Prothom Kolkata

Popular Bangla News Website

চপ ভাজা ‘শিল্প’ থেকে স্থায়ী চাকরি, বঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির হাতিয়ার কর্মসংস্থান ইস্যু

1 min read

||প্রথম কলকাতা ||

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন, চপ ভেজে বহু যুবক সংসার চালাচ্ছেন। তখন থেকেই বিষয়টি নিয়ে বিরোধীরা ময়দানে নেমে পড়ে। রাজ্যে বেকার সমস্যা জ্বলন্ত আকার ধারণ করেছে। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী পরোক্ষে চপের দোকান খোলার কথা বলছেন, এই অভিযোগ সামনে এনে সোচ্চার হয় বিরোধীরা। একুশের নির্বাচনে বিজেপি তথা অন্যান্য বিরোধী দলগুলির অন্যতম হাতিয়ার বেকার সমস্যা ইস্যু। বিজেপি দাবি করছে তারা ক্ষমতায় এলে সোনার বাংলা হবে। সোনার বাংলার একটা বড় দিক হবে প্রচুর চাকরি। এই দাবি নিয়মিত করছেন রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। যদিও তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধীদের অভিযোগ মানতে নারাজ। তাঁর দাবি বাংলায় বেকার সমস্যা তৃণমূল সরকারের আমলে ৪০ শতাংশ কমে গিয়েছে। যেখানে অন্যান্য রাজ্যে বেকার সমস্যা জ্বলন্ত আকার ধারণ করেছে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে প্রচুর চাকরি হচ্ছে, এমনটা বলছেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু সত্যিই কি অবস্থাটা তাই?

বিরোধীদের অভিযোগ সিভিক ভলান্টিয়ার, আইসিডিএস কর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, আশা কর্মী, প্রাণি মিত্র প্রভৃতি ক্ষেত্রে যে হাজার হাজার পুরুষ মহিলা কাজ করছেন তাঁদের মাসিক বেতন সর্বোচ্চ নয় হাজারের বেশি নয়। সাম্প্রতিককালে এক হাজার টাকা বেড়ে সেটা হয়েছে। এমনকি প্রাণি মিত্র পদে যারা রয়েছেন তাঁদের মাসিক বেতন বেড়ে হয়েছে মাত্র তিন হাজার টাকা। অন্যান্য ক্ষেত্রে অবস্থাটা একই রকম। বিরোধীদের অভিযোগ, এই হাজার হাজার যুবক-যুবতী চাকরি করছেন, এমনটাই বলেন মুখ্যমন্ত্রী। এই প্রসঙ্গে রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজয শঙ্কর সিনহা বলেন, ” এগুলোকে যদি চাকরি বলেন তাহলে আমাদের কিছু বলার নেই। ওদের জীবন শেষ। এই টাকায় সংসার চলে! এই মুহূর্তে রাজ্যে শূন্য পদের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ লক্ষ। সেখানে নতুন লোক না নিয়ে অবসরপ্রাপ্তদের নামমাত্র বেতন দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই রি- এমপ্লয়মেন্ট সিস্টেমের বিরোধিতা করে আসছি। আমরা চাই বেকাররা চাকরি পাক। কিন্তু সরকার সেই পথে হাঁটতে চায় না।” সূত্রের খবর, রাজ্যের অসংখ্য সরকারি অফিসে বিভিন্ন দপ্তরে অবসরপ্রাপ্তরা কাজ করছেন। তাঁদের বেতন ১০-১৫ হাজারের মধ্যে। উল্লেখ্য সেই পথে নতুন নিয়োগ করলে তাঁদের বেতন বহু বেশি হবে ‌। এই ব্যবস্থায় রাজ্য সরকার প্রতি বছরে কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় করছে। ঠিক এই জায়গা থেকেই বিজেপি বিষয়টি নিয়ে বহুদিন আগেই আসরে নেমেছে।

