ঘুরে আসুন মিনি কক্সবাজার পারকি সমুদ্র সৈকত চট্টগ্রামে

1 min read

।।মনির ফয়সাল, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ ।।

শীত আসলেই ভ্রমণ পিপাসুরা খুঁজতে থাকে ভ্রমণের জায়গা। পাশাপাশি নতুন গন্তব্যে’রওনা সন্ধানে থাকে পিপাসুরা। আর সেই রকম একটি পছন্দের পর্যটন স্পট “পারকির চর”। যা মিনি কক্সবাজারে হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের অন্যতম সমুদ্র সৈকত আনোয়ারা উপজেলার “পারকি সমুদ্র সৈকত”।

চট্টগ্রাম শহর থেকে পারকি বীচের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। যেতে সময় লাগে মাত্র এক ঘন্টা। এটা মূলত কর্ণফুলীর মোহনায় অবস্থিত। অর্থাৎ কর্ণফুলী নদীর মোহনার পশ্চিম তীরে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এবং পূর্ব-দক্ষিণ তীরে পারকী সমদ্রু সৈকত। চট্টগ্রাম সার কারখানা ও কাফকো যাওয়ার পথ ধরে যেতে হয়।

পারকী সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার পথে দেখা মিলবে অন্যরকম এক দৃশ্য। আঁকা বাকা পথ ধরে ছোট ছোট পাহাড়ের দেখা মেলবে। দেখা মেলবে চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিউএফল) এবং কাফকোর দৃশ্যও। চোখে পড়বে কর্ণফুলী নদীর ওপর প্রমোদতরীর আদলে নির্মিত নতুন ব্রিজ। যে কারো ভ্রমণকে দেবে বাড়তি আনন্দ। বীচে ঢুকার ১ কিলোমিটার আগে চোখে পড়বে, সারি সারি গাছ, সবুজ প্রান্তর, দেখা যাবে মাছের ঘের। অনেকের ইচ্ছে থাকে নিজ চোখে মাছের ঘের দেখার। পারকিরচরে যেতে তাই চোখে পড়বে। বীচে রয়েছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের মতো অসংখ্য ঝাউ গাছ আর ঝাউবন। দীর্ঘ ১৩ কিলোমিটার জুড়ে বিশাল এই সৈকতে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য চোখে পড়বে। তাছাড়া নদী পথেও যাওয়া যায় পারকি বিচে। চট্টগ্রামের নেভাল একাডেমি কিংবা বিমানবন্দর এলাকা থেকে কর্ণফুলী নদী পেরোলেই পারকি চর।

দীর্ঘ এক যুগ ধরে রয়েছে পারকি সমুদ্র সৈকতের নাম। প্রতিবছর শীত আসলে ওই বিচে পর্যটকের আনাগোনা মূখরিত হয়ে উঠে পুরো প্রান্তর। সাগরের গর্জন আর ঢেউয়ের মিতালী এবং সাগরের নীল পানি তীরের ঝাউবন প্রতিদিন শত শত পর্যটক ভিড় করছে পারকি বিচে। যেখান থেকে উপভোগ করা যায় সৈকতের বালুচরে লাল কাঁকড়ার ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য কিংবা দূরে গভীর সমুদ্রে নোঙর করা কিংবা সমদ্রু পথে চলতে থাকা ছোট-বড় জাহাজের সারি।

পর্যটকদের আরো বাড়তি দেয় বিচের পাড়ে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে নারিকেল ও সুপারি গাছ। আর সাগরের দিকে থাকালে পুরো আকাশটা যেন নুয়ে পড়ছে সাগরে। যেন সমূদ্রের জলকে চুমু খাচ্ছে পরম মমতায়। আর এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন শত শত পর্যটক বেড়াতে আসছে পারকির চর সৈকতে।

সমুদ্র সৈকতের সাথেই ঝাউবনের ছায়াতলে গড়ে উঠেছে খাবারের দোকানসহ অনেক দোকান-পাট। এর সঙ্গে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এছাড়া রয়েছে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানোর জন্য স্পিডবোট, সমুদ্র তীরেই ঘুরে বেড়ানোর জন্য সি-বাইক আর ঘোড়া। এজন্য অবশ্য আপনাকে নির্দিষ্ট ভাড়া গুনতে হবে ঘণ্টাপ্রতি হিসেবে।

সম্প্রতি পারকিরচর বিচে গিয়ে দেখা যায়, অস্যংখ্য পর্যটক সঙ্গি, পরিবার ও পরিজন নিয়ে সৈকতের বালিয়াড়িতে বসে কেউ গল্পে মেতেছে আবার কেউ সাগরের পানিতে গা ভিজিয়ে নিচ্ছে। সৈকতের পাশে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট ঝিনুকের দোকান। মাঝে কয়েক ফুসকা ও চটপটির দোকান।

এখানে বেড়াতে অনেক পর্যটকরা জানায়, পারকি সমুদ্র সৈকত দেখতে কক্সবাজারের চেয়ে কম নয়।

