Prothom Kolkata

Popular Bangla News Website

যত কাণ্ড ১৪৮ নিয়ে, জমজমাট মেগা ইলেকশন

1 min read

।। প্রথম কলকাতা ।।

দাবি পাল্টা দাবি। ম্যাজিক সংখ্যা নিয়ে তরজা। রাজ্য রাজনীতিতে যুযুধান দুই পক্ষ বিজেপি এবং তৃণমূলের সবচেয়ে পছন্দের সংখ্যা অবশ্যই ১৪৮। রাজ্যে ক্ষমতায় বসার ম্যাজিক ফিগার। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় ওই সংখ্যা পেলেই কেল্লাফতে। তাই সেটা জোগাড়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে দু’পক্ষ। নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, ততই পারদ চড়ছে আমজনতার মধ্যে। সবসময় কি হয়, কি হয় ভাব। এরইমধ্যে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় দাবি করেছেন এখনই যদি নির্বাচন হয় তাহলে বিজেপি ২০০ আসনে জয়লাভ করে সরকার গড়বে অনায়াসে। যথারীতি বাবুলের এই দাবি ঘিরে চাপানউতোর শুরু হয়ে গিয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর এই দাবিতে কতটা বাস্তব ভিত্তি রয়েছে, সেটাই আজ আমরা ঝালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে কোনো নির্বাচনের আগে আজ পর্যন্ত এমন সাসপেন্স থ্রিলার দেখা যায়নি। নিত্যনতুন চমক দেখা যাচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই। সাধারণ মানুষের কৌতূহলও বাড়ছে তা নিয়ে। এরপরে কি হবে? এমন প্রশ্নে মুখর গোটা বাংলা। কয়েক মাস আগে একটু ফিরে যাওয়া যাক। শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল ছাড়বেন কিনা, বা ছাড়লেও নতুন দল করবেন নাকি তিনি বিজেপিতে যাবেন, তা নিয়ে জল্পনার অন্ত ছিল না। তার পাশাপাশি বারবার এরাজ্যে এসেছেন বিজেপির হেভিওয়েট নেতৃত্ব।

কখনো কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, কখনো বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডা, কখনো বা দলের অন্যান্য শীর্ষ নেতৃত্ব। আসতে দেখা গিয়েছে সঙ্ঘপ্রধান মোহন ভাগবতকেও। অমিত শাহ, নাড্ডারা বারবার দাবি করেছেন বিজেপি অন্তত ২০০ আসনে জিতে বাংলায় ক্ষমতা দখল করবে। এইভাবে কয়েকটা মাস কেটে যায়। অবশেষে সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত ১৯ ডিসেম্বর শুভেন্দু অধিকারী বিজেপিতে যোগদান করেন। রাতারাতি আগল খুলে যায় তৃণমূলের। দল ছাড়েন বহু বিধায়কসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ নেতা নেত্রীরা। তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিতে দেখা যায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতাদেরও। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে বিজেপির আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত দিল্লি থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যে ভাষণ দিয়েছেন, সেখানেও পশ্চিমবঙ্গকে আক্রমণ করেছেন। এর পাশাপাশি বঙ্গপ্রীতি দেখানোর জন্য মোদির মুখে এসেছে কবি মনোমোহন বসু থেকে রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, বিবেকানন্দ, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটকসহ কৃতি বাঙালিদের নাম। অর্থাৎ এটা পরিষ্কার বাংলা জয়ের জন্য যা যা হোমওয়ার্ক করা দরকার, তার সবটাই করে ফেলেছে গেরুয়া শিবির। সেই সঙ্গে ডায়মন্ড হারবারে বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডার কনভয়ে হামলার ঘটনায় নড়েচড়ে বসে কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক প্রবল চাপ দেয় রাজ্য প্রশাসনকে। যা নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা দেয় রাজ্য রাজনীতিতে। নতুন করে কেন্দ্র এবং রাজ্য সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গে গত লোকসভা নির্বাচনের বেশ কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। সেবার লোকসভা ভোটে প্রচুর শক্তি ক্ষয় হয়েছিল সিপিএমের। তখনই তৃণমূল বুঝে গিয়েছিল বাংলা জয় সম্ভব। এবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে মনে করছেন বিজেপি নেতৃত্ব। কারণ লোকসভা ভোটে বিজেপি ১৮ টি আসনে জয়লাভ করেছে, আর তার ভিত্তিতে ১২২টি বিধানসভা কেন্দ্রে এগিয়ে রয়েছে। তার মানে ম্যাজিক ফিগারের অনেকটাই কাছাকাছি তারা চলে এসেছে।

