এখনও ওরা আছে

1 min read

।।মুকুল বসু ।।

গায়ে খদ্দরের চাদর জড়িয়ে গ্রামের শেষ মাথায় রতনের চায়ের গুমটিতে অনেকক্ষন ধরে বসে ছিলো মানুষটা। চুপচাপ একের পর এক চায়ের গ্লাস শেষ করে চলেছে। কৌতুহলী অনেকেই গায়ে পড়ে নানা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে তার দিকে। গ্রামে কোথায় এসে উঠেছে সে জানতে চেয়েছে অনেকেই। কিন্ত প্রতি ক্ষেত্রেই ঠোঁটে ঝুলানো একফালি মিষ্টি হাসির রেখা গালের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত অবধি টেনে হ্যাঁ অথবা না শব্দেই উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছে লোকটা। অদ্ভূতভাবে গ্রামে কার বাড়িতে সে এসেছে সেটা একরকম গোপন করেই শুধু বললো, আত্মীয়র বাড়িতে এসেছি। আর বড়ো কোনও শব্দই ব্যাবহার করেনি সে। সব কথার উত্তরেই মুচকি হেসেই জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছে সে। এই গ্রামে আজই প্রথম দেখা গেলো লোকটাকে। কে, কী তার পরিচয় কেউ কিছুই জানে না। 

শেষ বিকেলের সূর্যটা গ্রামের দূরে সোনালি ধানে মোড়া বিস্তীর্ণ বিল পেরিয়ে উঁচু মেঠো পথের আড়ালে ডুব দিতেই চা দোকান ছাড়লো লোকটা। পকেট থেকে একটা ১০০ টাকার নোট রতনের হাতে দিয়ে বললো, এটা রাখো, পরে যখন আবার চা খাবো, তখন কেটে নিও। এরপর আস্তে আস্তে সে মেঠো পথ বেয়ে ঢুকে গেলো গ্রামের ভিতরে।

অন্ধকার তখন ধীরে ধীরে জাঁকিয়ে বসতে আরম্ভ করেছে চারপাশে। হেমন্তের ঠান্ডা বাতাস শরীরে শিরশিরানি জাগিয়ে যাচ্ছে। দোকানের ল্যাম্পটা জ্বালতে জ্বালতে রতন দোকানের একপাশে বাঁশের চাতালে বসা সুবিমল কাকাকে জিজ্ঞেস করলো, লোকটাকে চেনো?

পৌড় সুবিমল অনেকটা নির্লিপ্তভাবেই উত্তর দিলেন, পুলিশ-পালাশের খোচর হবে মনে হচ্ছে। সাবধানে থাকিস। গ্রামের কথা যেন কিছু বলে ফেলিস না।

ল্যাম্পটাকে জ্বেলে দোকানের সামনে বিস্কুটের বয়ামের উপর রাখতে রাখতে রতন বললো, পুলিশ ঢুকলে তো ভালোই। যা চলছে গ্রামে।

সাপলুডোর মতো রাস্যাগুলো এঁকে বেঁকে কাটাকুটি খেলে গ্রামের পেটচিরে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে গিয়ে মিশেছে। ওধারে গ্রামের সীমানা শেষ হতেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া। এপারে বিএসএফ আর ওপারে বিজিবি। অথচ দুই পারের সীমান্তরক্ষীদের চোখে ধুলো দিয়ে এখানে রাতদিন সর্বক্ষনই চলছে চোরাকারবারীদের চোর-পুলিশ খেলা। প্রতিদিনই অপরিচিত মুখের ভিড় সীমান্ত লাগোয়া এই গ্রামে লেগেই থাকে। কে কোত্থকে আসছে, কোথায় যাচ্ছে, তার হিসেব রাখে না কেউ।

খদ্দরের চাদরটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে হনহন করে গ্রামের রাস্তা ধরে সোজা হাঁটতে লাগলো মানুষটা। চারপাশে অন্ধকারটা বেশ জমাট বেঁধে গিয়েছে ইতিমধ্যে। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া থেকে থেকেই যেন হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ ধরে একসময় হাঁটতে হাঁটতে সবার অলক্ষ্যে চলে গেলো মানুষটা।

