পূণ্যভূমির টানে চলে আসুন উপমহাদেশের আদি তীর্থস্থান মহেশখালীতে

1 min read

।।মনির ফয়সাল,চট্টগ্রাম ব্যুরো।।

বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার আটটি উপজেলার মধ্যে একটি হলো মহেশখালী । এটি বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়িয়া দ্বীপ । এটি মহেশখালী দ্বীপ নামেও পরিচিত। এই দ্বীপকে বর্তমান সরকার ডিজিটাল আইল্যান্ড নামে ঘোষণা করেছে। এছাড়া এই দ্বীপটি মিনি সিঙ্গাপুর নামে খ্যাতি অর্জন করেছে। এই দ্বীপের নাম করণ করা হয় বৌদ্ধ সেন মহেশ্ব এর নাম অনুসারে। ১০৮ নামের মধ্যে “মহেশ” অন্যতম। পরবর্তী মহেশ থেকে মহেশখালী হয়।

মহেশখালীর পরিচিতি
১৯৫৪ সালে মহেশখালী থানা গঠিত হয়।মহেশখালী থানাকে ১৯৮৩ সালে ১৫ ডিসেম্বর উপজেলায় রুপান্তর করা হয়। এই উপজেলায় ৮ টি ইউনিয়ন ও ১ টি পৌরসভা রয়েছে। ইউনিয়ন সমূহ হলোঃ মাতারবাড়ি,ধলঘাটা,হোয়ানক, কালারমারছড়া,বড় মহেশখালী, কুতুবজোম ও ছোট মহেশখালী।মাতারবাড়ি ও ধলঘাটা ইউনিয়নের মধ্যবর্তী রয়েছে কোহুলিয়া নদী।যেটি বঙ্গোপসাগরের একটি শাখা।এই নদীটি এখন প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পথে।

এই দ্বীপের আয়তন প্রায় ৩৮৮.৫ বর্গ কিলোমিটার। ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জনসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ২১ হাজার ২১৮ জন। তারমধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৬৯ হাজার ৩১০ জন এবং মহিলা ১ লাখ ৫১ হাজার ৯০৮ জন।মোট জনসংখ্যার ৯০.০৮শতাংশ মুসলিম, ৭.৮০শতাংশ হিন্দু, ১.৩০শতাংশ বৌদ্ধ এবং ০.৮০শতাংশ অন্য ধর্মাবলম্বী।

মহেশখালী উপজেলার অধিকাংশ লোক শিক্ষিত। এ উপজেলায় ১টি সরকারি কলেজ, ১টি বিশ্ব বিদ্যালয় কলেজ, ১টি ফাজিল মাদ্রাসা, ৬টি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ, ৪টি আলিম মাদ্রাসা, ১৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৫টি দাখিল মাদ্রাসা,৬টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৬৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৬০০টি মসজিদ, ১৫টি মন্দির ও ৫টি বিহার রয়েছে।এই উপজেলায় প্রায় ২৭টি হাটবাজার রয়েছে এবং বাৎসরিক ১টি মেলা বসে।

মহেশখালী দর্শনীয় স্থানগুলো হলোঃ আদিনাথ মন্দির, সোনাদিয়া দ্বীপ ও সমুদ্র সৈকত, বড় রাখাইন পাড়া বৌদ্ধ মন্দির, লিডারশীপ ইউনিভার্সিটি কলেজ,নতুন জেটি,জমিদারবাড়ি, উপজেলা পরিষদ দীঘি, চরপাড়া সী-বিচ,প্যারাবন,চিংড়ী ঘের ও মৈনাক পাহাড়।মহেশখালী দ্বীপ এবং সমুদ্রের মাঝখানে আদিনাথ পাহাড়টির নাম মৈনাক পাহাড়। আদিনাথ মন্দির সমুদ্রস্তর থেকে প্রায় ২৮৮ ফুট উঁচু মৈনাক পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত।

উপমহাদেশের আদি তীর্থস্থান:

উপমহাদেশের আদি তীর্থস্থান হিসেবে প্রত্যেক হিন্দু এখানে পূজা করে। তাই মন্দিরের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই মন্দির কমপ্লেক্সে আছে একটি মসজিদ ও একটি রাখাইন বৌদ্ধ বিহার। তাই অনেকে মন্দিরটিকে অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক মনে করেন। প্রতিবছর শিব চতুর্দশী উপলক্ষে হাজার হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে এ মন্দিরে। এ উপলক্ষে ১০/১৫ দিন মেলা বসে। প্রাকৃতিক পরিবেশে মন্দিরটি আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান। মন্দিরের তিনদিকেই সমুদ্র।

বৌদ্ধ কেয়াং :

মহেশখালী জেটি থেকে বাজারে প্রবেশের আগেই সড়কের বাঁ পাশে মহেশখালী বড় বৌদ্ধ কেয়াং বা মন্দির। এর ভেতরে আছে বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ মন্দির। বেশ কয়েকটি পিতলের বৌদ্ধ মূর্তির দেখা মিলবে এ কেয়াংয়ে। তবে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ধ্যানমগ্ন বৌদ্ধ মূর্তি, মাথায় হাতে শায়িত বুদ্ধ এবং দণ্ডায়মান বুদ্ধ মূর্তি ইত্যাদি।