সৈকতের বাড়তি আকর্ষণ দানবাকার ক্রিস্টাল গোল্ড জাহাজঃ

পারকি সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছে দানবাকার ক্রিস্টাল গোল্ড জাহাজকে ঘিরে আগ্রহের কমতি নেই। সকলেই জাহাজের নিচে গিয়ে হরেক রকম সেলফিতে ব্যস্ত থাকে সারাক্ষণ।

২০১৭ সালের ৩০ মে দুপুরে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র প্রভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে এমভি ক্রিস্টাল গোল্ড নামের জাহাজটি আনোয়ারার পারকি সমুদ্র সৈকতে গিয়ে আটকা পড়ে। এর আগে বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে জাহাজটি জব্দ অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে বহির্নোঙরে ছিল। পরিবেশবান্ধব না হলেও সকলেই ভীড় জমাচ্ছেন এই জাহাজের সামনে গিয়ে কিছু সময় কাটাতে।

বারবিকিউ, ফায়ারক্যাম্প ও তাঁবুবাসঃ

বারবিকিউ, ফায়ারক্যাম্প ও তাঁবুবাসের জন্য পারকি সৈকতের মতো নিরিবিলি ও মুগ্ধতা অন্য কোন সৈকতে পাওয়া যায় না। ক্যাম্প করার জন্য আপনাকে অবশ্যই অনুমতি নিতে হবে। সেক্ষেত্রে লুসাই পার্ক সংলগ্ন এলাকায় করলে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। লুসাই কর্তৃপক্ষ আপনাকে অনুমতি ও যাবতীয় কাজে সহায়তা দিবে।

সৈকতের প্রবেশমুখঃ

পারকি সৈকতে পৌঁছে দুই দিক থেকে সৈকতে প্রবেশ করা যায়। প্রথমটি সৈকতের রোড। দ্বিতীয়টি লুসাই পার্ক। প্রথমটি সৈকতের রোড হলেও এই রোডে খুবই ভীড় থাকে ও অনেকটা গিঞ্জি এলাকা। সবসময় লোকে লোকারণ্য।এই রোড দিয়ে পর্যটকবাহী গাড়িগুলো খুবই বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একটু নিরিবিলিতে সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে প্রবেশ করুন লুসাই পার্ক দিয়ে৷ এই পার্কে কোন প্রবেশ ফি নেয়া হয়না। রয়েছে গাড়ি পার্কিং এর সুবিধা। প্রকৃতির সবুজ শ্যামল রুপ যেন লুসাই পার্ক। পর্যটকদের সব ধরণের সুবিধা আপনি এখানে পেতে পারেন। রয়েছে খাবারের ব্যবস্থা।

যেভাবে যাবেন

চট্টগ্রাম শহরের যেকোনো স্থান থেকেই বাস অথবা টেম্পুতে করে চট্টগ্রাম শাহ আমানত সেতু বা তৃতীয় কর্ণফুলী সেতুর কাছে যেতে পারেন। সেখানে গেলেই আপনি বটতলী মহসিন আউলিয়ার মাজারের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবেন। পারকি বিচে যেতে হলে আপনাকে বটতলী মহসিন আউলিয়া মাজারগামী বাসে উঠতে হবে।

বাসে উঠে কন্ডাক্টরকে বলতে হবে যেন আপনাকে ‘সেন্টার’ নামক স্থানে নামিয়ে দেয়। জায়গাটির প্রকৃত নাম মালখান বাজার, তবে এটি সেন্টার নামেই পরিচিত। এতটুকু পর্যন্ত আসতে বাসে জনপ্রতি ২৫-৩০ টাকা করে নেবে। সেন্টারে নেমে বিচে যাবার জন্য সিএনজি পাবেন। রিজার্ভ করলে ১০০-১৫০ টাকাতেই পৌঁছে দেবে পারকি সমুদ্র সৈকতে।

বিচে যাবার আগে খাবার-দাবারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস সেন্টার বাজার কিংবা কিছুটা দূরেই চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার হাউজিং কলোনিসংলগ্ন বাজার থেকে নিয়ে নিতে পারেন। বিচেও কিছু দোকান-পাট রয়েছে, তবে তাতে সবকিছু না’ও পেতে পারেন। আর যে কোন সমস্যার জন্য সমুদ্র সৈকতের কাছেই রাঙ্গাদিয়া পুলিশফাঁড়িতে যোগাযোগ করতে পারেন।

আবাসন সুবিধা

পর্যটকের আগমণের কারণে এখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠছে মোটেল। যেটা খুব শিগগিরই উদ্বোধন করা হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে আপাতত এখানে থাকার কোন ব্যবস্থা নেই। তাই পারকি সমুদ্র সৈকতে আসতে হলে সকালের দিকে আসাটাই সবচেয়ে ভালো। সারাদিন থেকে সূর্যাস্ত দেখে একটা সুন্দর স্মৃতি নিয়ে ফিরে আসতে পারবেন।