করোনায় খাতুনগঞ্জের কুলিদের জীবনেও বিরুপ প্রভাব

1 min read

।। মনির ফয়সাল, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ ।।

প্রতিদিন শতকোটি টাকার পণ্য আনা-নেওয়া হয় তাদের কাঁধে। সকাল থেকে শুরু হওয়া তাদের এ ব্যস্ততা থাকে রাত পর্যন্ত। এভাবেই প্রতিদিন গড়ে তারা বহন করে ১৩৮ কোটি ২৪ লাখ টাকার পণ্য। নগরের পাইকারি বাণিজ্যকেন্দ্র খাতুনগঞ্জের কুলিদের নিত্যদিনের গল্প ছিল এটি। কিন্তু বিশ্বব্যাপি করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে বদলে গেছে পুরো চিত্র। অনেকের কমেছে আয়  আবার সংকটে পড়ে অনেকে ছাড়তে বাধ্য হয়েছে এই পেশা। সবমিলিয়ে বলা যায়, ৩হাজার কুলির জীবনে নেমে এসেছে বিপর্যয়।

গত মার্চের চিত্র, সকাল থেকেই জমতে থাকে চট্টগ্রামের ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র খাতুনগঞ্জ। ঘড়ির কাঁটা ৮টার ঘর স্পর্শ করার আগেই আসতে থাকে কুলির দল। দিনজুড়েই থাকে তাদের ব্যস্ততা। আর এ ব্যস্ততা যখন থামে তখন ঘড়িতে রাত ১০টা!

করোনা পিরিস্থিতির কারণে এখন দিনভর কাঁধে বস্তা বয়ে বেড়ালেও বাড়ি ফেরাটা খুব একটা সুখকর নয় তাদের। ২৫ কেজি, ৫০ কেজি ওজনের বস্তা বয়ে বেড়ানো কুলিদের পকেটে জমেনা পাঁচশ’ টাকা! বাড়ি ফিরতে হয় দুইশ থেকে দুইশত পঞ্চাশ টাকা নিয়ে।

খাতুনগঞ্জ লোডিং ও আনলোডিং শ্রমিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাশেম মাঝি প্রথম কলকাতাকে বলেন, অল্প মজুরিতে শ্রমিকের জীবনমান এখন অনেক নিম্ন পর্যায়ে। পারিবারিক খরচসহ সবকিছু মিলিয়ে সবাই অনেক কষ্টে আছি। করোনাকালীন সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেও অল্প মজুরি নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। অনেক সময় রাতের ১২ টা থেকে ১ টা পর্যন্তও কাজ করতে হয়।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশে করোনা প্রভাব বিস্তারের আগে একজন কুলি গড়ে দৈনিক ১২০ বস্তা পণ্য কাঁধে বহন করতো। পণ্যভর্তি প্রতিটি বস্তার মূল্য প্রায় দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮৪০ টাকা। আর প্রতি বস্তায় কুলিদের মজুরি ৪ টাকা ১৬ পয়সা। একজন কুলি সারাদিনে ৪ লাখ ৬০ হাজার ৮০০ টাকার বস্তা কাঁধে বহন করে। আর দিন শেষে বাড়ি নিয়ে যায় ৪৯৯ টাকা। বর্তমানে কাজ কমে যাওয়ায় ৪৯৯ টাকা থেকে ২০০-২৫০ টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। খাতুনগঞ্জজুড়ে রয়েছে প্রায় তিন হাজার কুলি। তিন হাজার কুলি দিনে প্রায় ১৩৮ কোটি ২৪ লাখ টাকার পণ্য বহন করে। আড়ত মালিক ডালের বস্তা প্রতি মূল্য ২ হাজার টাকা লাভ পেলেও কুলিরা লোডিংয়ে ৭ টাকা, আনলোডিংয়ে ৩ টাকা পায়। ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না মসলার বস্তায়ও। যদিও পরিবর্তন হয় বস্তার মূল্যের। কারণ এখানে প্রতি বস্তা পণ্যের মূল্য প্রায় ৮ হাজার ২০০ টাকা। ২৫ কেজি দারচিনি কাটনের মূল্য ৪ হাজার ৯০০ টাকা মিললেও শ্রমিকের কপালে মিলে ৩ টাকা। আবার ১০ কেজি দারচিনি কাটনের দাম ২ হাজার ১০০ টাকা হলেও কুলিদের মজুরি মাত্র ২ টাকা!

খাতুনগঞ্জ লোডিং ও আনলোডিং শ্রমিক কল্যাণ সমিতির সদস্য মো. রফিক মাঝি প্রথম কলকাতাকে বলেন, আগে সারাদিনে আমরা চারশ‘-পাঁচশ‘ টাকা মজুরি পেতাম। কিন্তু এখন আমাদের থেকে ২৫০ টাকার বেশি জুড়ে না। আমাদের পরিশ্রমের তুলনায় এটি পর্যাপ্ত নয়। তাই দারিদ্র্যতা এখানকার কুলিদের নিত্যসঙ্গী।

তিনি বলেন, অনেকে এখন এই পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় চলে গেছে। এত অল্প টাকায় পরিবারের খরচ চালাতে কষ্ট হয়। আর মালিকদের মজুরি বাড়িয়ে দেওয়ার কথা বললে উনারা বলে, দেশের পরিস্থিতি খারাপ এখন বাড়িয়ে দিতে পারবো না।

১৮ বছর ধরে খাতুনগঞ্জের কুলি পেশায় জড়িত থাকলেও করোনাকালীন সময়ে পেশা পরিবর্তন করেছে গনি মিয়া(৪২)। তিনি এখন নগরের বিভিন্ন এলাকায় রিকশা নিয়ে ঘুরে বেড়ান। আর তাতে তিনি পরিবারের দৈনিক খরচ যোগড় করেন। তিনি প্রথম কলকাতাকে বলেন, আগে পরিশ্রমের তুলনায় অল্প মজুরি হলেও সংসার খরচ চলে যেতো। কিন্তু এই করোনাকালীন সময়ে আয় কমেছে গেছে। আগের মত খাতুনগঞ্জ জমজমাট নাই। কাজ কম মানুষ বেশি ওখানে। ২০০/২৫০ টাকা দিয়েতো একটা পরিবারের খরচ চলে না। তাই রিকশা হাতে নিতে বাধ্য হয়েছি এখন।

এম/বি