বঙ্গবন্ধুকে কী করে ভুলে বাঙ্গালী?

1 min read

।। মীর আব্দুল আলীম, বাংলাদেশ ।।

সেই যে মানুষটি ভালোবেসেছিলেন বাঙ্গালী জাতিকে। বীর হতে চাননি শুধু ;ভয় পাননি শহীদ হতে। রক্ত দিয়ে দেশবাসীর ভালোবাসার ঋণ পরিশোধ করতে প্রস্তুত ছিলেন সর্বদা । তাঁকে কী করে ভুলবে বাঙ্গালী ? সেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট। সিড়িঁতে পরে আছে বাঙ্গালী জাতীর প্রাণ প্রিয় বঙ্গ বন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের রক্তমাখা নিথর দেহ। সিঁড়ি গড়িয়ে রক্ত চলে গেছে বাহির অঙ্গিনায়। মহান সেই নেতা রক্ত সোধা মাটিতে মিশে গেছে। তা ভূলে কি করে বাঙ্গালী ? তিনি তো শুধু প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি ছিলেন না, ছিলেন না দলবিশেষের প্রধান। দীর্ঘদিবস; দীঘর্রজনী ঝড়-মেঘ ইতিহাসের পথে আমাদের যাত্রায় তিনি ছিলেন সঙ্গী, পথপ্রদর্শক। তাঁকে ভুলব কেমন করে? তাকে কি ভূলা যায় কখনো ? তাইতো ইতিহাসের এই মহানায়কের উদ্দেশে কবি লিখেছিলেন, ‘‘যতদিন রবে পদ্মা, মেঘনা, গৌরী, যমুনা বহমান, ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’’।

যিনি আমোদেও দেশমাত্রকাকেউপহার দিলেন; এই তাকেই কতোনা নির্মমভাবে হত্যা করা হলো । শুধু তই নয় হত্যাকারীরা তার কবর তিন মাস পর্যন্ত পাহারা দিয়েছে। সেখানে কইকে আসতে দেয়া হয়নি। এমনকি দীর্ঘদিন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকন্ডর ছবি এদেশে নিষিদ্ধ ছিল। বঙ্গ বন্ধুর কবর দেখতে না দেয়া ,তার হত্যার ছবি প্রকাশের নিষেজ্ঞার মূল কারন ঘৃণ্য হন্তারক ঐ সামরিক শাসকরা তাতে ভয় পেতো।

তাদের ভয়টা ছিল এখাইে যে, তারা নিশ্চিত জানতো জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে মৃত বঙ্গবন্ধু অনেক বেশী শক্তিশালী। তারা আরো জানতো সে সময় এসব ছবি প্রকাশ পেলে কোন কিছুতেই বাঙ্গালীকে দাবিয়ে রাখা যাবে না। আগস্ট মাস। বাঙ্গালী জাতীর জন্য এটি দুঃস্বপ্নের মাস। সেই আগস্ট বাঙ্গালির জীবনে শুধু শোকের নয়; অভিশপ্ত মাসও বটে।

এটি বাঙ্গালি জাতির ইতিহাসে কলংকের কালিমালিপ্ত একটি মাস । সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি ও মহান স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট কালো রাতে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী উচ্ছৃঙ্খল ও অদূরদর্শী সদস্যের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন। সেই সর্বনাশা রাতের দৃশ্যপট মানসচক্ষে একবার ভেসে উঠলেই শিহরিত হতে হয়।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির সিঁড়িতে জাতির জনকের রক্তাক্ত মৃতদেহ। বাড়ির অন্যত্র ছড়ানো-ছিটানো বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল, তার স্ত্রী সুলতানা কামাল, অপর পুত্র শেখ জামাল ও তার স্ত্রী রোজী জামাল, কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল, ভাই শেখ নাসের ও কর্ণেল জামিলের নিথর মৃতদেহ।

