প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও নান্দনিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি কুমিল্লা (ধারাবাহিক পর্ব : ১)

1 min read

।।মনির ফয়সাল, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ ।।


খাদি কাপড় ও রসমালাইয়ের জন্যে বিখ্যাত কুমিল্লা জেলা চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্গত একটি জেলা। শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতির পীঠস্থান এ জেলা। প্রাচীন ঐতিহ্যসমৃদ্ধ এই জেলা প্রাচীনকালে সমতট জনপদের অন্তর্গত ছিল এবং পরবর্তীতে এটি ত্রিপুরা রাজ্যের অংশ ছিল। নানা কারণেই এ জেলায় রয়েছে অনেক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি পর্যটনের ক্ষেত্রেও রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা। সারা বছর দেশ-বিদেশ থেকে আসা হাজার হাজার পর্যটকের আগমন ঘটে কুমিল্লার দর্শনীয় স্থানগুলিতে। এক কথায় প্রাকৃতিক সম্পদ আর নয়নাভিরাম দৃশ্যের অপূর্ব সমাহার কুমিল্লা। অসংখ্য প্রাকৃতিক ও প্রতসম্পদ নিদর্শনসমৃদ্ধ নয়নাভিরাম অপরূপ দৃশ্যের সমাহারে বিস্তৃত কুমিল্লার ঐতিহাসিক স্থাপনা ও ঘুরে বেড়ানোর সকল পর্যটন স্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শালবন বিহার, আনন্দ বিহার, ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি, ধর্মসাগর দীঘি, রূপবান মুড়া, চন্ডীমুড়া মন্দির, ম্যাজিক পার্ক ইত্যাদি।

কুমিল্লা শহর থেকে মাত্র ৮/৯ কিলোমিটার পশ্চিমে ময়নামতি কোটবাড়ি। এখানে অষ্টম শতকের পুরাকীর্তি রয়েছে। এখানকার বিভিন্ন স্পটের মধ্যে শালবন বিহার, নব শালবন বিহার ও বৌদ্ধ বিহার রয়েছে। শালবন বিহার দেখার পর প্রায় ৫ কিলোমিটার উত্তরে দেখবেন কোটিলা মুড়া। এখানে তিনটি বৌদ্ধ স্তুপ রয়েছে। কোটিলামুড়া দেখার পর এটি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সেনানিবাস এলাকায় অবস্থিত চারপত্র মুড়া। প্রায় ৩৫ ফুট উঁচু একটি ছোট ও সমতল পাহাড়ের চূড়ায় এর অবস্থান। পাহাড়পুর বিহারের পরই এর স্থান। এছাড়াও রয়েছে রূপবান মুড়া। রয়েছে ময়নামতি যাদুঘর, কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ।

নব শালবন বিহার, কুমিল্লা: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শান্তি প্যাগোডা

প্রত্নতাত্তিক নিদর্শনের এক মহিমা-মন্ডিত নাম কুমিল্লার ময়নামতি বৌদ্ধ বিহার বা শালবন বিহার। এখানে সারা বছরই পর্যটকদের আনাগোনা রয়েছে। তাছাড়া স্বল্প খরচে, স্বল্প সময়ে ভ্রমণ করা যায় বলে অনেকেই অবসর কাটাতে এখানে ছুটে আসেন। কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় প্রায় আড়াই একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই নব শালবন বিহার। চোখ ধাঁধানো এই স্থাপনাটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের একটি উপাসনালয়।

কুমিল্লার নব শালবন বিহার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বিহার বা শান্তি প্যাগোডা। নব শালবন বিহারের প্রবেশ দ্বার হতেই বা দিকে রয়েছে সোনালী রঙ এর ৬ টন ওজনের ৩০ ফুট উচ্চতার বিশাল প্রার্থনারত বৌদ্ধের মূর্তি। যখন রোদের আলোক রশ্মি এর উপর আছড়ে পড়ে তখন একে দেখতে আরো চমৎকার লাগে। মূর্তির পাশে রাজকীয় ভাবে নিরাপত্তা দেয়ার ভঙ্গিতে স্থাপিত আছে গর্জন রত একই রঙের দু টি সিংহ। সিংহ। এছাড়া চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে ৩ টি বড় ও ১ টি ছোট্ট সোনালী মোটক। পুরো মন্দিরটাই নানা রকম শৈল্পিক কারুকার্যখচিত।