গত লোকসভা নির্বাচনের ফল বলছে বেশ কিছু আসনে সিপিএম মোটের ওপর ভালো ভোট পাওয়ায় সেখানে জয় হাতছাড়া হয়েছে বিজেপির। বিজেপির আশা তৃণমূল বিরোধী ভোট এবার আর ভাগ হবে না। পুরোপুরি মেরুকরণের ভোট হবে। একই কথা বলেছেন তৃণমূলের ভোট ম্যানেজার প্রশান্ত কিশোর। বলতে দ্বিধা নেই, পিকের এই বক্তব্যে ক্ষতি হবে তৃণমূলের। কারণ যারা তৃণমূলকে হারাতে চায় সেই অংশ বিজেপির সমর্থক না হলেও, মূল্যবান ভোট নষ্ট হওয়ার ভয়ে তাদেরই ভোট দিতে চাইবে। তাই তৃণমূলের লড়াইটা আরো কঠিন হবে বিধানসভা নির্বাচনে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শুভেন্দু অধিকারী ফ্যাক্টর এবং তৃণমূলের গোষ্ঠী কোন্দল।

অবিভক্ত মেদিনীপুরে ৩৫টি আসন রয়েছে। লোকসভার ভিত্তিতে তৃণমূল সেখানে ২৩টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। তারমধ্যে পূর্ব মেদিনীপুরে তারা এগিয়ে ১৪টিতে। এই পরিস্থিতিতে শুভেন্দু বিজেপিতে আসায় তারা নিশ্চিত অবিভক্ত মেদিনীপুর থেকে সিংহভাগ আসনে জিতবে পদ্ম শিবির। সেক্ষেত্রে ম্যাজিক ফিগারের দিকে অনেকটাই তারা চলে যাচ্ছে। এমন অঙ্কই দেখছেন তাঁরা। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দল। বিধায়ক-মন্ত্রীরা ভোটে জেতানোর ক্ষেত্রে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নন, যতটা গুরুত্বপূর্ণ দলের অসংখ্য কর্মীদের পাশাপাশি অন্যান্য সাংগঠনিক নেতৃত্ব।

আর সেই অংশের প্রত্যেকেই সর্বাধিক গুরুত্ব পেতে চান দলের তরফে। কিন্তু সেটা হয় না সবসময়। কেউ গুরুত্ব বেশি পান, কারোর ভাগ্যে জোটে কম। সেই অংশ যথারীতি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে অন্যের বিরুদ্ধে। ভোট বাক্সে তার একটা বড় প্রভাব পড়ে। আর সেটা পড়েছেও গত লোকসভা নির্বাচনে। শুভেন্দু অধিকারী দল ছাড়ার পর যেভাবে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যোগদানের হিড়িক পড়ে গিয়েছে, তাতে এটা পরিষ্কার এই সমস্যা কতটা প্রকট ছিল জোড়াফুল শিবিরে।

আসলে মাদার তৃণমূল এবং যুব তৃণমূলের দ্বন্দ্ব অনেক ক্ষতি করেছে দলের। জেলায় জেলায় কান পাতলেই শোনা যায় তৃণমূলের এক সর্বোচ্চ যুবনেতার বিভিন্ন কার্যকলাপে কতটা ক্ষুব্ধ দলের পুরোনো দিনের নেতাকর্মীরা। এই সমস্যা বড় বেশি ভোগাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। জানা গিয়েছে বিধানসভায় কত আসন দল জিততে পারে সে ব্যাপারে অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা করেছে বিজেপি। তাতে দেখা যাচ্ছে দল ১৫০-১৬০টির মতো আসন জিততে পারে। কিন্তু এখনও পরিষ্কার হয়নি রাজ্যে কতগুলি কেন্দ্রে মিম প্রার্থী দাঁড় করাবে। রবিবারই রাজ্যে এসেছেন মিম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। তিনি দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেছেন ফুরফুরা শরীফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকীর সঙ্গে।

