তেজস্বী মাহেশ্বরীকে স্বয়ং মহাদেব সিদ্ধিদাত্রী রূপে পুজা করেছিলেন। দেবীর সিদ্ধিতেই মহাদেব অর্ধনারীশ্বর রূপ ধারণ করতে পেরেছিলেন। শোনা যায়, সিদ্ধিলাভের জন্য দেবীর এই রূপের আরাধনা করা হয় নবরাত্রির শেষ দিন।