ধাতব পদার্থের তৈরি দৃষ্টিনন্দন এই মূর্তিটি ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ থাইল্যান্ডের একটি বৌদ্ধ ধর্মীয় ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে নব শালবন বিহারকে উপহার হিসেবে দেয়া হয়। ২০১৪ সালের ১৫ আগস্ট স্থাপন করা চমৎকার এই মূর্তিটি অনেক দূর থেকেই পরিলক্ষিত হয়। এই মন্দিরটি দেখে মনে হবে যেনো চমৎকার শৈল্পিক কারুকার্যখচিত কোন বিদেশি স্থাপনার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।

আকর্ষণীয় নব শালবন বিহার ও বাংলাদেশ বুদ্ধিষ্ট কালচারাল অ্যাকাডেমি ১৯৯৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ বিহারকে ঘিরে দেশ বিদেশ হতে পর্যটকদের পাদচারণা রয়েছে। মন্দিরের পাশাপাশি এখানে আরো রয়েছে মেডিটেশন সেন্টার, শালবন বিহার স্কুল, এতিমখানা, লাইব্রেরী, জাদুঘর, সেমিনার ও হোস্টেল কক্ষ।

শালবন বৌদ্ধ বিহার

প্রত্নতাত্তিক নিদর্শনের এক মহিমা-মন্ডিত নাম কুমিল্লার ময়নামতি বৌদ্ধ বিহার। মাটি খুঁড়ে পাওয়া এসব প্রত্নতত্ত ভ্রমণ প্রিয়সীদের মনে দোলা দিয়ে যায়। ততকালীন রাজা-বাদশাহদের রেখে যাওয়া স্থাপত্য ই আজ আমাদের পর্যটনের একটি বিরাট খাত হয়ে দাড়িয়েছে।

বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন গুলোর মধ্যে অন্যতম কুমিল্লার বৌদ্ধ বিহার। পূর্বে এ প্রত্নতত্তটি শালবন “রাজার বাড়ি” নামে পরিচিত ছিলো। প্রত্নতাত্তিক খননে বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ উম্মোচিত হওয়ায় একে “শালবন বিহার” নামে আখ্যয়িত করা হয়। এর আসল নাম ছিলো “ভবদেব মহাবিহার”। খ্রিষ্টীয় সাত শতকের মধ্যভাগ হতে আট শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত দেব বংশের শাসকগন এই অঞ্চল শাসন করেন। উক্ত বংশের চতুর্থ রাজা ভবদেব কতৃক এই মহাবিহার নির্মিত হয়।

বর্গাকার বিহারটির প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য ৫৫০ ফুট। চার বাহুতে সর্বমোট ১১৫ টি সন্ন্যাস কক্ষ, মধ্যভাগে একটি উন্নত বৌদ্ধ মন্দির এবং মূল মন্দিরের চারপাশে ছোট ছোট ১২ টি মন্দির ও ৮ টি স্তুপ উম্মেচিত হয়েছে। বিহারের মূল ফটকের পূর্বপাশে খননের ফলে একটি প্রাচীন কূপের কাঠামো উম্মেচিত হয়েছে।ধারনা করা হয় ততকালীন বৌদ্ধ শাসকগোষ্ঠী এ কূপের পানি আহরনের মাধ্যমে যাবতীয় প্রয়োজন পূরন করতেন।

মন্দির ও মন্দিরের আশে-পাশে কয়েক দফা প্রত্নতাত্তিক খননের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পোড়ামাটির ফলক,ব্রোঞ্জের মূর্তি,নকশাকৃত ইট ও মুদ্রাসহ বিভিন্ন মূল্যবান প্রত্নতত্ত পাওয়া গিয়েছে। “খননের মাধ্যমে যে বিপুল পরিমান প্রত্নতত্ত পাওয়া গিয়েছে তা পার্শবর্তী জাদুঘরে সঞ্চিত রয়েছে”।

ময়নামতি জাদুঘর

কুমিল্লায় সমৃদ্ধির সাক্ষ্য পাওয়া যায় এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানা প্রাচীন পুরাকীর্তির। এইসব পুরাকীর্তির খননকালে মাটির নিচ হতে উদ্ধার করা হয় মূল্যবান পুরাতত্ত্ব সামগ্রীর। এইসব পুরাকীর্তির সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্য এখানে গড়ে তোলা হয় ময়নামতি জাদুঘর।

