শাসক – বিরোধী দড়ি টানাটানিতে হুমড়ি খেয়ে পড়তে পারেন ছত্রধর মাহাতো !

1 min read

।। শ্রীপর্ণা মুখোপাধ্যায় ।।

হাতে গুনে গুনে কয়েকটা মাস, অতিমারীর থেকেও এখন আগ্রহ ভোট উৎসবে।২১শের নির্বাচন টা শাসক -বিরোধী এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যাবর্তন অথবা পরিবর্তন সরকারের উপরই আমজনতার ভবিষ্যৎ। ক্ষমতায় কে এলে ভালো হবে কে গেলে মন্দ হবে বা হবে না তা নিয়ে আলোচনা করার সময় এখনও আসেনি। তবে একটা তথ্য দিতেই পারি আপনাকে, মোড়ে মোড়ে -পাড়ায় পাড়ায় আলোচনা শুরু হয়েছে, আলোচনায় ফলাফল কী তা অবশ্যই আপনি বলুন।২১ শের নির্বাচনে দশক পরে আবার জঙ্গলমহল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, এবং আলোচনার কারণ অবশ্যই ছত্রধর মাহাতো।

চোখ বন্ধ রেখে বলে দেওয়া যায়, ছত্রধর বাবুর উপর কতটা ভরসা করে আছে শাসকদল। জঙ্গলমহলে “জেল খাটা “ছত্রধর মাহাতোকে কাজে লাগিয়ে যদি কোনও ভাবে গেরুয়া শিবির কে দুমড়ে মুচড়ে দেওয়া যায় তবে সেটা আলাদা জয় শাসকদলের। তৃণমূলে গুরুদায়িত্ব পাওয়ার পর তো বেশ চনমনেই ছিলেন ছত্রধর বাবু তবে মনে হয় হিসেবে নিকেশ বদলাতে শুরু করেছে…
একটু ফিরবো অতীতে, ছত্রধর মাহাতো কে নিয়ে আলোচনা যখন এবং যখন আশু নির্বাচনে ছত্রধর বাবু অনেকটাই গুরুত্বপূর্ণ তখন ছত্রধর বাবুর গোড়ার কথা জানা উচিত আপনার ও।

. ২০০৮ – ২০০৯ সালে জঙ্গলমহলে লালগড় কেন্দ্রিক আন্দোলনের প্রধান মুখ ছিলেন ৫৫ বছরের ছত্রধর মাহাতো।
. লালগড়ের আমলিয়ায় বাড়ি ছত্রধর মাহাতোর।
. প্রথমদিকে ছত্রধর বাবুর পারিবারিক শালপাতার ব্যবসা ছিল। খুব ছাপোষা আটপৌঢ়ে মানুষ ছিলেন ছত্রধর মাহাতো, তবে আজ তিনি অবশ্যই সেলিব্রেটি।
ছাপোষা হলেও প্রথম থেকেই আন্দোলন মুখী ছিলেন ছত্রধর মাহাতো। ছত্রধর মাহাতোকে সামনে রেখে এক সময় পুলিশি সন্ত্রাস বিরোধী জনগণের কমিটির আন্দোলনে জঙ্গলমহল উত্তাল হয়েছিল।
“মাওবাদী “শব্দ টা হালে ছত্রধর মাহাতোর সঙ্গে জড়িয়েছে। জঙ্গলমহলে ছত্রধর মাহাতো কে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অবতার হিসেবেই দেখেছেন জঙ্গলমহলবাসী। এটা অস্বীকার করার জায়গা নেই, রাজনীতির কারবারি রাও বলে থাকেন, যখন মাওবাদীদের হাতে একের পর এজ সিপিএম কর্মী খুন হয়েছেন তখন ছত্রধর মাহাতিম মিছিল করেছেন সারা জঙ্গলমহল জুড়ে, সেই মিছিলেছদ্দবেশে লুকিয়ে থাকতো মাওবাদীরা তবে শোনা যায়, সেই সব মিছিলে ছত্রধর বাবু গণতান্ত্রিক ডাবি দাওয়া র পক্ষেই আওয়াজ তুলতেন। তখনও মূল রাজনীতিতে আসেন নি ছত্রধর বাবু।