পুরো মালটা বুঝে নিয়েছিস তো? কাল ভোরে মাল ঢুকলেই সোজা পোঁদে…

কথা শেষ করার আগেই বিড়ি মুখো ছায়ামূর্তিগুলো খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠলো। একজন বলে উঠলো, বাকিটা আর বলতে হবে না বড়োভাই।

অন্ধকারের মধ্যে খস খস শব্দে একের পর এক নোট গুনে ফেললো একটা ছায়ামূর্তি। তারপর নোটগুলোকে একটা বান্ডিল করে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গোটা তিনেক ছায়ামূর্তির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, পাক্কা পঁচাত্তর আছে। হাজার টাকার নোট। ঠিকঠাক মালগুলো ঢুকিয়ে দিস। এরপরেই তিনটে ছায়ামূর্তি পুরনো দোল মন্দিরের সিঁড়ি  বেয়ে নেমে এলো। তারপর অন্ধকারের মধ্যেই হারিয়ে গেলো।

গ্রামের সীমান্তের ধারে দীর্ঘদিন ধরে অযত্নে অবহেলায় পড়ে রয়েছে এই দোল মন্দিরটা। চারদিকে বড়ো বড়ো জঙ্গলে ঘিরে নিয়েছে জায়গাটা। গ্রামের মানুষ ভুতুড়ে দোল মঞ্চ বলেই চেনে মন্দিরটিকে। রাত বেরাতে নেহাত প্রাণের দায় না হলে কেউ এই রাস্তামুখো হয়না। শোনা যায়, অমাবস্যা মেনে মাঝ রাতে এই দোল মন্ডপের উপর নাকি দেখা যায় তেনাদের। অমাবস্যার রাতে রীতিমতো অশিরীদের নরক গুলজার চলে এই তল্লাটে। এছাড়াও নাকি গভীর রাতে এই দোল মন্ডবের উপর অতিকায় সব প্রেতাত্মারা ঘুরে বেড়ায়। গভীর রাতে পেত্নীর কান্না শোনা যায়। এই তো কয়েকমাস আগে এই দোল মন্ডপের সামনের মাঠে এক বাংলাদেশী যুবতীর ক্ষত বিক্ষত দেহ পড়ে থাকতে দেখেছিলো গ্রামের মানুষ। ফলে রাতে এই দোল মন্ডপের নামও মুখে আনতে চায় না গ্রামবাসী।

ছায়ামূর্তিগুলো নেমে যাওয়ার পর যে ছায়ামুর্তিটি দোল মন্ডবের উপরে বসে ছিলো সে গায়ের চাদরটা দিয়ে ভালো করে ঢেকে মাথাটাকে মুড়ি দিয়ে নিলো। তারপর পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে চাদরের মধ্যে রেখেই একটা নম্বরে ফোন লাগালো। স্ক্রিণে আলোটা নিভে যাওয়ার পরই মোবাইলটা কানে ধরলো সে। অপেক্ষা করতে লাগলো অপর প্রান্ত থেকে হ্যালো শব্দের অপেক্ষায়।

রক্তে ভেসে যাচ্ছে সালমার বাঁ পায়ের গোড়ালী। তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। অন্ধকারের মধ্যেই কোনওরকমে হাতের রুমালটা দিয়ে গোড়ালীটাকে বেঁধে নিলো সালমা। বিড় বিড় করে তীব্র আক্রোশে খিস্তি মেরে বললো, খানকির বাচ্চাগুলো আর সময় পেলো না। রুমাল দিয়ে চেপেও বন্ধ করা যাচ্ছে না রক্ত। অন্ধকারের মধ্যে ভালোই বুঝতে পারছে, অনেকটাই চিরে গিয়েছে কাঁটাতারে। আর একটু হলেই বিএসএফের হাতে ধরা পড়ে যেতো। ভাগ্যিস বরাত জোরে বেঁচে গেছে। এযাত্রা কাঁটাতারের নীচে পড়ে থাকা লম্বা ঘাস বনে শুয়ে নজর এড়িয়েছে বিএসএফের। না হলে এতোক্ষণে বানচোতগুলো ঠিক রুল ঢুকিয়ে দিতো…

