ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশেরই ‘মুক্তিযোদ্ধা’ চট্টগ্রামের মেয়ে কল্পনা দত্ত

1 min read

।। চট্টগ্রাম প্রতিনিধি, বাংলাদেশ ।।

অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। একসঙ্গে দুই দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে এমন বিপ্লবীর দেখা প্রায় নেই বললেও ভুল হবে না। এই ভারতেই ছিলেন এমন এক স্বাধীনতা সংগ্রামী। যিনি ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ের স্বাধীনতা যুদ্ধে নিবেদন করেছিলেন জীবন। তিনি কল্পনা দত্ত।

বেথুন কলেজে পড়ার সময় তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় প্রীতিলতা ওয়াদ্দদেদারের। সেখান থেকেই একাত্ম হয়ে পড়া মাস্টারদা সূর্য সেনের সঙ্গে। শুরু হয় ভারতের স্বাধীনতার জন্য কল্পনা দত্তের লড়াই। থাকেন ছাত্রীনিবাসে। এখানে মাষ্টারদার নির্দেশে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। গড়ে তোলেন এক বিপ্লবী চক্র। এই বিপ্লবীচক্রে অনেক মেয়ে সদস্য যোগ দেন। এই বিপ্লবীচক্রে কল্পনা দত্ত যুক্ত হলেন। এই চক্রের মূল কাজই ছিল বিপ্লবীকর্মী তৈরীর পাশাপাশি অর্থ সংগ্রহ করা।

অর্থ সংগ্রহ করে প্রীতিলতা চট্টগ্রামে পাঠাতেন। একই সময় কল্পনা দত্ত কল্যাণী দাসের ‘ছাত্রীসংঘ’-এ যুক্ত ছিলেন। এসময় বেথুন কলেজে হরতাল পালন এবং অন্যান্য আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এই সময় তিনি বিপ্লবী নেতা পুর্ণেন্দু দস্তিদারের সংস্পর্শে আসেন, যিনি ছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেনের একান্ত অনুগামী।

পুর্ণেন্দু দস্তিদার ও প্রীতিলতার প্রভাবেই কল্পনা দত্ত বিপ্লবী দলে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৯২৯ সালে চট্টগ্রাম বিপ্লবীদের উদ্যোগে চট্টগ্রাম জেলা রাজনৈতিক সম্মেলন, যুব সম্মেলন, ছাত্র সম্মেলন ও নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে স্বেচ্ছাসেবিকার দায়িত্বের মধ্যে দিয়ে কল্পনা দত্তের বিপ্লবী রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়।

ওই সময় কলকাতায় বিপ্লবীদের এক গোপন কারখানায় তখন তৈরি হত বোমার খোল। মাষ্টারদার নির্দেশ অনুযায়ী সে বোমার খোল সংগ্রহ করেন প্রীতিলতা। ওই বছরের শেষের দিকে পূজার ছুটিতে প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত, সরোজিনি পাল, নলিনী পাল, কুমুদিনী রবিত চট্টগ্রাম আসেন। মাষ্টারদার নির্দেশে তাঁরা বোমার খোলগুলো পৌঁছে দেন বিপ্লবীদের হাতে।

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল মাষ্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে কল্পনা দত্ত ও সহকারী বিপ্লবীরা সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল করেন। জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধের পর ব্রিটিশ সরকার অস্ত্রাগার লুন্ঠনের দায়ে অনন্ত সিংহ, গণেশ ঘোষ ও লোকনাথ বলসহ আরও অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করে।

মাষ্টারদা সূর্যসেন চলে যান আত্মগোপনে। মে মাসের প্রথম দিকে বিপ্লবে অংশ নিতে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে চলে আসেন। অনেক কষ্টে তাঁরা মাস্টারদার সাথে দেখা করতে সক্ষম হন। তাঁরা উভয়েই মাস্টারদার কাছে সশস্ত্র বিপ্লবে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হওয়ার প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেন। মাস্টারদা তাঁদেরকে বিপ্লবী দলের শপথ বাক্য পাঠ করান।

