দাদুর সংসারে মন ছিল না! জানালেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের নাতনি

1 min read

।। স্বর্ণালী তালুকদার ।। কলকাতা ।।

কেটে গেছে ৮৮ বছর। তবুও মহালয়ার ভোর হয় শ্রী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডীপাঠ সহযোগে মহিষাসুরমর্দিনী দিয়ে। বেঁচে থাকাকালীন তাঁর বাড়িতে মহালয়ার ভোরে সকলে মিলে একসঙ্গে বসে অনুষ্ঠান শুনতেন রেডিওতে। যতদিন না তিনি শয্যাশায়ী হয়েছেন, ততদিন তিনি খাটে বসে নিজের রেকর্ডিং শুনতেন। কখনও কখনও চলে যেতেন আকাশবানীর অফিসেও। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের বাড়িতে এখনও রয়েছেন তাঁর দিদি, নাতি নাতনি, কাকা, ভাই এবং তাঁদের পরিবার। কেমন ছিলেন তিনি ব্যক্তিগত জীবনে, বাড়িতে কতটা সময় দিতেন তিনি – এই সব বিষয়ে জানার জন্য প্রথম কলকাতার তরফে বিশেষ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল শ্রী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের নাতনি শ্রীমতি মন্দিরা ভদ্র চক্রবর্তীর। তিনি কি জানালেন তাঁর প্রয়াত দাদুর বিষয়ে?

বাড়িতে তিনি কেমন মানুষ ছিলেন? 

মন্দিরা দেবীঃ দাদু বাড়িতে থাকলে সবসময় লিখতেন। গান, নাটক, উপন্যাস, কিংবা কবিতা। কখনও কখনও হাসির ছোট ছোট গল্পও লিখতেন। খুব ছোট ছিলাম সেই সময়, তাই তাঁর অনেক লেখাই বুঝতে পারতাম না। কিন্তু হাসির গল্পগুলো শুনে খুব মজা পেতাম, একটা ভালো সময় কাটিয়েছিলাম। তবে তিনি সংসার জীবনে বিশেষ মনোযোগ দিতেন না। তিনি লেখা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। বাড়িতে কি হচ্ছে বা কোনও কিছুর প্রয়োজন কিনা – সেই সবে কখনও তিনি আগ্রহ দেখাননি। তিনি ঘুম থেকে উঠতেন, চা-বিস্কুট খেতেন এবং পড়ার টেবিলে লিখতে বসে যেতেন।

বাড়িতে পুজো হলে তিনি পুজোর মন্ত্রোচ্চারণের দায়িত্ব নিতেন?

মন্দিরা দেবীঃ ওনাকে কখনও পুজা আচ্চার বিষয়ে অংশগ্রহন করতে দেখিনি। এমনকী ধূপ ধুনোর ধোঁয়ার ধারে কাছেও তিনি থাকতেন না। মন্ত্রোচ্চারণ অনেক দূরের বিষয়।

মহালয়ার ভোর মানেই রেডিওতে দাদুর অনুষ্ঠান শোনা, সেই অনুষ্ঠান শোনার পরম্পরা কি এখনও বজায় রয়েছে? 

মন্দিরা দেবীঃ দাদুর ঘর এখনও একই রকমভাবে সাজানো রয়েছে। একটি রেডিও ছিল, যেটাতে আকাশবানীর সম্প্রচারিত অনুষ্ঠান শোনা হত, সেই রেডিওতেই শোনা হয়। একসঙ্গে বসে শোনা না হলেও, প্রত্যেকের ঘরেই মহালয়ার অনুষ্ঠান শোনার রেওয়াজ রয়েছে। আগে মহালয়ার দিন খাওয়াদাওয়া হত, রেডিওর অনুষ্ঠানের অন্যান্য শিল্পীরা আসতেন, বৈঠক হত। তবে কালের নিয়মে প্রায় সকলেই ইহলোক ত্যাগ করেছেন, তবুও যারা এখনও রয়েছেন, তাঁরা আসেন, দেখা করে যান। এছাড়াও বাড়িতে ওনার মূর্তিতে মাল্যদান করতে আসেন বহু মানুষ। তবে করোনার জন্য এই বছর একটু সাবধানে থাকতে হচ্ছে, কারণ বাড়িতে বয়োজেষ্ঠ মানুষেরা রয়েছেন।