বাঁশবনের অন্ধকারে বাঁ পায়ের গোড়ালীটাকে চেপে ধরে কোনওমতে বসে পড়লো সালমা। রক্ত বেরোনো না কমলে হাঁটা ঠিক হবে না। চারিদিক জুড়ে অখন্ড নিঃস্তব্ধতা। বাঁশবনের ওপারে কাঁটাতারের বেড়ার ধার দিয়ে ঘন ঘন পায়চারী করছে বিএসএফের দল। নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যে থেকে থেকে দূরের বিএসএফের উঁচু টাওয়ার থেকে সার্চ লাইটের আলো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে গোটা সীমান্তবর্তী এলাকাকে। প্রায় আধঘন্টার গোড়ালীটাকে চেপে ধরে বসে রইলো সালমা। রক্ত বের হওয়া কমলে বের হয়ে পড়লো সে। গ্রামের গলি ঘুঁজি রাস্তা তার হাতের তালুর মতো চেনা। সালমা জানে কোন পথ দিয়ে কোথায় গিয়ে ওঠা যায়। নিস্তব্ধ পায়ে সেই সমস্ত রাস্তা ধরে এগিয়ে চললো সে।

বারবার মোবাইলে চেষ্টা করেও লাইন লাগাতে পারলো না ছায়ামূর্তিটি। মনে মনে বিরিক্ত হয়ে বিড়বিড় করে গেলো, শালা মাগী ফোনে ফোনে সুইচ স্টপ করে রেখেছে কি জন্যে কে জানে? চূড়ান্ত বিরক্তি প্রকাশ করে একটা বিড়ি ধরালো। ফুক ফুক করে বিড়িতে টান দিতে লাগলো সমানে। মাথার ভিতর একদঙ্গল চিন্তা সমানে কিলবিল করছে। সামনেই কোরবানি ঈদ। এই সময় ঠিকঠাক যদি বাংলাদেশে মাল পাঠিয়ে দেওয়া না যায় তাহলে মোটা টাকার লোকসান ঘটে যাবে। ঈদের আগেই অন্তত চারটে ট্রিপ পাঠাতেই হবে বাংলাদেশ। যেভাবেই হোক কালকের মধ্যে ৫০ টির মতো  মালগুলো ঢোকাতেই হবে ওপারে। ফের মোবাইলে বোতাম টিপলো সে।কিন্ত খানিকক্ষন কুই কুই করে আবারও লাইনটা কেটে গেলো। বুঝে উঠতে পারছে না ছায়ামূর্তি। কখনও তো এতোক্ষন ধরে মোবাইল বন্ধ থাকে না। তাহলে কি কোনও  বিপদ ঘটে গিয়েছে! মেরুদন্ড দিয়ে শীতল একটা  স্রোত খেলে গেলো সারা শরীরে। ফের নিজের মনে বিড়বিড় করে উঠলো, মাগীদের দিয়ে কাজ করানোই শালা ঝামেলার। কি বিপদ ঘটতে পারে কিছুতেই ঠাওর করে পারছে না ছায়ামূর্তি। কখনও তো এতোক্ষন ধরে মোবাইল বন্ধ থাকে না। তাহলে কি কোনও বড়োসড়ো বিপদ ঘটে গেলো!!! বিড়িতে শেষ টানটা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলেই ফের নতুন আর একটা বিড়ি বের করলো পকেট থেকে। হঠাত যেন মন্দিরের উপরে ওঠার সিঁড়িতে কারো পায়ের শব্দ। মুহূর্তে সাবধান হয়ে উঠলো ছায়ামূর্তি। কোলের পাশে রাখা বিদেশী মডেলের রিভলবারটাকে সাঁ করে তুলে নিলো ডানহাতে। নাহ, আবার শুনশান। আর কোনও আওয়াজ কানে এলো না।

