প্রবাসে কি আদৌ মহালয়া শোনা হয়? উত্তরে কি বললেন প্রবাসী বাঙালি?

1 min read

।। স্বর্ণালী তালুকদার ।। কলকাতা ।। 

পশ্চিমবঙ্গে শরতের আনাগোনা, পেঁজা তুলোর মেঘের ভেলা আর কাশফুলের দোলা মানেই পুজো আসছে। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব আসছে। পাড়ার মোড়ে মোড়ে বাঁশ বেঁধে প্যান্ডেল, মাইক টেস্টিং, ঢাকি দাদাদের ক্লাবে এসে অস্থায়ী সংসার গড়ে তোলা, এই সবের মধ্যে দিয়েই দুর্গাপূজার ভাব আকাশে বাতাসে ছড়ায়। শুধু কি পশ্চিমবঙ্গ, মুম্বাই, চেন্নাই, দিল্লি, হায়দ্রাবাদ, গোয়াহাটি, পুনে – দেশের সর্বত্র দুর্গাপূজা উৎসব হিসেবে পালন করা হয়। বছরের চারটে দিন বাঁধাগত জীবন থেকে বেড়িয়ে আসার জন্য পারফেক্ট হিলিং ট্যাবলেটের মত কাজ করে। 

কিন্তু শুধু দেশেই নয়। দেশ থেকে বহুদূরে, কয়েক হাজার মাইল পেরিয়ে, সাত সমু্দ্র তেরো নদীর ওপারে থাকা প্রবাসী বাঙালিদের জীবনেও অক্সিজেনের যোগান দেয় দুর্গাপূজা। প্রবাসেও দুর্গাপুজোর তোড়জোড় শুরু হয় মহালয়ার ভোর থেকেই। তবে এখানকার থেকে একটু আলাদাভাবে পালন করা হয় দিনটা। প্রবাসে কেমন করে মহালয়া পালন হয়, হাজার ব্যস্ততার পরেও সেই বিষয়ে বিশেষ আড্ডায় বসেছিলেন শ্রী শুদ্ধার্পিতা চক্রবর্তী ব‍্যার্নাজী। খুব খুশি হয়ে জানিয়েছিলেন নিজের জীবনের নানান অভিজ্ঞতার কথাও।

মহালয়ার জন্য বিদেশে আলাদা করে সময় বের করা সম্ভব হয়?

শুদ্ধার্পিতা দেবীঃ সত্যি বলতে ওখানকার নিয়ম কানুন ভীষন কড়া। ছুটির দিন বলতে সাধারণতঃ শুক্রবার, শনিবার এবং রবিবার। তাই ওর্য়াকিং ডে তে আলাদা করে সময় বের করা বেশ মুস্কিল হয়। তাছাড়াও সকাল বেলা কাজে বেরোনোর তাড়াও থাকে, তাই তখন মন দিয়ে শোনার মত ইচ্ছে থাকলেও উপায় থাকে না। তবুও অনেকের বাড়িতেই শোনা হয় এই অনুষ্ঠান। এছাড়াও যখন দুর্গাপূজার উপাচার শুরু হয় মহাষষ্ঠীর বোধনের সময়, কমিউনিটি হলে শ্রী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহিষাসুরমর্দিনীর রেকর্ডিং শোনানো হয়। সঠিক অর্থে খানিকটা বাধ্য হয়েই ষষ্ঠীর পূজার সময়ই মহালয়ার আনন্দ উপভোগ করতে হয়। তবে এই আনন্দটাও একদম আলাদা। 

মহালয়া থেকেই কি পূজার জন্য প্রস্তুতি শুরু হয়?

শুদ্ধার্পিতা দেবীঃ কর্মসূত্রে সারাবছর ব্যস্ততা লেগেই থাকে। কিন্তু মহালয়া আসা মানেই দুর্গাপূজার প্রস্তুতি শুরু। প্রবাসে দুর্গাপূজা শুধু একটা উৎসব নয়, সকলের সঙ্গে দেখা করা, আত্মীয়তা বজায় রাখা, আনন্দ অনুষ্ঠানে সক্রিয় হয়ে ওঠা, কাজের চিন্তা ভুলে মায়ের আরাধনা করাও বটে। এই সবের থেকেও বেশি মা বাবা ভাইকে ছেড়ে কয়েক হাজার মাইল দূরে থেকে তাদের স্নেহের পরশ পাওয়ার যে উন্মাদনা থাকে, সেটা মহালয়া থেকেই শুরু হয়। কারণ এই বাংলা থেকেই মায়ের মূর্তি, পুরোহিত, ঢাকি, পূজার সামগ্রী, শাড়ি, গয়না, এবং অন্যান্য় সামগ্রী যায় প্রবাসে, এবং অনুষ্ঠানের জন্যে কমিউনিটি হল সহ অন্যান্য কাজের অনুমতি নিতে হয় সরকারের কাছ থেকে, তাই এরকম প্রস্তুতি তো শুরু হয় বলা যেতেই পারে।

