চট্টগ্রামে জলজটে দুর্ভোগে নগরবাসী

1 min read

।। মনির ফয়সাল, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ ।।

রোববার রাত থেকে চট্টগ্রাম নগরীতে শুরু হয়েছে বৃষ্টি। কখনও থেমে থেমে, কখনও মুষলধারে। চলছে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। এই বৃষ্টিতে নগরীর কিছু কিছু এলাকা হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যায়। এ জলাবদ্ধতার কারণে সড়কে যান চলাচল কমে যায়। ফলে নগরবাসীকে পড়তে হয় চরম দুর্ভোগে।

সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকাল ৩ টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৪৯.৬ মিলি মিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে প্রথম কলকাতাকে জানিয়েছে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারি আবহাওয়াবিদ ও পূর্বাভাস কর্মকর্তা মেঘ নাথ তঞ্চংগা।

তিনি জানান, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এজন্য চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত এবং নদী বন্দরের জন্য ১ নম্বর নৌ সতর্কতা সংকেত। আর উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি এসে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

মেঘ নাথ তঞ্চংগা জানান, আজ সোমবার সন্ধ্যা ৬ টা হতে আগামীকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী এলাকা সমূহের জন্য আবহাওয়ার স্থানীয় পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আকাশ আংশিক মেঘলা থেকে সাময়িকভাবে মেঘাচ্ছন্ন থাকতে পারে । সে সাথে অধিকাংশ জায়গায় অস্হায়ী দমকা /ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া রাত ও দিনের তাপমাত্রা প্রায়ই অপরিবর্তিত থাকতে পারে। এসময় বাতাসের দিক ও গতি বেগঃ দক্ষিণ/দক্ষিণ-পূর্বদিক হতে ঘণ্টায় ১0-১৮ কি.মি. বেগে যা আস্হায়ী ভাবে দমকা/ঝড়ো হাওয়ার আকারে ৩৫-৪৫ কি. মি. বেগে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। পরবর্তী ২৪ ঘন্টায় আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তন হতে পারে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, টানা বৃষ্টিতে নগরীর আগ্রাবাদ, বাকলিয়া, হালিশহর, ইপিজেড, চকবাজার, মুরাদপুর, শুলকবহর, ২ নং গেট, প্রবর্তক, পাঁচলাইশ, ডিসি রোড, খাজা রোড, চান্দগাঁও, মোহরা, বাকলিয়া, বহদ্দারহাট সিডিএ আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু পরিমাণ পানি জমে গেছে। অলিগলি-ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। সড়কে আটকা পড়েছে যানবাহন। চলাচল করতে গিয়ে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন মানুষ।

আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার ৯ নম্বর রোডের দোকানদার আবু বকর বলেন, সকাল থেকে বৃষ্টি শুরু হয়। এই বৃষ্টিতে হাঁটু পরিমাণ পানি জমে গেছে। দোকানের মধ্যে পানি ঢুকে গেছে। নিচে থাকা মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে।

চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও করোনার কারণে তা এখন বন্ধ। তিন বছর মেয়াদকালের এ প্রকল্পের দুই বছর পার হয়ে গেলেও এখনও খাল খনন, খাল পরিষ্কার এবং খাল উদ্ধারের কাজ অনেক বাকি রয়েছে। ইতোমধ্যে জলাবদ্ধতা নিরসনে নগরের পাথরঘাটার টেকপাড়া, কলাবাগিচা ও মরিয়ম বিবি খাল, মহেশখালে, ফিরিঙ্গিবাজার খাল, চাক্তাই খাল এবং রাজাখালী খালে সুইস গেইটের জন্য বাঁধ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, ভারি বৃষ্টির পর চট্টগ্রাম নগরের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো থেকে বসবাসকারীদের সরাতে খোলা হয়েছে আশ্রয় কেন্দ্র।নগরীর চাঁন্দগাও, বাকলিয়া, আগ্রাবাদ এবং কাট্টলী ভূমি সার্কেলের অধীনে বিভিন্ন এলাকায় মোট ১৯টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এছাড়া পাহাড় ধসের আসঙ্কায় নগরে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ১৭ পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে সোমবার দিনভর মাইকিং করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

এছাড়াও রেলওয়ের মালিকানাধীন কনকর্ড গ্রুপকে লিজ দেয়া ফয়েজ লেক সংলগ্ন অতি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি বসতি এবং এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটি সংলগ্ন বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সিডিএ লিংক রোড এলাকায় মাইকিং কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে জেলা প্রশাসন।

জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, নগরীর পাহাড়ি এলাকা সমূহে ভারী বর্ষণের মধ্যে মানুষের জানমালের সুরক্ষায় জেলা প্রশাসন চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে ঝুঁকি পূর্ণ পাহাড় থেকে জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে মাইকিং কার্যক্রম অব্যাহত আছে।

নগরীর ৬ টি সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) গণ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এর স্থানীয় কাউন্সিলরগণের সাথে সমন্বয় করে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছেন।

তিনি বলেন, স্থানীয় মসজিদ গুলো থেকেও মাইকিং এর মাধ্যমে লোকজন কে নিরাপদ অবস্থানে আশ্রয় নিতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। প্রতি ওয়াক্ত নামাজের আগে-পরে এবং বৃষ্টির তীব্রতা অনুযায়ী মসজিদের মুয়াজ্জিনগণের মাধ্যমে জেলা প্রশাসন চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা থেকে লোকজনকে সরে যেতে আহ্বান করা হচ্ছে।

তৌহিদুল ইসলাম বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের কথা বিবেচনায় রেখে এবার আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা দ্বিগুণ করা হয়েছে। ভূমি অফিসের কর্মচারী, কাউন্সিলরদের স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে নগরের ১৭ টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে লোকজনকে অপসারণ করা হচ্ছে।

তবে করোনাভাইরাস এর সংক্রমণ পরিস্থিতিতে অধিকাংশ ঝুঁকি পূর্ণ পাহাড়ি এলাকা থেকে লোকজন সরে গিয়ে তাদের নিকটবর্তী আত্মীয়স্বজনের বাসায় নিরাপদ আশ্রয় নিচ্ছে।

আশ্রয়কেন্দ্রগুলো হল- পাহাড়তলি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বিশ্ব কলোনির কোয়াড পি-ব্লক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফিরোজ শাহ কলোনী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফিরোজ শাহ হাউজিং এস্টেটের বায়তুল ফালাহ আদর্শ মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, জালালাবাদ বাজার সংলগ্ন শেড, রউফাবাদ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, রশিদিয়া রউফাবাদ আলিম মাদ্রাসা, মহানগর পাবলিক স্কুল, আল হেরা মাদ্রাসা, আমিন জুট মিল ওয়ার্কার্স ক্লাব, আমিন জুট মিলস নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, লালখানবাজার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, এবাদ উল্লাহ পন্ডিত সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, শহীদ নগর সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কলিম উল্লাহ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ওয়াইডব্লিউসিএ, শেখ রাসেল প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং মতিঝর্ণা ইউসেফ স্কুল।সংলগ্ন পাহাড়ের বাসিন্দাদের এসব আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যেতে আহ্বান জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।