দোল মন্ডব থেকে বেশ খানিকটা দূরে রয়েছে পুরনো জমিদারদের পোড়ো নাট মন্দির। জঙ্গলে ভরা চারিদিক। বিষধর সাপ, শেয়াল থেকে খট্টাসের বাস সেখানে। দিনের বেলাতেও সে মুখো ভুলেও পা বাড়ায়না গ্রামবাসীরা। আচমকা সেই নাট মন্দিরের ভেতর থেকে ভসে এলো নাকি সুরে কান্নার আওয়াজ। যে আওয়াজকে গ্রামবাসীরা পেত্নীর আওয়াজ বলেই চেনে। নাকি সুরে বীভতস সেই কান্নার আওয়াজ। শুনলেই যেন সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। সপ্তাহের শনি মঙ্গলবার করে নাটমন্দির থেকে থেকে পেত্নীর এই কান্না শোনা যায়। গ্রামের লোকে বলে অপঘাতে মারা যাওয়া মহিলাদের আত্মাই নাকি প্রতি শনি মঙ্গলবার রাতে এই রকম অতৃপ্ত আর্তনাদ করে।

দোল মন্ডবের উপরে বসে পেত্নীর ওই ভয়াবহ নাকি সুরে কান্নার আওয়াজ শুনলো ছায়ামূর্তি। একটুও ভয় পেলো না সে। উলটে খানিকটা হলেও স্বাস্তির শ্বাস ফেললো সে। মোবাইল ফোনটাকে এবারে সুইচ স্টপ করে সোজা প্যান্টের পকেটে চালান করে দিলো সে।

রাত ক্রমশ গভীর হচ্ছে। আকাশে মেঘের উপর মেঘ জমেছে। রাত যতো বাড়ছে। ঠান্ডার দাপটটাও ততোই চড়ছে। শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে পার হয়ে যাচ্ছে সময়। পাশের পুরনো নাট মন্দির থেকে পেত্নীর কান্নার আওয়াজটা থেমে গিয়েছে বেশ কিছুক্ষণ। চারিদিকে ভীষন রকম চুপচাপ।গাছ থেকে শুকনো পাতা পড়ার শব্দটি কাণে এশে লাগোছে। চূপচাপ দোল মন্ডপের উপর চাদর মুড়ি দিয়ে বসে কারো অপেক্ষায় প্রহর গুনে চলেছে ছায়ামূর্তি। এবার ফের সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। কিন্ত এবার আর চমকে উঠলো না ছায়ামূর্তি। ও জানে কে আসছে।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ছায়ামূর্তির সামনে এসে দাঁড়ালো সালমা। হাতের ব্যাগটাকে ধপাস করে ফেলে বসে পড়লো। ছায়ামূর্তি ফের পকেট থেকে মোবাইল বের করে সুইচ অন করে নিলো। তারপর মোবাইলের টর্চ লাইট জ্বেলে সালমার শরীরের উপর ফেলতেই চমকে উঠলো।

-একি রক্ত কেন? কাকে দিয়ে মারিয়ে এলি?

অন্যদিন হলে রেগে যেতো সালমা। কিন্ত আজ একফোঁটাও না রেগে উলটে গলা অনেকটাই নামিয়ে বললো, তোমার রাজত্বে কার এতো সাধ্যি আছে বড়োভাই?

মোবাইলের টর্চটাকে বন্ধ করে ছায়ামূর্তি এবার রীতিমতো গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো, মোবাইল বন্ধ রেখেছিলি কেন? বিপদ ঘটেছে কোনও?

বড়োভাইয়ের প্রশ্নে বেশ খানিকটা সময় চুপচাপ থাকলো সালমা। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, বিপদের সঙ্গে বসবাস যখন বিপদ তো আসবেই। তা নিয়ে ভাবলে চলবে? বলেই হেসে উঠলো।

-মাগী দাঁত কেলাস না, কি হয়েছে বল?

আবার হেসে ফেললো সালমা। তারপর খানিকটা সময় থেমে বললো, তেমন কিছু না গো। কাঁটাতার পার হতে গিয়ে খানকির বাচ্চাগুলোর হাতে ধরা পড়ে যাচ্ছিলাম। গা ঢাকা দিতে গিয়ে গোড়ালীর ছাল কেলিয়ে গিয়েছে।

চুপচাপ হয়ে গেলো বড়োভাই। যেন দুঃশ্চিন্তার পাহাড় নামলো বুক থেকে। তবে ঠোঁটের ইপত বিড় বিড় করে বারবার বলতে লাগলো, …এবার মালগুলো কেন এতো জ্বালাচ্ছে?

