চট্টগ্রাম বন্দরের ট্রানজিট সুবিধাকে অর্থনৈতিক কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা

1 min read

।। মনির ফয়সাল, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ ।।

প্রতিবেশি দেশ ভারতের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের ট্রানজিট সুবিধাকে অর্থনৈতিক কার্যক্রম হিসেবেই বিবেচনা হচ্ছে সব মহলে। দেশের স্বার্থ রক্ষা করে ট্রানজিট সুবিধাকে কেবল ভারত নয়, নেপাল ভুটান পর্যন্ত সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের ট্রানজিট সুবিধায় ভারতের বেনিফিট হবে প্রচুর, তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমাদেরও বেনিফিট কম নয়। বন্দর এবং সড়ক পথ ব্যবহার থেকে অতিরিক্ত আয় হবে। অবকাঠামো উন্নয়নে ৭.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি আছে ভারতের সাথে। চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনাল নির্মাণ, মোংলা বন্দর থেকে ফোরলেন হাইওয়ে স্থাপন, আশুগঞ্জে ইনল্যান্ড রিভারপোর্ট তৈরিসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর জন্য এই ঋণ দেয়া হচ্ছে।

ড. সেলিম উদ্দিন মনে করেন, বাংলাদেশ যদি তার স্বার্থ রক্ষা করে ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা সফলভাবে দিতে পারে, তাহলে আগামীতে বাংলাদেশ হবে রিজিওনাল হাব। মটর ভেহিক্যাল এগ্রিমেন্ট আছে বাংলাদেশ-ভারত-ভুটান-নেপালের মধ্যে। তার বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবে। কানেক্টিভিটি দিয়ে আমরা আগামীতে পেতে পারি শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা, যদি সম্পর্ক থাকে ভাল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র ভারত নয়, ভূ-বেষ্টিত ভুটান, নেপাল পর্যন্ত যদি বাংলাদেশ ট্রানজিট সুবিধা সম্প্রসারণ করা যায় তাহলে আগামীতে বাংলাদেশ হবে বে অব বেঙ্গল রিজিওনাল হাব। ডিপ সি পোর্ট হয়ে গেলে প্রচুর সাসটেইনবল ইনকাম হবে ট্রানজিট সুবিধা থেকে। ভুটান নেপাল থেকে পানিবিদ্যুৎ পাওয়াও হবে সহজতর।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুস সালামও প্রতিবেশি দেশকে ট্রানজিট সুবিধা প্রদানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, এটা দু’দেশের মধ্যে একটা সেতুবন্ধন এবং দু’দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও জোরদার করবে। আমাদের নিজস্ব চাহিদাকে পূরণ করে যদি ভারতকে তার ভূ-বেষ্টিত রাজ্যগুলোর জন্য এই সেবা দেয়া যায় তাহলে সেটা অবশ্যই ভাল দিক। ট্রানজিট সুবিধা প্রদান করতে গিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সেবার মান এবং দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হবে বলে তিনি আশা করেন। তাছাড়া, ট্রানজিট সেবা প্রদান করে বিভিন্ন খাতে আমাদের অতিরিক্ত আয়ও হবে বলে উল্লেখ করেন এই শিল্পপতি।

চিটাগাং চেম্বারের সহ-সভাপতি ও চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল অপারেটর সাইফপাওয়ারটেক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার মো. রুহুল আমিন বলেন, ট্রানজিট চুক্তির আওতায় ভারতের চট্টগ্রাম বন্দর সুবিধা ব্যবহার শুরু করার মধ্য দিয়ে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে এক নবদিগন্তের সূচনা হয়েছে।ট্রানজিটের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দু’দেশের অর্থনীতিতে। ভারতের ভূ-বেষ্টিত ‘সাত বোন’ খ্যাত রাজ্যগুলিতে কম সময়ে কম খরচে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস পৌঁছবে। তাতে সেখানেও অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন তরফদার আমিন।

উল্লেখ, ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবরে দিল্লিতে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য সরবরাহ করতে দুই দেশের চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী গত ১৬ জুলাই কলকাতার শ্যামাপ্রসাদ বন্দরে বাংলাদেশি পতাকাবাহী কোস্টাল শিপ এমভি সেঁজুতিতে চারটি কনটেইনার শিপমেন্টের মাধ্যমে ট্রান্সশিপমেন্ট পণ্য পরিবহনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

ভারতের কেন্দ্রীয় শিপিং প্রতিমিন্ত্রী মানসুখ মান্দাভিয়া ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এর উদ্বোধন করেন। জাহাজটি সেখান থেকে প্রথমে হলদিয়া বন্দরে যায়।

ট্রান্সশিপমেন্ট পণ্যের ৫৩.২৫ মেট্রিক টন রড আর ৪৯.৮৩ মেট্রিক টন ডালের কনটেইনারের পাশাপাশি এই দুই বন্দর থেকে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের আমাদানি করা বিভিন্ন পণ্যের কনটেইনার নিয়ে জাহাজটি গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করে। পণ্য খালাসের পর সড়ক পথে রড ও ডালবোঝাই চারটি ট্রেইলর আখাউড়া স্থলবন্দরে পৌঁছানোর পর বৃহস্পতিবার পণ্য খালাস হয়।

আর এ চুক্তির আওতায় ভারতীয় পণ্যের প্রথম চালান থেকে চট্টগ্রাম বন্দর আয় করেছে ৩০ হাজার ৮৯৯ টাকা এবং চট্টগ্রাম কাস্টমস আয় করেছে ১৩ হাজার ১০০ টাকা। এছাড়াও ভাড়া বাবদ বাংলাদেশী জাহাজ এমভি সেজুঁতি আয় করেছে প্রায় দেড় লাখ, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যাপ্ত গাড়ি ভাড়া বাবাব পাওয়া গেছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, এছাড়াও বিভিন্ন চার্জ বাবদ বাংলাদেশ আরো প্রায় ৩০ হাজার টাকা আয় করেছে।