উল্লেখ্য দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরব হয়ে প্রচুর সভা করেছেন আব্বাস। সেখানে প্রচুর ভিড় লক্ষ্য করা গিয়েছে। আব্বাস নতুন দল করবেন এটা বহুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে। তাই মিম প্রধানের সঙ্গে আব্বাসের বৈঠক বিধানসভা নির্বাচনের আগে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। মুসলিম ভোটের একটা অংশ যদি তাঁরা কেটে নিতে পারেন, তবে তৃণমূল বিধানসভা নির্বাচনে আরো বেশি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়বে। তাই বিজেপি যে ২০০ আসন জেতার দাবি করছে, তার পক্ষে এই ফ্যাক্টর গুলি কাজ করতে পারে।

এর পাশাপাশি বিজেপির পক্ষে রয়েছে প্রবল জনসমর্থন। এখনো রাজ্যের বহু মানুষ রীতিমতো সাইলেন্ট অবস্থায় রয়েছেন। প্রকাশ্যে তাঁরা কোনো কথা বলছেন না রাজনীতি নিয়ে। কিন্তু যেভাবে বোলপুরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোড শোতে জনপ্লাবন দেখা যায়, তাতে বিজেপির সম্পর্কে অনেকের উৎসহ বহুগুণ বেড়ে যাবে। টিভিতে লাইভ টেলিকাস্টের মাধ্যমে সেই দৃশ্য পৌঁছে গিয়েছে রাজ্যের প্রতিটি ঘরে। এগুলো মানুষের মনে অবশ্যই বড় এফেক্ট করে। শুধু নাড্ডা বা অমিত শাহ নন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বেশ কয়েকবার রাজ্যে এসে সভা বা রোড শো করবেন।

অর্থাৎ নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে টিম বিজেপি নির্বাচনের আগেই এভাবে বাংলা জুড়ে একটা গেরুয়া ঝড় তুলে দিতে চাইবে। সেটা ফেস করতে হবে তৃণমূলকে। সেই সঙ্গে নির্বাচনের আগেই রাজ্য জুড়ে শুরু হয়ে যাবে কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাপাদাপি। সূত্রে খবর, ৮০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী আনা হবে বাংলার নির্বাচনে কাজে লাগানোর জন্য। অর্থাৎ সবদিক থেকে একটা থ্রাশ দিতে চাইছে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তাই মনে করা হচ্ছে বাবুল সুপ্রিয় এই সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে এমন দাবি তুলছেন। এখনই নির্বাচন হলে বিজেপি ২০০ আসনে জয়লাভ করবে বলে তিনি দাবি করছেন।

পরিশেষে আবারও বলতে হবে শুভেন্দু ফ্যাক্টর একটা বড় সমস্যা হবে তৃণমূলের। বিজেপিকে এতদিন মূলত ভরসা করতে হয়েছে দিলীপ ঘোষ এবং মুকুল রায়ের ওপর। অর্থাৎ দলে নেতৃত্ব দানের সমস্যা ছিল। শুভেন্দু আসায় সেটা অনেকটাই কেটে গিয়েছে। এর পাশাপাশি বিজেপির একটা বড় প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে মিডিয়া সাপোর্ট। প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেল বিজেপির সমস্ত কর্মসূচি যেভাবে সামনে আনছে, তাতে ব্যাপক অ্যাডভান্টেজ পাচ্ছে গেরুয়া শিবির। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়ের ভূমিকার কথা।

তিনি যেভাবে নিত্যদিন তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ করছেন, তাতে অক্সিজেন পাচ্ছে বিজেপি। তাই প্রতিবেদন শেষে এটা বলতেই হচ্ছে, বিজেপি যে দাবি করছে, সেটাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কাজটা নিঃসন্দেহে কঠিন। কারণ বিজেপিকে লড়তে হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামটার বিরুদ্ধে। যেকোনো মুহূর্তে মমতা একাই নির্বাচনের ফলাফলকে ঘুরিয়ে দিতে পারেন। একাই গেমচেঞ্জারের রোল প্লে করতে পারেন। তাই বিজেপির কাছে লড়াইটা কঠিন, বেশ কঠিন। কিন্তু এতক্ষণ যে ফ্যাক্টরগুলো আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম, তাতে বিজেপির পক্ষেও বহু এলিমেন্ট থাকছে। অর্থাৎ লড়াইটা হবে রীতিমতো হাড্ডাহাড্ডি।