সবাইকে সরকারি চাকরি দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু রাজ্যে কাজের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রচুর শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ গত দশ বছরে রাজ্য সেই পথে হাঁটেনি। এমনকী কেন্দ্রীয় সরকার কোনও প্রকল্প করতে এগিয়ে আসলে সেখানে অসহযোগিতা করা হয়েছে।‌ এই বিষয়ে সোমবার সাংবাদিক সম্মেলনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ অভিযোগ করে বলেন, রাজ্য সরকার আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করছে না। আমরা ২৬ কোটির একটি ইলেকট্রনিক্স প্রজেক্ট করতে চেয়েছিলাম বাংলায়। কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে অনুমতি দেয়নি রাজ্য। মালদাতেও এমন একটা পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহযোগিতার হাত বাড়ান না। বিজেপির অভিযোগ, পাছে কেন্দ্রের সুনাম হয় সেই কারণেই তিনি এমন অবস্থান নিয়েছেন।

একুশের নির্বাচনের আগে কর্মসংস্থান ইস্যু অত্যন্ত বড় আকার ধারণ করেছে। ঠিকা কর্মী থেকে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের একটা অংশ স্থায়ী চাকরিসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছেন। দিনের-পর-দিন অবস্থান-বিক্ষোভ বা অনশন কর্মসূচিতে সামিল হয়েছেন। তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে পুলিশ দিয়ে সেই আন্দোলন দমন করা হয়েছে। চাকরির দাবিতে বামেদের ছাত্র যুব সংগঠন নবান্ন অভিযান করেছে। সেখানে এক সংখ্যালঘু যুবকের মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে। বামেদের অভিযোগ পুলিশের লাঠির আঘাতেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর। ভোট প্রচারে বিজেপি বারবার বলছে, চাকরি চাইতে গেলে এই রাজ্যে পুলিশের মার খেতে হয়। হাজার হাজার ঠিকা কর্মীরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সাহস পান না বেতনের দিকে তাকিয়ে। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী প্রতিটি জনসভা থেকে এই ইস্যু তুলে ধরছেন।

মুখ্যমন্ত্রী বলছেন বাংলায় বেকার সমস্যা আগের চেয়ে বহুগুণ কমেছে, অর্থাৎ চাকরির সংখ্যা বেড়েছে। তারমধ্যে কী ধরে নেওয়া হয়েছে এই বিপুল সংখ্যক ঠিকা কর্মীদেরও? এই প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা। এমনকী চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ টাকার দুর্নীতির অভিযোগ পর্যন্ত উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। বিরোধীদের কথায়, বেকার সমস্যা,‌ নামমাত্র টাকায় ঠিকা কর্মী নিয়োগ, সেই নিয়োগের ক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ টাকার দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, সমস্ত কিছুর মেলবন্ধন হয়েছে তৃণমূল সরকারের আমলে। ঠিক এই জায়গা থেকে বিজেপি বেকার যুবক-যুবতীদের মন ছোঁয়ার চেষ্টা করছে। ‘চপ ভাজা শিল্প’ নয়, সম্মানের চাকরি এবং সম্মানের বেতন‌ প্রদানের প্রতিশ্রুতি বিজেপি নেতারা দিচ্ছেন ভোট প্রচারে। করোনা না হলে রাজ্যবাসী জানতে পারত না বাংলায় এত পরিযায়ী শ্রমিক রয়েছেন। লকডাউনের সময় দেখা গিয়েছে লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক ঘরে ফিরছেন। সেখানে বিজেপির কটাক্ষ, রাজ্যবাসী দেখুক এখানে চাকরির কি অবস্থা! মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন জনসভায় দাবি করেন ১০০ দিনের কাজে পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রথম স্থান অধিকার করেছে। কিন্তু এটা কি সম্মানের ব্যাপার! ১০০ দিনের কাজে প্রথম হওয়া মানে রাজ্যে চাকরির হাল কতটা খারাপ, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া। অন্য কোনও কাজ না পেয়ে রাজ্যের কয়েক লক্ষ মানুষ বাধ্য হচ্ছেন ১০০ দিনের কাজ করে দিন প্রতি সামান্য টাকা হাতে পেতে। সবমিলিয়ে বেকার সমস্যা মমতাকে কতটা তাড়া করে বেড়াচ্ছে, সেটা এতেই পরিষ্কার।