বেশ খানিকক্ষন জিরিয়ে নিয়ে ব্যাগটাকে কোলে টেনে নিলো সালমা। তারপর ব্যাগ থেকে একটা শাড়ি টেনে বের করতে করতে বললো, এবার আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকো। আমার দিকে তাকাবে না।

অন্ধকারের মধ্যেই বড়োভাইয়ের মুখে মুচকি হাসি খেলে গেলো।

ঘন অন্ধকারের মধ্যেও যেন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সালমাকে। উঠে দাঁড়িয়ে একটানে শরীর থেকে শাড়িটাকে খুলে ফেললো সে। পট পট করে ব্লাউজের হুক খুলে পেছনে নিয়ে ফেলো দুটো হাত। খুলে দিলো ব্রা’র হুকটা। প্রায় বাতাবি লেবু সাইজের সালমার বুক দুটো বড়োভাইয়ের চোখের উপর দুলতে থাকলো। সায়ার দড়িতে হাত রাখলো সালমা। এবার চোখ দুটো বন্ধ করলো বড়োভাই। প্যান্টের ভিতর কেউ একটা যেন জেগে উঠেছে। ঠান্ডার মধ্যেও চনমন করে উঠলো সারা শরীর। বড়োভাই জানে সায়া খোলার পর কি করবে সালমা। তাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলো।

মিষ্টি একটা চকোলেট গন্ধ ভেসে এলো হাওয়ায়। বড়োভাই চোখ বন্ধ রেখেই বুঝতে পারছে এই গন্ধের উতস্থল কোথায়। সব কিছু ছাড়ার পর নতুন শাড়িটা শরীরে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে সালমা বললো, তিনটে মাল আনতে পেরেছি। দেখে নাও। সুগন্ধী কনডোমের মধ্যে ভরা সোনার তিনটে বাটের দিকে তাকিয়ে ফের মুচকি হাসলো বড়োভাই।

-ভাগ্যিস তোদের একটা বাড়তি ফাঁকা দিয়েছিলো আল্লা।

এবারে সত্যি সত্যিই  হিস হিস করে উঠলো সালমা। অন্ধকারের মধ্যেই বড়োভাইয়ের চোখে চোখ রেখে বললো, ওই বাড়তি ফাঁকের লোভেই তো তোমরা দুনিয়াদারী জাহান্নামে দিতে পারো।

খ্যাঁক খ্যাঁক করে  হেসে উঠলো বড়োভাই।

ভোরের আজানের ধ্বনি কাঁটাতারের ওপার থেকে ভেসে আসছে। এখনও জেগে ওঠেনি জনপদ। হাল্কা কুয়াশার চাদরের ফাঁক দিয়ে সবে ফ্যাকাসে একটা রেখা উঁকি দিতে শুরু করেছে পূব আকাশে। গ্রামের শেষ প্রান্তে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে তিনটে ট্রাক। ট্রাক ভর্তি সব গরু। কিছুক্ষনের মধ্যেই কাঁটাতারের ফাঁকা অংশ দিয়ে গরুগুলোকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে ওপারে। গুটি কতোক আবছায়া মূর্তি গরুগুলোকে টেনে নামাচ্ছে ট্রাক থেকে। এখন এই তল্লাটের ধারে কাছেও বিএসএফের কোনও গতাগম্য নেই। অবশ্য থাকার কথাও নয়। সেটা ভালো করেই জানে আবছায়া মূর্তিগুলি। যে কারনে একরকম নিশ্চিন্তে গরু ট্রাক থেকে নামিয়ে ওপারে পাঠানোর তোড়জোড় চলছে। ছটা তাগড়াই সাইজের গরুকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে জঙ্গলের ধারে নিয়ে এলো একটা ছায়ামূর্তি। সেখানে আগে থেকেই গ্লাভস হাতে পরে দাঁড়িয়ে ছিলো অপর একটা ছায়ামূর্তি। গরুগুলো আসতেই চোখের ইশারায় কথা হয়ে গেলো দুইজনের মধ্যে। একজন  এক একটা করে গরুর মুখ চেপে ধরলো। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হাতে ছোট্ট সাইজের একটা কৌটো নিয়ে সোজা গরুগুলোর মলদ্বারে ঢুকিতে দিলো অন্য ছায়ামূর্তিটি। সিং বাগিয়ে কিছুটা ছটফট করলেও পরে ফের শান্ত হয়ে গেলো গরুগুলি।

