প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও নান্দনিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি কুমিল্লা (ধারাবাহিক পর্ব:২)

1 min read

।।মনির ফয়সাল, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ ।।


কুমিল্লা শহরকে ‘পর্যটনের শহর’ বললে অত্যুক্তি হবে না। কিংবা একে পুরাকীর্তি বা প্রত্নতত্ত্বের শহরও বলা যেতে পারে। হাজার বছরের পুরাতন এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন, স্থাপনা, পুরাকীর্তি কিংবা স্মৃতিচিহ্নের দেখা পেতে হলে যেতে হবে কুমিল্লায়।

কুমিল্লায় প্রাকৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী অনেক কিছুই আছে দেখার মতো। একেকটার সৌন্দর্য একেক রকম। যার কোনোটা দেখে আপনি বিস্মিত হবেন, কোনোটা দেখে পুলকিত হবেন আপনি। তারই ধারাবাহিকতায় আজ দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে- ইটাখোলা মুড়া, ডাইনো পার্ক, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, রূপবান মুড়া ও রানী ময়নামতির প্রাসাদ।

ইটাখোলা মুড়া

কুমিল্লা সদর উপজেলার থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে কোটবাড়িতে অবস্থিত ইটাখোলা মুড়া (Itakhola Mura) সপ্তম বা অষ্টম শতকে নির্মিত একটি বৌদ্ধ বিহার। রূপবান মুড়ার বিপরীত পাশে সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৪০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই প্রত্নস্থানে তিনটি স্তর পরিলক্ষিত হয়। প্রাচীনকাল থেকেই এখানে ইট পোড়ানো কারণে জায়গাটি ইটাখোলা মুড়া নামে পরিচিতি লাভ করে।

ইটাখোলা মুড়ায় বিভিন্ন সময় প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে একটি বৌদ্ধ মঠ ও বৌদ্ধস্তূপের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রায় ৫টি সাংস্কৃতিক যুগ অতিক্রম করার ফলে এই স্থানের সকল প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশনগুলো উদ্ধার করা বেশ জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবিষ্কৃত স্থানের মধ্যে বিস্তীর্ণ স্তূপ কমপ্লেক্স ইটাখোলা মুড়ার মূল আকর্ষণ। প্রায় ১৩.১ বর্গমিটার ভিতের উপর অবস্থিত এই স্তূপের সম্মুখভাগের কেন্দ্রে ২.৪ মিটার দৈর্ঘ্য ও ২.১ মিটার প্রস্থ্যের একটি ক্ষুদ্র পীঠস্থান রয়েছে।

ইটাখোলা মুড়ার প্রবেশ পথ ধরে উপরে উঠলে আয়তাকার ক্ষেত্রের মাঝখানে এই বিহারে মূল মন্দিরটি দেখতে পাওয়া যায়। এই মন্দিরের প্রধান উপাস্য হলেন ধ্যানী বুদ্ধ অক্ষোভ্য। এখানে ৩য় নির্মাণ যুগে নির্মিত একটি মস্তকবিহীন বৌদ্ধ মূর্তি রয়েছে। ইটাখোলা মুড়া থেকে প্রাপ্ত নিদর্শনের মধ্যে প্রায় ১৮ তোলা ওজনের স্বর্ণ, মাটির পাতিলে রক্ষিত সোনার বল, রৌপ্য মুদ্রা, তাম্রশাসন, মাটির ফলকলিপি, ধ্যাণী বুদ্ধ মূর্তির আবক্ষ অংশ, ধাতব ধ্যানীবুদ্ধ অক্ষোভ্য, ধাতব ধ্যানীবুদ্ধ অমিতাভ, গণেশ মূর্তি, অলংকৃত পোড়া মাটির ফলক, মাটির পাত্র, তেলের প্রদীপ, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

ডাইনো পার্ক

কুমিল্লা জেলার কোটবাড়ির জামমূড়ায় লালমাই পাহাড়ের ১২ একর জায়গা নিয়ে ডাইনোসর পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। সমতল ভূমি থেকে ৪৫ ফুট উঁচুতে অবস্থিত পাখির কলকাকলিতে মুখরিত মনোমুগ্ধকর এই থিম পার্কে হাজার বছর আগে বিলুপ্ত হওয়া ডাইনোসরেরা চলাফেরা করে। ডাইনোসর পার্ক নাম হলেও ডাইনো পার্ক (Dino Park) নামটি ছড়িয়ে গেছে সর্বত্র।