আদিনাথ মন্দির :

মহেশখালীর গোরখঘাটা ইউনিয়নের ঠাকুরতলা গ্রামে মৈনাক পাহাড়ের চূড়ায় আদিনাথ মন্দির। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পায় ৮৫ মিটার উচ্চতায় মন্দিরটির অবস্থান। মন্দিরটির দৈর্ঘ্য ১০.৫০ মিটার, প্রস্থ ৯.৭৫ মিটার এবং উচ্চতা প্রায় ৬ মিটার। মন্দিরটির আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে। উত্তরের অংশ সবচেয়ে পুরনো। আদিনাথ মন্দিরের পাশেই অষ্টভূজা নামে আরেকটি বিগ্রহের মূর্তি আছে। উত্তরের অংশের প্রথম ভাগে বর্গাকারের দুটি পূজাকক্ষে আদিনাথ বাণলিঙ্গ শিবমূর্তি এবং অষ্টভূজা দুর্গামূর্তি রয়েছে। সামনের দিকের প্রবেশপথটি ধনুকাকৃতির।

আদিনাথের মেলা :

বহুকাল ধরে আদিনাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে চলে আসছে আদিনাথের মেলা। ধারণা করা হয় মন্দিরটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এ মেলার প্রচলন। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীতে অর্থাত্ শিব চতুর্দশী উপলক্ষে এ মেলার আয়োজন হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গা ছাড়াও ভারত, নেপাল, মায়ানমারসহ আরো অনেক দেশ থেকে হিন্দু তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের সমাগম হয় এ মেলা উপলক্ষে। হিন্দু ধর্মাবলম্বী পুণ্যার্থীদের মেলা হলেও সপ্তাহব্যাপী স্থায়ী এ আয়োজনে সব ধর্মের লোকজনের সার্বজনীন মেলায় পরিণত হয়।

লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য

মহেশখালী উপজেলার লোকসংস্কৃতি ও লোক উৎসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আদিনাথ মেলা। প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের কোন একদিন থেকে শুরু হয়ে প্রায় দশ-পনের দিন পর্যন্ত চলে এই মেলা। মেলায় দেশীয় পণ্যের পসরা বসে। মাটির কিংবা বাঁশ-বেতের তৈরি জিনিসের মধ্যে হাঁড়ি পাতিল, কলসি, হাতা, ধুছনী, লোহার তৈরি দা-বটি ইত্যাদি পণ্য মেলাতে কেনাবেচা হয়। মেলা উপলক্ষে নাটক, যাত্রা, সার্কাস, পুতুল নাচ ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

অর্থনীতি

পান, মাছ, শুটকি, চিংড়ি, লবণ এবং মুক্তার উৎপাদন মহেশখালী উপজেলাকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি। দ্বীপটি লবণ ও পান ব্যবসায়ের প্রধান কেন্দ্র। সামুদ্রিক মাছ ধরা, চিংড়ি চাষ করা এবং তা প্রক্রিয়াজাতকরণ এই দ্বীপের একটি বিকাশমান শিল্প। পান চাষ এখানকার ঐতিহ্যবাহী পেশা ও ব্যবসা।শুষ্ক মৌসুমে সামুদ্রিক শুঁটকির জন্য দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ীদের ভিড় জমতে দেখা যায় এই দ্বীপে। এছাড়া রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ বালি।এ উপজেলায় ভূস্বামী, প্রান্তিক চাষী, বর্গাচাষী কৃষকেরা ছাড়াও রয়েছে ভূমিহীন কৃষকেরাও।

জীববৈচিত্র্য

মূল ভূ-খণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও এখানে এক সময় হাতি, বাঘ, হরিণ, বানর, ভালুক, বিভিন্ন প্রকারের সাপ, পরিযায়ী পাখি, দেশীয় পাখিসহ বিভিন্ন প্রকারের জীবজন্তুর চারণভূমি ছিল মহেশখালী। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস আর এক শ্রেণীর অসাধু শিকারীর চোরাদৃষ্টিতে মহেশখালীর জীব বৈচিত্র্য হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্তমানে হরিণ, বানর, গুটিকয়েক সাপ আর শীতের মৌসুমে অল্প কিছু পরিযায়ী পাখি চোখে পড়ে।

সোনাদিয়া :

মহেশখালী উপজেলার অধীন ছোট্ট একটি দ্বীপ সোনাদিয়া। প্রায় নয় বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ দ্বীপটি উপজেলার হোয়ানাক ইউনিয়নে অবস্থিত। মহেশখালী থেকে সোনাদিয়ার অবস্থান দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে। পর্যটন শহর কক্সবাজার থেকে সমুদ্র গর্ভে সোজা পশ্চিমে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে সোনাদিয়া।এ দ্বীপের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সহজেই মানুষের মন কাড়ে।

একদল জীবন সংগ্রামী জেলেদের বসবাস এ দ্বীপে। আর এ কারণেই পুরো দ্বীপ জুড়ে চোখে পড়ে শুঁটকি উত্পাদনের দৃশ্যাবলী। শ্বাসমূলীয় বা ম্যানগ্রোভ বনেরও দেখা মিলবে সোনাদিয়ায়। এ ছাড়া নির্জন সমুদ্রসৈকত, তীরে তার ঝাউ বন। দূর দিগন্তে মিশে যাওয়া সাগরের নীল জল, কী নেই এখানে?