হাত থেকে গ্লাভস খুলতে খুলতে ছায়ামূর্তিটি প্রায় নির্দেশের সুরে বললো, বর্ডা্র পার হওয়ার পর রমজানকে আগে জবাই করতে বলবি এই ছটা মালকে। আর পথে খেয়াল রাখবি গোবরের সাথে মাল বের হয়ে না যায়। এরপরই চাপা স্বরে হেই হেই করে গরুগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে কাঁটাতারের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেলো বাকি ছায়ামূর্তিগুলি।

হাতের গ্লাভসজোড়া খূলে ব্যাগে ঢোকানোর পর পকেট থেকে মোবাইল বের করে কানে ফোন লাগালো ছায়ামূর্তি। অপর প্রান্ত থেকে হ্যালো বলতেই সে বললো, বড়োভাই ছটার ল্যাজের গায়ে ‘ট্রিপিল এক্স ওয়াই প্লাস’ চুহ্ন দেওয়া আছে। ফোন করে বলে দাও। এরপরেই ফোন নামিয়ে নিলো সে।

ততোক্ষনে ট্রাকগুলো গর্জন তুলে ফিরতি পথ ধরে নিয়েছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই এই তল্লাট পার হয়ে যাবে তারা।

সকালের আলো ফুটতেই সীমান্তবর্তী এই গ্রামের জনজীবন জেগে উঠেছে। সকালে সবেমাত্র এসে দোজান খুলে ধুপ ধুনো দিয়ে  চায়ের স্টোভে আগুন জ্বেলেছে রপ্তন। গোঁ গোঁ শব্দে আগুনের রেখা ক্রপমশ নীলাভ হতে শুরু করেছে। খদ্দরের চাদর গায়ে গতকালের সেই লোকটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে রতনের চায়ের দোকানের দিকে। চায়ের কেটলিতে দুধ ঢালতে ঢালতে খানিকটা অবাক চোখে লোকটার দিকে তাকালো রতন। মনের মধ্যে অনেকগুলো প্রশ্ন কিলবিল করছে ওর। মনে সাহস নিলো। লোকটা যদি দোকানে ঢোকে তাহলে আজ জিজ্ঞেস করে ফেলবে।

সূর্যের আলোটা রতনের চা দোকানের মধ্যে এসে পড়েছে। হাল্কা শীতের ইমেজের মধ্যে বেশ মিঠে মনে হচ্ছে রোদ্দুরটা। সোজা রতনের দোকানে ঢুকে বাঁশের বেঞ্চের উপর বসে পড়লো খদ্দরের চাদর গায়ে লোকটা। রতনের দিকে না তাকিয়েই চায়ের অর্ডার দিলো। তারপর দোকানে রাখা সংবাদপত্রটা টেনে নিলো।

-মশাই কি কাল রাতে এই গ্রামেই ছিলেন? সাহস করে জিজ্ঞেস করে ফেললো রতন।

পেপার থেকে চোখ না তুলেই উত্তর এলো, হুম।

-কার বাড়িতে উঠলেন?

এবার গোঁফের তলায় হেসে উত্তর এলো, আত্মীয়র বাড়তে।

চায়ের কাপে চিনি ফেলে চামচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে রতন জিজ্ঞেস করলো, আপনি কি পুলিশের লোক?

হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপটা নিতে নিতে লোকটা বললো, আমাকে দেখে কি পুলিশের লোক  বলে মনে হচ্ছে?