ডাইনো পার্কের প্রধান আকর্ষন ডাইনো জোনে যেতে চাইলে রংধনু সিঁড়ির ৪০ ধাপ বেয়ে টিলায় চড়তে হবে। ডাইনোসর গুলোর মটরাইড নড়াচড়া ও গর্জন দর্শনার্থীদের অনেক আনন্দিত করে। প্রতিটি ডাইনোসরের নিচে তাদের ইতিহাস সম্পর্কিত তথ্য দেয়া আছে। ডাইনো জোনের পাশেই একটি কৃত্রিম ঝর্ণা রয়েছে।

ডাইনোসর ছাড়াও ডাইনো পার্কে আছে বাম্পার কার, রোলার কোষ্টার, প্যারিস হুইল, ড্রাগন কোস্টার, অক্টোপাস, মেরিগো রাউন্ড সহ বেশকিছু আকর্ষণীয় রাইড, কিডস জোন, দ্যা হিল ক্যাফে রেস্টুরেন্ট, কার পার্কিং এবং পিকনিক আয়োজনের সকল ব্যবস্থা। ডাইনো পার্কের প্যারিস হুইলটি Eye Of Lalmai (লালমাইয়ের চোখ) নামে পরিচিত। প্যারিস হুইলের ১০০ ফুট উচ্চতা থেকে লালমাই পাহাড়ের অনন্য সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।

বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী

কুমিল্লা জেলা শহর থেকে ১০ কিলোমিটার পশ্চিমে কোটবাড়িতে অবস্থিত বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী বা বার্ড (Bangladesh Academy for Rural Development, BARD) একটি স্বায়ত্ত্বশাসিত গবেষণা ও প্রশিক্ষণ একাডেমী। ১৯৫৯ সালের ২৭ মে পল্লী উন্নয়নের লক্ষ্যে তৎকালীন সরকার কর্তৃক পাকিস্থান গ্রাম উন্নয়ন একাডেমি নামে যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে পল্লী গবেষক ড. আখতার হামিদ খান বার্ড নামকরণ করেন। প্রায় ১৫৬ একর ছায়া সুনিবিড় প্রাকৃতিক পরিবেশে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর অবস্থান।

বিভিন্ন ধরনের গাছ-গাছালি ও ফুলের বাগান রয়েছে একাডেমীর চারপাশে। এছাড়া বার্ডের বিশাল কমপ্লেক্সের মধ্যে রয়েছে পাঁচটি হোস্টেল, চারটি কনফারেন্স রুম, মসজিদ, লাইব্রেরী, হেলথ ক্লিনিক, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, দুইটি ক্যাফেটেরিয়া ও একটি প্রাইমারী স্কুল। স্বায়ত্ত্বশাসিত এই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী কর্মকর্তাদের ট্রেনিং প্রোগ্রাম পরিচালনা করার পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের আয়োজন হয়ে থাকে। আর বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে এখানে পিকনিক আয়োজনের যাবতীয় সু-ব্যবস্থা রয়েছে।

প্রতিষ্ঠালগ্ন হতেই বার্ড বিভিন্ন গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গ্রামীণ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পল্লী উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলছে। ১৯৬০ সালে গ্রামীণ উন্নয়নের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক ভাবে কুমিল্লা মডেলকে উন্নয়নশীল দেশের সামনে তুলে ধরার মাধ্যমে বার্ড বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছিল।

রূপবান মুড়া

কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে কোটবাড়িতে অবস্থিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার নাম রূপবান মুড়া (Rupban Mura)। ৯০ দশকে কুমিল্লা-কালিবাজার সড়কের কাছে অবস্থিত বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাসের এক অন্যতম এই নিদর্শনটি খনন করা হয়। কথিত আছে, রহিম ও রূপবানের ভালোবাসার এক অন্যতম নিদর্শন এই স্থান। তাদের অসম প্রেমের নানা ঘটনা ও কাহিনী রয়েছে সবুজ প্রকৃতির মাঝে গড়ে উঠা এই ঐতিহাসিক স্থানকে ঘিরে।

প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে রূপবান মুড়া থেকে ৩৪.১৪ ও ২৫ মিটারের একটি বিহার (ভিক্ষুদের আশ্রম) ও ২৮.৯৬ মিটারের একটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া মন্দিরের পূর্ব দিক থেকে একটি বৃহদাকার কারুকার্যময় বৌদ্ধমূর্তি ও ৫টি মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে, যা ময়নামতি জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