একটু নির্জন বলেই হয়তো লাজুক লাল টুকটুকে কাঁকড়াদের অভয়াশ্রম সোনাদিয়ার সাগর সৈকত।কোথাও কখনো কখনো লাল কাঁকড়ারা সৈকত রাঙিয়ে বিচরণে নামে। পর্যটকদের পদধ্বনি শুনে হুটোপুটি আবার গর্তে লুকোয়।

মহেশখালী কীভাবে যাবেন?

মহেশখালী যেতে হলে আগে পৌঁছুতে হবে কক্সবাজার। সড়কপথে ও আকাশপথে ঢাকা থেকে সরসরি কক্সবাজার আসা যায়। এ পথে গ্রিন লাইন, সৌদিয়া, সোহাগ, হানিফ, টি আর ইত্যাদি পরিবহন সংস্থার তাপনিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল বাস চলাচল করে। ভাড়া ১১৫০ টাকা ১৫৫০ টাকা। এ ছাড়া এস আলম, সৌদিয়া, শ্যামলী, ইউনিক, ঈগল, হানিফ, ইত্যাদি পরিবহনের নন এসি বাসও চলে এ পথে। ভাড়া ৬০০-৭৫০ টাকা।

এ ছাড়া ঢাকা থেকে বাংলাদেশ বিমান, ইউনাইটেড এয়ার ও জিএমজি এয়ার ও রিজেন্ট এয়ারের বিমানে সরাসরি যেতে পারেন কক্সবাজার। কক্সবাজারের কস্তুরীঘাট থেকে মহেশখালী যাবার উপায় আগেই বলা হয়েছে। তবে এ পথ কেবল ব্যবহার করা যাবে শীত মৌসুমে। বর্তমানে অন্যান্য মৌসুমেও সড়কপথ ব্যবহার করে মহেশখালী, সোনাদিয়া ও ধলঘাটা বেড়াতে যাওয়া সম্ভব। এজন্য চকোরিয়া হয়ে বদরখালী সেতু পেরিয়ে সরাসরি যেতে হবে মহেশখালী। এ পথে ভালো কোনো বাস সার্ভিস নেই। তাই রিজার্ভ গাড়ি নিয়ে যেতে হবে।

কোথায় থাকবেন?

কক্সবাজারে থাকার জন্য এখন প্রচুর হোটেল রয়েছে। ধরন অনুযায়ী এসব হোটেলের প্রতি দিনের রুম ভাড়া ৩০০-২০০০০ টাকা। পাঠকদের সুবিধার জন্য নিচে কয়েকটি হোটেলের ফোন নম্বর দেওয়া হলো।কক্সবাজারে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের রয়েছে হোটেল শৈবাল, মোটেল উপল, মোটেল প্রবাল, মোটেল লাবনী, হোটেল সি গাল, (পাঁচ তারা), হোটেল সায়মন, হোটেল সি কুইন, হোটেল সাগর গাঁও লি. সুগন্ধা গেস্ট হাউস, জিয়া গেস্ট ইন, হোটেল সি হার্ট, হোটেল ডায়মন্ড প্লেস এন্ড গেস্ট হাউস, গেস্ট কেয়ার লি. হোটেল প্যানওয়া লি. ।

মহেশখালী, সোনাদিয়া ও ধলঘাটায় থাকার ভালো কোনো ব্যবস্থা নেই। কক্সবাজার থেকে দিনে দিনে ঘুরে আসতে হবে জায়গাগুলো থেকে। তবে সোনাদিয়া ও ধলঘাটা ভালোভাবে ঘুরে দেখার জন্য অবশ্যই নিরাপদ কোনো জায়গায় তাঁবু বাস করতে পারেন।

মহেশখালীর কৃতী ব্যক্তিক্ত বর্গগণ হলোঃ শহীদ মোহাম্মদ শরিফ, অজিত কুমার রায় বাহাদুর, ডাঃ অহিদুল হেলাল, ডাঃ মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম খান, অধ্যাপক ড. বদিউল আলম, কাওসার চৌধুরী, অধ্যাপক ড. সলিম উল্লাহ খান, অধ্যাপক ড. আনসারুল করিম, ড. রশিদ রাশেদ, ড. সাদাত উল্লাহ, ডাঃ ফাহমিদা রশিদ প্রমুখ।