অন্য বাড়িতে শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, আবদুর রব সেরনিয়াবাত, শহীদ সেরনিয়াবাত, শিশু বাবু, আরিফ, রিন্টু খানসহ অনেকের লাশ। এ যেন ছিল খুনিদের অদম্য রক্ত-পিপাসা। সেই নৃশংস হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে শুধু সরকার বদলই নয়, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাওয়া জাতির অনেক অর্জনকে নস্যাৎ করা হয়েছিল, বদলে দেয়া হয়েছিল দেশের সংবিধান ও মূলনীতি। সেই শোক, সেই বেদনা, সেই ক্ষোভ বুকে নিয়েই দেশবাসী কাটিয়েছে এই দীর্ঘ সময়।

তবে এবার এই আগস্টে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার কলঙ্ক কোনোদিন ঘুচবার নয়, তাকে এভাবে হারানোর বেদনার কোনো উপশম নেই। তারপরও সান্ত্বনা এটুকু যে, জাতির জনকের হত্যাকান্ডের বিচার হয়েছে এবং খুনিদের অন্তত পাঁচজনের ফাঁসি হয়েছে। যে আত্মস্বীকৃত হত্যাকারীরা জাতির জনককে হত্যার কথা দম্ভের সঙ্গে বলে বেড়াতো, এই আগস্টে তারা নিজেদের অপরাধের সমুচিত শাস্তি মাথায় নিয়ে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে।

যখন বিশ্বের জঘন্নতম হত্যাকান্ডের বিচার হচ্ছিল না। বিচারের নামে চলছিল প্রহসন। একটি ঘৃণ্যমহল জাতীর জনকের হত্যার বিচার হউক তা চাইছিল না বলেই বিলম্বিত হলো এ বিচার। তাদের হেলাফেলায় অনেত সময় গড়িয়ে গেল। একে একে কেটে গেল ৩ যুগের। সময় অনেক গড়ালেও এ জাতি তাদের জনকের হত্যার বিচার পেয়েছে। এটা বড়ই আত্নতৃপ্তির। হত্যাকারীদের ফাঁসির বিষয় নিয়ে যারা এ যাত অতৃপ্ত ছিলেন তারা এখন তৃপ্তির ঢেকর তুলছেন।

এদের সাথে আমি আজ সুখর অনভব করছি। বড্ড বেশশি সুখ পাচ্ছি আমি। ১৫ আগষ্ট এলে বড্ড বেশী অপরাধী মনে হতো। ঘৃণা হতো নিজের প্রতি। মনে হতো আমরা কতটাইনা অসভ্য। গত ২ বছর আগে ১৫ আগষ্টে নারায়নগঞ্জের এক শোকসভায় আশীতিপর এক পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা অসুস্থতা নিয়েই হাজির হন। তাকে বলতে শুনেছি জাতীর পিতার হত্যার বিচারটা বুঝি আর দেখে যেতে পালামনা। তিনি নেই। দু’মাস আগেই পরলোকগত হয়েছেন। কতটা অতৃপ্তি নিয়েইনা দুনীয়া ছাড়লেন তিনি।

আমার তৃপ্তিটা এখানেই। আমিতো অন্তত জাতীর জনকের বিচারটা দেখে যেতে পারলাম। কি নিষ্ঠুর ইতিহাস। যিনি জাতির জন্ম দিলেন; যার জন্ম না হলে এদেশের জন্মই হতো না; সেই জাতির জনককে কি নিষ্ঠুর ভাবেই না হত্যা করা হলো। জাতীর জনকের বাসভবনে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়া হলো সেদিন। শিশু রাসেলর কান্না আর আকুতিও ওদের হৃদয় স্পর্শ করেনি। আজকের প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন রেহেনা ছাড়া বঙ্গবন্ধু পরিবারের কেউই বেঁচে নেই।

পঁচাত্তরের আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তার সরকারকে উৎখাত করা হয়েছিল। আজ তার হাতে গড়া দলই জনগণের ভোটে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। শুধু তাই নয়, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে পঁচাত্তরের সামরিক শাসন অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। জেনারেল জিয়া পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান বদল করেছিলেন, রাষ্ট্রীয় মূলনীতি পরিবর্তন করেছিলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিল করেছিলেন। আদালত সেই পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করেছে।