১৯৭৬ সালে উত্তমকুমার মহালয়া পাঠ করেছিলেন, সেই বিষয়ে বীরেন্দ্রবাবুর কি প্রতিক্রিয়া ছিল?

মন্দিরা দেবীঃ দাদু খুব শান্ত মানুষ ছিলেন। তিনি কখনই রাগারাগি করতেন না বা একেবারে চুপ করেও থাকতেন না। তিনি যখন জানতে পেরেছিলেন উত্তমবাবু অনুষ্ঠানটি করবেন, তিনি যেমন উত্তেজিত হয়ে পড়েননি, আবার রাগও দেখাননি। পরে উত্তমবাবু বাড়িতে এসে ওনাকে অনুষ্ঠানটি শোনার জন্য অনুরোধ করেছিলেন, তিনি তখন বলেছিলেন, ভালোই তো। করুন, নতুন কিছুও তো দরকার। মানুষেরা যদি পছন্দ করেন, তাতে ভালোই তো। অবশ্য মানুষজন নিলেন না, কিন্তু দাদু বলেছিলেন ভালোই তো!

তিনি তাঁর দরাজ গলার জন্যে বিশেষ শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন, তাই তিনি কি আলাদা করে নিজের গলার স্বরের প্রতি যত্নশীল ছিলেন? তিনি কি গলার স্বর বজায় রাখতে নিয়ম করে রেওয়াজ বা কোনও ব্যায়াম করতেন? কোনও বিশেষ খাবার খেতেন তিনি?

মন্দিরা দেবীঃ সত্যি বলতে তিনি একটা সময় রেডিওতে অনুষ্ঠান নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। খাওয়া দাওয়ার তেমন বাছবিচার ছিল না। শয্যাশায়ী হওয়ার আগে পর্যন্ত নিয়মিত রেডিওতে অনুষ্ঠান করেছেন। কিন্তু সেভাবে তিনি বিশেষ কোনও খাবার বা ব্যায়াম করতেন না। ওনার আওয়াজের মাধুর্য ভীষণভাবে সহজাত ছিল। বলতে পারেন নিজে থেকেই ওমন আওয়াজ আসত। আলাদা করে কিছু করেননি কখনও।

আপনার বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র নামটার সঙ্গে কেমন স্মৃতি জড়িয়ে আছে?

মন্দিরা দেবীঃ যেই সময় থেকে ওনাকে চোখের সামনে দেখেছি, ততদিনে তিনি বার্ধক্যের সীমানায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান কম করতেন, বাড়িতেই থাকতেন। তবে লেখালেখি করতেন, তাতে ছেদ পড়েনি, যতদিন না শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। গল্প করতেন আমাদর সঙ্গে অনুষ্ঠান সেরে ফিরে আসার পর, কখনও কখনও লেখাও পড়ে শোনাতেন। স্কুলে বা কলেজে যখন যেতাম, তখন ওনার নাতনি হিসেবে পরিচয় জানতে পেরে অবাক হতেন অনেকেই, জিজ্ঞেস করতেন দাদুর কথা। শেষ সময়ে তিনি যখন শয্যাশায়ী ছিলেন, জল খাওয়াতে হত। সেই সময় মাঝে মাঝে জল খাইয়ে দিতাম ওনাকে, তখন তিনি কথাও বলতে পারতেন না, শুধু তাকিয়ে থাকতেন। চিনতেও পারতেন না একটা সময়ের পর।