চলুন একটা ঘটনা মনে করাই, শালবনিতে ইস্পাত কারখানার শিলান্যাস করে ফুরচ্ছেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, এটা ২০০৮ সালের কথা বলছি, ভাদুতলায়(মেদিনীপুর থেকে অল্প দূরে)বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কনভয়ে মাইন ফাটল। সবাই জানেন অল্পের জন্য রক্ষে পান বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। আর কী এরপর সারা জঙ্গলমহলে পুলিশি ধরপাকড় শুরু হয়, চলে দিনভর তল্লাশি, জিজ্ঞাসাবাদ। লালগড়ের আদিবাসী মহিলারা পুলিশের বিরুদ্ধে নিগ্রহের অভিযোগ সামনে আনে, তখন গোটা লালগড় ফুঁসছে বলা যায়, গাছ কেটে রাস্তায় রাস্তায় ফেলে বিখ্যাত দেখাতে থাকে লালগড়বাসী, তৈরী হয়, “পুলিশি সন্ত্রাস বিরোধী জনগণের কমিটি “এই কমিটির মুখপাত্র হন ছত্রধর মাহাতো। তখন থেকেই মূল রাজনীতিতে ছত্রধর বাবু।জেলা স্তর থেকে একেবারে আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনা শুরু হয়ে যায় ছত্রধর মাহাতো কে নিয়ে। এলাকার সমস্যা? পঞ্চায়েত স্তরে দুর্নীতি? ভিড় ভিড় করে লোক তখন ছুটছেন ছত্রধর বাবুর কাছে।
ইতিহাস তো বলে, মাওবাদীরা নিজেদের সংগঠনের বিস্তারের জন্য তখন “ডেসপারেট “তৎকালীন সময়ে মাওবাদীরা একটি ছদ্ম গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মডেল কে বাস্তবায়িত করে বলে জানা যায়। রাজনীতির কারবারিরা বলে থাকেন, সেই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রধান চালিকা শক্তি ছিলেন ছত্রধর মাহাতো।
২০০৯ ,২৬ শে সেপ্টেম্বর, সেদিন সম্ভবত মহাঅষ্টমী, ভর দুপুরে ধরা পড়েন ছত্রধর বাবু। ছত্রধর বাবুর কিছুজন সহযোগীকে গুলি করা হয়।
. ইউএপিএ মামলা
. আরও ৩৬টি মামলা
. দুই পুলিশ কর্মীর অপহরণের মামলায় অভিযুক্ত হন ছত্রধর মাহাতো।
. যাবজ্জীবন কারাবাসের নির্দেশ দেওয়া হয়।
কলকাতা হাইকোর্ট সাজা কমিয়ে ১০ বছরের সাজা দেয় ছত্রধর মাহাতোকে।
নিশ্চয়ই মনে করতে পারেন, জনসাধারণের কমিটিকে সামনে রেখে জঙ্গলমহলে ২০১১ র দামামা বাজিয়ে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস। রাজনীতির চর্চাকারীরা বলে থাকেন বিধানসভায় তৃণমূলের জয় নিশ্চিত করতে অনেকাংশেই সাহায্য করে জনসাধারনের কমিটি। তৃণমূল ক্ষমতায় এলে জনসাধারণের কমিটির দাপুটে নেতারা সব তৃণমূলে দাপুটে হয়ে ওঠেন। ঢাকঢাক গুড়গুড়ের ব্যাপার নেই, আপনিও জানেন ছত্রধর মাহাতো শাসকদলের ভরসা ছিল, আজও আছে। দশ বছর পর জেল থেকে ফিরে ছত্রীধর বাবু ফের তৃণমূলের উঁচু পদে, সক্রিয় রাজনীতিতে। দায়িত্ব পেয়ে ছত্রধর বাবু জানিয়েছিলেন, “এটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, দলকে ঘুড়ে দাঁড়াতেই হতো জঙ্গলমহলের মানুষের থেকে অভূতপূর্ব সমর্থন পেয়েছি, আমি নিশ্চিত তৃণমূল কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় ফিরবে। “

দায়িত্ব ছত্রধর বাবুর অনেক হিসেব টা সোজা এই পর্যন্ত। কিন্তু যখন থেকে ছত্রধর মাহাতোকে পুনরায় এনআইএ জিজ্ঞাসা বাদ শুরু করেছে তখন থেকেই আশঙ্কার অন্য মেঘ। লাগাতাতার জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে ছত্রধর মাহাতোকে, আজ ও এনআইএর ২০৭ কোবরা ট্রেনিং ক্যাম্পে টানা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাঁকে।
. ২০০৯ জঙ্গলমহলে সিপিআইএম নেতা প্রবীর মাহাতো খুন
. ২০০৯ ভুবনেশ্বর রাজধানী এক্সপ্রেস হাইজ্যাক
পরপর দুটো নাশকতার ঘটনা তেই অভিযোগের আঙুল ছত্রধর বাবুর দিকে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে,জঙ্গলমহলের ছত্রধর বাবু তৃণমূলের ঝাণ্ডা ধরায় পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পাচ্ছে শাসক দল তবে কেন্দ্রীয় সংস্থা এএনআই এর চাপে নিজের পায়ের তলার মাটি সরে যেতে বসেছে পুনরায় সেটাও বুদ্ধিজীবীরা লক্ষ্য করছেন। জঙ্গলমহলে এক্স ফ্যাক্টর ছত্রধর বাবু তবে শালবনির কোবরা ক্যাম্প ছত্রধর মাহাতোর জন্য আবার না বড় কোনো পরিবর্তন নেই যদি এমনটা হয় তবে শাসক দলের হাতছাড়া হবে জঙ্গলমহল,গেরুয়া শিবির পাবে বাড়তি অক্সিজেন, শাসকদল যাবে ব্যাকফুটে এমনটাই মনে করছেন রাজনীতির কারবারিরা আর আপনি?