ফলে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারা পুনরুজ্জীবনের পথ সুগম হয়েছে। পঁচাত্তরের আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সামরিক আইনের ছত্রচ্ছায়ায় সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছিল, এবারের আগস্টে কিছু ব্যতিক্রমসহ সেসব বাতিলের উদ্যোগ চলছে। সরকার সুপ্রিমকোটের্র রায়ের আলোকে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই আগস্টে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হলো, যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে।

গত ২৬ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর চার শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয় এবং পরে ২৯ জুলাই ওই চার নেতাকে ২ আগস্ট ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেয়া হয়। এই চার নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, আবদুল কাদের মোল­া ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান বিভিন্ন মামলায় আগে থেকেই আটক আছেন। তাদের একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার অভিযোগে এবার ২ আগস্ট ট্রাইব্যুনালে আসামির কাঠগড়ায় হাজির হতে হয়েছে। এটা এক ঐতিহাসিক ঘটনা।

এ দেশে কোনোদিন সামরিক আইন জারি বেআইনি ঘোষিত হবে, মূল সংবিধানের মূল নীতি ফিরে আসবে এবং মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নিজামী-মুজাহিদদের আদালতে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে পঁচাত্তরের আগস্টে এটা ছিল এক অকল্পনীয় ব্যাপার। কিন্তু সেই অকল্পনীয় ব্যাপারই এখন এই আগস্টে বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে দেশের স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা এবং রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নবজাগরণের ফলে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন এই মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের এক বিশাল প্রতীক এবং নিরন্তর প্রেরণার উৎস।

এইসব উপাদানের সমন্বয়েই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস এবং এই ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং সর্বোচ্চ স্থানটি যে বঙ্গবন্ধুর যুক্তিবাদী, বিচারশীল এবং ইতিহাসবোধসম্পন্ন সকল মানুষই এটা স্বীকার করবেন। এ ব্যাপারে বিতকের্র কোন অবকাশ নেই। কিন্তু তবুও কিছু লোক বিতর্ক তুলেছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর হত্যা দিবসকে ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে পালনের সরকারি সিদ্ধান্তকে ক্ষমতার জোরে অন্যায়ভাবে বাতিলও করে দিয়েছেন। তাদের এই সিদ্ধান্ত ছিল অদূরদর্শী, জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার বিরোধী এবং ইতিহাসকে অস্বীকার করার নামান্তর।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী নানা অস্বাভাবিক ঘটনা প্রবাহের স্রোতে এই দিনটিকে ১৯৭৫ পরবর্তীকাল থেকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। রাজনৈতিক নানা স্বার্থ, স্বাধীনতা বিরোধীদের চক্রান্ত এবং কিছু লোকের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের কারণে এটি সম্ভব হয়নি। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে যখন এই দিনকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করলো তখন তাকে সকল গণতান্ত্রিক, ইতিহাসবোধ সম্পন্ন ও শুভবুদ্ধি দ্বারা পরিচালিত দলের মানুষেরই এটা মেনে নেয়া উচিত ছিল। কারণ বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলাদেশ আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি প্রায় সিকি শতাব্দী সংগ্রাম করেছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন এবং তারই ফলে মানুষের মনে তার চিন্তা-চেতনা গভীরভাবে প্রভাব ফেলে এবং ধাপে ধাপে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশ আন্দোলনকে রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি নাম, একটি ইতিহাস। বাঙ্গালির ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ সন্তান তিনি। তার জীবন ছিল সংগ্রামমুখর। সংগ্রামের মধ্যেই তিনি বড় হয়েছিলেন। তার জন্ম তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গীপাড়ায়।

ছাত্রাবস্থায় তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের সরকার গঠন, কপ, পিডিপি’র আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে মহানায়ক হিসাবে ’৭০-এর নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি আওয়ামী লীগকে এদেশের গণমানুষের আশা-আকাঙক্ষার প্রতীকে পরিণত করেন। অবিসংবাদিত এই নেতার জীবন চলার পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে ’৬০-এর দশক থেকেই তিনি বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়কে পরিণত হন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ লাখো মানুষের উপস্থিতিতে ঢাকার তৎকালীন ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু বজ্রদৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম।

এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তারই বজ্র নির্ঘোষ ঘোষণায় উদ্দীপ্ত, উজ্জীবিত জাতি স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ধারণ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অদম্য সাহস ও অকুক্ত আত্মত্যাগ, সাংগঠনিক শক্তি নিজের বাঙালীসত্তার গভীর অনুরণন উপলব্ধি করেছিলেন তিনি। কখনো স্বভাবের প্রেরণায়, কখনো সযত্ন উৎসাহে তার উন্মোচন ঘটিয়েছিলেন। দেশবাসীকেও তেমনি অনুপ্রাণিত করেছিলেন সেই সত্তার জাগরণ ঘটাতে। দেশ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকে এক মোহনীয় স্বপ্ন রচনা করেছিলেন তিনি ধীরে ধীরে, সেই স্বপ্ন সফল করার আহবান জানিয়েছিলেন সকলের প্রতি। কী বিপুল সাড়া তিনি পেয়েছিলেন, তার পরিচয় তো আমরা স্বচক্ষে দেখেছি।

১৯৭১ সালে যেভাবে তিনি অসহযোগ আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন, তাতে বিম্মিত হয়েছিল সারা বিশ্ব। ক্ষাত্র শক্তির সঙ্গে নৈতিক শক্তির দ্বন্দ্ব পৃথিবীতে এই প্রথম সংঘটিত হয়নি। কিন্তুু বাংলাদেশের এই আন্দোলনের মধ্যদিয়ে যে-ঐক্য যে-শৃঙ্খলা যে-দুর্জয় সংকল্পের পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল তার তুলনা হয় না। তারপর সেই ৭ই মাচের্র ভাষণ, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। যে শুনেছে সে ভাষণ তারই শরীরে বয়ে গেছে বিদ্যুৎপ্রবাহ। কী ছিল সে ভাষণে?

কোনো অজ্ঞাত তথ্য নয়, কোনো অপ্রত্যাশিত ঘোষণা নয়, ভাষার কোনো কারুকার্য নয়, বলবার কোনো পরিশীলিত ভঙ্গি নয়। তাতে ছিল এ দেশের সর্বশ্রেণীর মানুষের অকথিত বাণীর প্রকাশ, তাদের চেতনার নির্যাস, বক্তব্যের অবিসংবাদিত আন্তরিকতা। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে এই আন্তরিকতার বন্ধন গড়ে উঠেছিল বলেই তো শত্রুদেশে বন্দী থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর প্রেরণা ছিল সক্রিয়। স্বাধীনতা লাভের জন্য যেমন দৃঢ় সংকল্পবব্ধ ছিল সকলে তেমনি প্রবল আকাঙক্ষা ছিল তার নেতৃত্বে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তোলার।

বন্দীদশা থেকে মুক্তিলাভ করে দেশে প্রত্যাবর্তন করেই তিনি বলেছিলেন যদি দেশবাসী খাবার না পায়, যুবকরা চাকরি বা কাজ না পায়, তাহলে স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে; পূর্ণ হবে না। এই ছিল তাঁর স্বপ্নেরই অংশ। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই তাকে স্বপরিবারে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া হলো। এর পর গড়িয়ে গেছে বহু বছর। সবচেয়ে বড় কথা এতকিছু ঘটার পরও রাজনীতি দাঁড়িয়ে আছে প্রায় আগের জায়গাতেই। বিশেষ করে রাজনৈতিক কালচার বদলায়নি মোটেই।

পনের-বিশ বছর আগের মতোই আজো রাজনীতিতে কখনো প্রধান উপভোগ্য, আবার কখনো অন্যতম বিরক্তিকর বিষয় দুই নেত্রীর বাক-যুদ্ধ। এখনো কান পাতলেই শোনা যায় বিরোধীদলীয় নেত্রীর মুখে সরকার হটানোর আন্দোলনের কথ;া আর সরকারি দলের নেত্রীর মুখে সরকার হটানোর ‘অশুভ রাজনীতি’ পরিত্যাগের আহবান। রাজনীতিতে এটা হয়েই থাকে। কিন্তু ভাষাটা একটু নরম হলে ক্ষতি কি ?

লেখকঃ লায়ন মীরাব্দুল আলীম, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।