ধারণা করা হয়, এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো ৭ম থেকে ১২শ শতাব্দীর দিকে নির্মিত। রূপবান মুড়ার উঁচু বিহারের উপর দাঁড়ালে সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায়। তাই বিকেল বেলা ঘুরতে ও নিরিবিলি সময় কাটাতে কুমিল্লা শহরের স্থানীয় বাসিন্দা সহ সারা দেশ থেকে অসংখ্য পর্যটক রূপবান মুড়া পরিদর্শনে আসেন।

রানী ময়নামতির প্রাসাদ

কুমিল্লা জেলার বুড়িচং উপজেলায় কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের পূর্ব পাশে ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে সৌন্দর্যমন্ডিত রানী ময়নামতির প্রাসাদ (Palace of Queen Mainamati) অবস্থিত। দশম শতাব্দীতে চন্দ্র বংশীয় রাজা মানিক চন্দ্রের স্ত্রী ময়নামতির আরাম আয়েশের জন্য এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন। ধারণা করা হয়, ময়নামতি ইউনিয়নের প্রত্নতাত্ত্বিক এই নিদর্শনটি ৮ম থেকে ১২শ শতকের এক প্রাচীন কীর্তি।

প্রায় ১০ একর জায়গা জুড়ে লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের উত্তর প্রান্তে সমতল থেকে ১৫.২৪ মিটার উচ্চতায় একটি বিচ্ছিন্ন পাহাড়ের চূড়ার উপর রানী ময়নামতির প্রাসাদের অবস্থান। স্থানীয়দের মতে, এই স্থানতে একটি ক্রুশাকৃতির মন্দির ছিল, যা পরবর্তীতে সংস্কার করে ২য়, ৩য় ও ৪র্থ যুগে ক্রমান্বয়ে ছোট আকারের একটি পূর্বমুখী মন্দির বানানো হয়। ১৯৮৮ সালে ভূমি সমতল থেকে ৩ মিটার গভীরে প্রাপ্ত একটি সুড়ঙ্গ পথের সামনে খননের মাধ্যমে এই প্রাসাদের সন্ধান পাওয়া যায়। এছাড়া প্রাথমিকভাবে এখান থেকে নির্মাণ যুগের ৪টি স্থাপত্য, ৫১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৫০০ ফুট আয়তনের বেষ্টনী প্রাচীর, পোড়ামাটির ফলক, মূল্যবান প্রত্নবস্তু ও অলংকৃত ইট আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রতিবছর ৭ বৈশাখ এখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাসব্যাপী বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। দূর দূরান্ত থেকে অসংখ্য দর্শনার্থী এই মেলায় ভিড় করেন।

আনন্দ বিহার

কুমিল্লা জেলা সদরের কোটবাড়ির ময়নামতিতে অবস্থিত বাংলাদেশের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপত্য আনন্দ বিহার (Ananda Bihara)। ময়নামতির অন্যান্য স্থাপনাগুলোর মধ্যে বৃহত্তম এই মন্দির উপমহাদেশের শেষ বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। নকশা করা বর্গাকৃতির বিশাল বিহার কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে কেন্দ্রীয় মন্দির ও সুন্দর এক দিঘি। মন্দিরকে ঘিরে কাঠামোর প্রতিটি বাহুতে রয়েছে সন্ন্যাসীদের কক্ষ। বিস্তৃত আঙ্গিনার মাঝে অবস্থিত মন্দিরের উত্তর দিকের মধ্য ভাগে রয়েছে বিহারে প্রবেশ করার একমাত্র প্রবেশ দ্বার। আর বিহার হতে উদ্ধারকৃত বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে ৬৩ টি রৌপ্য মুদ্রা, তাম্রশাসন, ব্রোঞ্জ মূর্তি, পোড়ামাটির ভাস্কর্য ফলক ও মৃৎ পাত্র পোড়ানোর কাজে ব্যবহৃত ভাঁটি উল্লেখযোগ্য।

সপ্তম বা অষ্টম শতাব্দীর প্রথম দিকে দেব রাজবংশের তৃতীয় শাসক শ্রী আনন্দ দেব আনন্দ বিহার নির্মাণ করেন। ধারনা করা হয় সপ্তম শতকের শেষ দিকে সমতটের রাজধানী ছিল আনন্দ বিহার। পরবর্তীতে ১৯৪৪-৪৫ খ্রিস্টাব্দে আনন্দ বিহারের খনন কাজ করার লক্ষ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি গোচরে আনা হয়। বর্তমানে শুধু মন্দিরের দক্ষিন দিকের খনন কাজ শেষ হয়েছে এখনো বিহারের অধিকাংশ খনন করা বাকি রয়েছে।

চলবে……