১৯৬৫ সালে কুমিল্লা কোটবাড়ির শালবন বিহারের দক্ষিণ পাশে শালবনকে সামনে রেখে পশ্চিমমুখী এই জাদুঘর স্থাপন করা হয়। এই জাদুঘরে ভবদের মহাবিহার, কোটিলা মুড়া, চারপত্র মুড়া, রূপবানমুড়া, ইটাখোলা মুড়া, আনন্দ বিহার, রানীর বাংলা ও ভোজ রাজার বাড়ি বিহারের খননকালে প্রাপ্ত নানা মূল্যবান পুরাতত্ত্ব এখানে জায়গা করে নেয়।

পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে জাদুঘরটিকে বর্ধিত করা হয় এবং এটি এখন ইংরেজি টি (T) আকৃতি ধারণ করে। এখানে মোট ৪২ টি আঁধার রয়েছে যেগুলোয় পুরাকীর্তি গুলো প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান খনন হতে প্রাপ্ত বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষের ভূমি নকশা, ধাতু লিপি ফলক, প্রাচীন মুদ্রা, মৃন্ময় মুদ্রক-মুদ্রিকা, পোড়া মাটির ফলক, ব্রোঞ্জ মূর্তি, পাথরের মূর্তি, লোহার পেরেক, পাথরের গুটিকা, অলংকারের অংশ এবং ঘরে ব্যবহৃত মাটির হাড়ি পাতিল এখানে প্রদর্শিত রয়েছে।

এছাড়া আছে কিছু পাথর ও ছোট বড় ব্রোঞ্জ মূর্তি। জাদুঘরে প্রদর্শনের উল্লেখযোগ্য পাথর ও ব্রোঞ্জ মূর্তি গুলোর মধ্যে রয়েছে- বিভিন্ন ধরনের পাথরের দণ্ডায়মান লোকোত্তর বুদ্ধ মূর্তি, ত্রি বিক্রম বিষ্ণুমূর্তি, তারা মূর্তি, মরীচি মূর্তি, মঞ্জুরের মূর্তি, পার্বতী মূর্তি, হরগৌরী মূর্তি, নন্দী মূর্তি, মহিষমর্দিনী মূর্তি, মনসা মূর্তি, গণেশ মূর্তি, সূর্য মূর্তি, হেরুক মূর্তি এবং ব্রোঞ্জের বজ্রসত্ত্ব মূর্তি।

এছাড়াও এই পুরাকীর্তির জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে বিভিন্ন স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, পোড়ামাটির ফলক, কাঠের কাজের নিদর্শন, মৃৎপাত্র ও প্রাচীন হস্ত লিপির নানা পাণ্ডুলিপি। এতো সব মূল্যবান এবং ঐতিহাসিক পুরাকীর্তির পাশাপাশি এখানে সংরক্ষিত আছে প্রায় ৩৭০ কেজি ওজনের ব্রোঞ্জের তৈরি বিশাল এক ঘণ্টা।

ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি

কমনওয়েলথ সমাধিক্ষেত্র বা ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি (Moynamoti War Cemetery) তে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৭৩৭ জন সৈন্য চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। যার মধ্যে যুদ্ধে নিহত সৈন্য ছাড়াও ২৪ জন জাপানি যুদ্ধবন্দি এবং ১ জন বেসামরিক ব্যক্তি রয়েছে।

কুমিল্লা থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের টিপরা বাজার ও ময়নামতি সাহেব বাজারের মধ্যস্থলে প্রায় ৪.৫ একর পাহাড়ি ভূমির উপর অবস্থিত ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি বাংলাদেশের ২য় কমনওয়েলথ সমাধিক্ষেত্র। স্থানীয় মানুষের কাছে ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি ‘ইংরেজ কবরস্থান’ হিসেবে পরিচিত হলেও এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টান এবং ইহুদির কবর রয়েছে।

২য় বিশ্বযুদ্ধে নিহত এবং যুদ্ধাহত হয়ে মারা যাওয়া সৈনিকদের ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদায় ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রিতে সমাহিত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের বাদশা মিয়া চৌধুরী রোডে ৭৫৫ সৈনিকের এমন আরেকটি কমনওয়েলথ সমাধিক্ষেত্র রয়েছে।

চলবে….