ভারতীয় সময় ভোর ৪টে তে কি ঘুম থেকে উঠে মহালয়ার বেতার সম্প্রচার শোনা হয়?

শুদ্ধার্পিতা দেবীঃ ভারতীয় সময় অনুযায়ী শোনার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সবসময় তা হয়ে ওঠেনি, যেহেতু এদেশের থেকে প্রবাস ১২ ঘন্টা সময় পিছিয়ে থাকে। তবে মহালয়া নিয়ে মজার একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে আমার। ২০১৯ সালে বস্টনে আমি আমার ভাইয়ের স্ত্রী মন্দিরা ভদ্র চক্রবর্তীর ভাই সৌউপায়ন ভদ্রের বাড়িতে কাজের সূত্রে গিয়েছিলাম, কাকতালীয় ভাবে সেই দিনটি ছিল মহালয়ার দিন। এনারা দুইজন শ্রী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের নাতি এবং নাতনি। সেইদিন রাতের বেলা (ভারতীয় সময়ে দিনের আলো ফুটছে) মহালয়ার অনুষ্ঠান শোনার কথা বলি। জায়ের ভাই বলে ওঠে, গোটা পৃথিবীর মানুষতো শুনছে, আমি না হয় নাই শুনলাম! আমি তো শুনে অবাক, বললাম একি বলছ তুমি! গোটা পৃথিবীতে তোমার দাদুর অনুষ্ঠান শোনে মানুষ, আর তুমিই শুনবে না। এটা কিন্তু ঠিক নয়। সে যাত্রা অনুষ্ঠান শোনা হয়েছিল অবশ্য পরে। এই বছর করোনার কারণে আজকে ১৪ বছর পরে নিজের বাড়িতে মহালয়া কাটানোর সূযোগ পাচ্ছি, যেটা খুব মিস করতাম। করোনাকে এর জন্য একটা ধন্যবাদ দিতেই হয়। 

প্রবাসে থেকেও বাঙালির সংস্কৃতিকে বজায় রয়েছে, এটাকে কিভাবে দেখেন আপনি?

শুদ্ধার্পিতা দেবীঃ প্রবাসে অনেক বাঙালি পরিবার বিদেশিদের সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধনে এক হয়েছেন। তাই দুর্গাপূজার উৎসবে তারাও যোগদান করেন। তাদেরকে যখন মহিষাসুরমর্দিনীর কাহিনী শোনানো হয়, তখন তারাও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডীপাঠ শুনতে আগ্রহী হয়। তারা যখন এই অনুষ্ঠান শোনেন, এবং চন্ডীপাঠ শুনে ভীষনভাবে আপ্লুত হন – সেই সময় এতটা ভালো লাগে, সেই ভালো লাগা, আন্তরিকতাকে ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। তখন মনে হয় যে দূরে থেকেও আমরা সবাই এক। ভাষা,বর্ণ, ধর্ম, জাতির বিভেদের কোনও প্রসঙ্গই আসে না, যখন উৎসবের আনন্দে সবাই এক সঙ্গে হুল্লোড় করি। দেশের বাইরে থেকেও মনে হয় সবার খুব কাছেই রয়েছি। বিশেষ করে মনে হয়, যেন নিজের মা-ই প্রবাসে এসেছেন। আর বাঙালিরা সব জায়গায় সহজেই ফিট হয়ে যায়। তাই বাঙালিদের সংস্কৃতি খুব সহজেই আপন করে নেওয়া যায়। ১৪ বছর প্রবাসে থেকে এটা আমি ভীষণ লক্ষ্য করেছি,  যখন প্রসঙ্গ উঠেছে দুর্গাপূজা, সাহিত্য এবং সিনেমা নিয়ে, বিদেশিদের বাঙালিদের প্রতি আলাদাই শ্রদ্ধা এবং আন্তরিকতা রয়েছে।