ভাঙ্গড়ে নিজেদের সঙ্গেই নিজেদের আসল লড়াইটা দিতে হবে শাসককে

।। ময়ুখ বসু ।।

সামনেই ২০২১ সালের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে এখন থেকেই রাজ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক ততপরতা। রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভা এলাকাতেই চলছে জোরকদমে রাজনৈতিক প্রচার প্রচারণা। আমাদের নজরে রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভা। কোন বিধানসভা কেন্দ্রের রাজনৈতিক গতি প্রকৃতি কোন দিকে, রাজনীতির হাওয়া কাদের অনুকুলে এসবের আগাম কিছু আভাস নিয়েই এই প্রতিবেদন। আজকের বিধানসভা কেন্দ্র দক্ষিন ২৪ পরগনা জেলার ভাঙ্গড়।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বারবার রাজ্য রাজনীতির শিরোনামে উঠে এসেছে এই বিধানসভা কেন্দ্রটি। এই কেন্দ্রে যেমন রয়েছে শাসক বিরোধী সেয়ানে সেয়ানে লড়াইয়ের ময়দান, তেমনি এই কেন্দ্রে রয়েছে শাসকের অন্দরে আভ্যন্তরীণ কোন্দল। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক মহলদের কড়া নজর রয়েছে এই ভাঙ্গড় বিধানসভা কেন্দ্রের উপর।

এই কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা আনুমানিক ১ লক্ষ ৮৭ হাজার ৬২৬ জন। ১৯৫১, ১৯৫৭, ১৯৬২, ১৯৬৯ সালে এই কেন্দ্রে জয়ী হয় কংগ্রেস। ১৯৬৭ সালে এই কেন্দ্রে জয়ী হয় বাংলা কংগ্রেস। ১৯৭১ সালে এই কেন্দ্রে জয়ী হয় নির্দল। ১৯৭২, ১৯৭৭, ১৯৮২, ১৯৮৭, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০১১ সালে এই কেন্দ্রে জয়ী হয় কংগ্রেস। ২০০৬ এবং ২০১৬ সালে এই কেন্দ্রে জয়ী হয় তৃণমূল কংগ্রেস।

আরো পড়ুন : শিলিগুড়ির লালদুর্গ থাকতে পারে অটুট

২০১১ সালে এই কেন্দ্রে সিপিএমের প্রার্থী বাদল জমাদার ৮১হাজার ৯৬৫ টি ভোট পেয়ে জয়ী হন। তিনি পান ৪৫,৬৫ শতাংশ ভোট। তৃণমূল প্রার্থী আরাবুল ইসলাম পান ৭৬ হাজার ৮৫৯ টি ভোট। যা ভোট শতাংশের হারে ছিলো ৪২,৮১ শতাংশ। এই কেন্দ্রটি বরাবর বামেরা একছত্রভাবে ধরে রাখলেও রাজ্যে পরিবর্তনের হাওয়া উঠতেই এখানেও পরিবর্তন লাগে। ২০০৬ সালে এই এলাকার ভূমিপুত্র আরাবুল ইসলাম তৃনমূলের হয়ে জয়ী হন।

এরপর ২০১১ সালে এই ভাঙ্গড় বিধানসভা কেন্দ্রে ফের জয়ী হন সিপিএমের বাদল জমাদার। তখন থেকেই ভাঙ্গড়ের মাটিতে তৃনমূলের গোষ্টীকোন্দল মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে। বিশেষ করে এখানে সিপিএমের রেজ্জাক মোল্লা তৃণমূলে সদলবুল নিয়ে যোগদানের পর ধীরে ধীরে এই কেন্দ্রে কোণঠাসা হতে শুরু করে আরাবুল ইসলাম। তবে এই কেন্দ্রের বাম ভোটব্যাংক যে বিশেষ ফ্যাক্টর তা ২০১৬ সালে এসে ফের প্রমান হয়ে যায়।

বাম সংগঠন ভেঙ্গে রেজ্জাক মোল্লা এই কেন্দ্রে তৃনমূলের প্রার্থী হয়ে অনায়াসেই ভোটে জয়ী হয়ে যান। এরপর থেকে তৃনমূলের অন্দরে আরাবুল বনাম রেজ্জাক মোল্লা গোষ্ঠীর ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়ে যায়। দুই জনেই তৃনমূলের ঝান্ডার তলে অবস্থান করলেও আসলে দুই জনের মধ্যে চাপা ক্ষোভ দানা বেঁধে রয়েছে তা স্পষ্ট। বিশেষ করে ভাঙ্গড়ে পাওয়ার গ্রিড আন্দোলন ঘিরে বারবার যে রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তার পিছনেও এই দুই গোষ্ঠীর হাত রয়েছে বলেই স্থানীয়সদের অনুমান।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে মূল লড়াই হবে সিপিএম বনাম তৃনমূলের মধ্যে। সেক্ষেত্রে সিপিএম যদি তাদের ভোটব্যাংককে নিজেদের ঘরে ধরে রাখতে পারে এবং শাসকের অন্দরে ভাঙ্গনের রাজনীতির ছোঁয়া লাগাতে পারে তাহলে হাসতে হাসতে এই কেন্দ্রে শেষ হাসি হাসতে পারে সিপিএম।

তবে শাসকের বড়ো সমস্যা হলো, নিজেদের দলে গোষ্ঠীকোন্দল। রেজ্জাক মোল্লা যদি একমনে তার নিজের অনুগামীদের নিয়ে তৃণমূলের ময়দানে পূর্ণ বিক্রমে নামেন তাহলেও হয়তো শাসকের ভয়ের কিছু থাকবে না। তবে রেজ্জাক অনুগামীদের মধ্যে যদি স্যাবোতাজের ঘটনা ঘটে এবং আরাবুল ইসলাম যদি দলের প্রতি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন তাহলেই বিপদ।

পাশাপাশি, আরাবুল ইসলাম নিজে দায়িত্ব নিয়ে এককভাবে লড়াইয়ের ময়দানে নামলেও শাসকের স্বস্তি অনেকটাই ফিরবে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারনা। আসলে এই কেন্দ্রে তৃনমূলকে নিজেদের দলের সঙ্গেই নিজেদের লড়াইটা করতে হবে। তবে এই কেন্দ্রে বিজেপি আগের থেকে কিছুটা শক্তি বাড়ালেও আগামী বিধানসভা নির্বাচনে হয়তো তারা লড়াই দেওয়ার মতো অবস্থানে থাকবে না বলে রাজনৈতিক মহলের অনুমান।

Categories