তখন থেকে তাঁরা বিপ্লবী দলের অধিনায়ক সূর্যসেনের নির্দেশ মতো কাজ করে যান। এসময় প্রীতিলতা চট্টগ্রাম নন্দনকানন বালিকা মধ্য ইংরেজি স্কুলে শিক্ষয়িত্রীর হিসেবে চাকুরী নেন। আর কল্পনা দত্ত চট্টগ্রাম কলেজে বি.এস.সি.তে ভর্তি হন। পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে গোপনে গোপনে চলতে থাকে বিপ্লবী দলের কার্যক্রম।

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল, জালালাবাদ সম্মুখ সমর, কালারপোল, ফেনী, ঢাকা, কুমিল্লা, চন্দননগর ও ধলঘাটের বীরোচিত সংগ্রামের অধ্যায়গুলো মুক্তিকামী বিদ্রোহীদের নতুন প্রেরণা যুগিয়েছিল। ১৯৩১ সালের মে মাসে ছাড়া পাওয়ার পর কলকাতা থেকে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বিস্ফোরক দ্রব্য কৌশলে নিয়ে আসার দায়িত্ব পান। ডিনামাইট ফিউজ দিয়ে চট্টগ্রাম আদালত ভবন ও কারাগার উড়িয়ে দিয়ে বিচারাধীন বিপ্লবীদের মুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল তাঁর।

১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী সমুদ্রতীরবর্তী গৈরালা গ্রামে ইংরেজ ফৌজের সঙ্গে সংঘর্ষে মাস্টারদা ও তারকেশ্বর দস্তিদারের সঙ্গী ছিলেন তিনি। পরে মাস্টারদা ও ব্রজেন সেন পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও কল্পনা দত্ত পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু তিন মাস পর ১৯ মে গৈরালা গ্রামে এক সশস্ত্র সংঘর্ষের পর কল্পনা দত্ত এবং তাঁর সতীর্থ কয়েকজন বিপ্লবী ধরা পড়েন।

ওই বছর ১৪ আগস্ট একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সূর্যসেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারকে ফাঁসি দেয় এবং অন্যদেরকে আন্দামান সেলুলার জেলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল মামলার দ্বিতীয় বিচার পর্বে কল্পনা দত্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। জেলে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি পড়াশোনা করতেন। প্রায় ৬ বছর কারাভোগের পর এই বিপ্লবী নেত্রী ১৯৩৯ সালে কারামুক্ত হন।

ইতিমধ্যে তাঁর মামলা চালাতে গিয়ে বাবা সহায় সম্বলহীন হয়ে পড়েন। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের উত্তরে যে বড় দোতলা বাড়ি ছিল তাও হারাতে হয়েছে তাঁকে। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে কল্পনা দত্ত চট্টগ্রামে গিয়ে দেখেন প্রাক্তন বিপ্লবীরা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছেন। কমিউনিস্ট পার্টি যে পথে দেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছে, সেই পথই ঠিক মনে হওয়ায় কল্পনা দত্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন।

কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী হিসেবে বাংলার দুর্ভিক্ষের সময় চট্টগ্রামে থেকে তিনি কাজ করেছেন। সেই সময় পিপলস ওয়ার পত্রিকায় তাঁর বহু রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে । ১৯৪০ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পুলিশ তাঁকে স্বগৃহে অন্তরীণ রাখে। এরপর তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেন।

১৯৪০ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হন। ওই বছর মুম্বইতে এক সম্মেলনে কল্পনা দত্ত চট্টগ্রামের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেন। সেখানেই পি.সি. যোশীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ১৯৪৪ সালে যোশীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। পিসি যোশী তদানীন্তন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক ছিলেন। এরপর তিনি চট্টগ্রামে ফিরে যান এবং দলের মহিলা ও কৃষক সংগঠনকে গড়ে তোলেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় কল্পনা দত্ত নানাভাবে সহযোগিতা করেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ ও খাবার সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে অন্যান্য বিপ্লবী কমরেডদের সাথে কল্পনা দত্ত চট্টগ্রামে আসেন। সেখানে ‘মিউনিসিপ্যাল স্কুল’ প্রাঙ্গণে বিপ্লবী দলকে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়।