এবার বেশ থতমত খেয়ে গেলো রতন। বুঝতে পারলো, লোকটা খুব একটা সুবিধার নয়। ফলে চুপচাপ হয়ে গেলো সে।

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে এবারে লোকটা বললো, আমি এদেশে থাকি না ভাই। ভালো দালাল থাকলে জানাবেন তো। আমরা ইট ভাটায় কাজ করতে এদেশে এসেছিলাম। আমার কয়েকজন বন্ধু কাল পরশুর মধ্যে এখানে আসবে। ওরা এলেই ওপারে পার হয়ে যাবো।

লোকটার কথা শুনে এবার রীতিমতো বিষম খেয়ে উঠলো রতন। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা রতনের চোখ জোড়া যেন আচমকা কুঁচকে উঠলো। মনে মনে বিড়বিড় করলো, এ লোক ভাটায় কাজ করে! হতেই পারে না। রতন নিশ্চিত, নির্ঘাত এ লোক পুলিশের খোচর।  গতকাল সুবিমল কাকা ঠিকই বলেছে। তাই প্রতুত্তরে শুধু আচ্ছা বলেই থেকে গেলো রতন।

ফের কাগজে মনোনিবেশ করেছে লহদ্দরের চাদর গায়ে লোকটা। ধীরে ধীরে চায়ের দোকানে একজন দুইজন করে খদ্দের আসতে আরম্ভ করেছে। লোকটা বাঁশের বেঞ্চের এক কোণায় বসে যেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কাগজ পড়েই চলেছে।

শীতের বেলা সেখতে দেখতে কখন পার হয়ে যায় বোঝা মুশকিল। দুপুরে কোনওদিনই বাড়িতে যায় না রতন। দুপুরে রতনের বউ এসে রুটি তরকারি দিয়ে যায় দোকানে। এদিনও তার ব্যাতিক্রম হলো না। দুপুর নাগাদ বউ এসে টিফিন কৌটোতে করে খাবার দিয়ে চলে গিয়েছে। খাবারের কৌটো খুলতে খুলতে রতন ফের খদ্দরের চাদর পরা লোকটার কথা মনে পড়লো। বড়ো অদ্ভূত মানুষ। আজও দোকান ছেড়ে যাওয়ার আগে একটা একশো টাকার নোট দিয়ে গিয়েছে। অথচ চা খেয়েছে মাত্র তিনবার। আর গোটা দুয়েক বিস্কুট। লোকটার কাছে তো ঋণী হয়ে যাচ্ছে রতন। শুকনো রুটির সঙ্গে ঢেঁড়স ভাজা ভরে মুখে তুলতে তুলতে ভাবলো, দূর, মাল দিচ্ছে কামিয়ে নাও। আমি তো আর ঠকাচ্ছি না।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামতে শুরু করেছে। এবেলা আর রতনের চায়ের দোকানে দেখা মিললো না খদ্দরের চাদর পরা লোকটার। তবে বেশ কয়েকটা অপরিচিত মুখ দেখেছে রতন। গ্রামে যে বড়োসড়ো একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে তা যেন বারবার ওর মন ডেকে বলছে। এর আগে এমন সভ অদ্ভূত লোকজনের আসা যাওয়া গ্রামে দেখেনি রতন।

সন্ধ্যের আলো জ্বালতেই সুবিমল কাকা এসে দোকানে ঢুকলো। সেই সকাল থেকে সুবিমল কাকার জন্য মনে মনে অপেক্ষা করে ছিলো রতন। গোটা গ্রামের মধ্যে শ্রদ্ধা ভক্তি বলতে এই মানুষটাকেই করে রতন, একসময়ে স্কুলে শিক্ষকতা ছাড়ার পর এখন নিজেই বাড়িতে বিনা পয়সায় গ্রামের গরীব ছেলে মেয়েদের পড়ান তিনি। সুবিমল কাকার দুই ছেলেই কলকাতায় থেকে চাকরি করে। বাড়িতে কাকা ও কাকিমা দুই জনেই থাকেন। সুবিমল কাকার কাছে আজ সকালে লোকটার কথাগুলো বলবে বলে সবে মুখ খুলতে যাবে, সেই সময় দূরে নজরে পড়লো খুব দ্রুত গতিতে ছুটে আসছে দুটো আলোর চোখ। ভালো করে বোঝার চেষ্টা করলো রতন। তারমধ্যেই সুবিমল কাকা বেঞ্চে বসে জিজ্ঞেস করলো, গ্রামের পরিস্থিতি মোটেই ভালো ঠেকছে না রে। অলটপকা কথাবার্তা কাউকে কিছু বলে ফেলিস না যেন।

কাকার কথার উত্তরে সবে কিছু একটা বলার জন্য তৈরি হচ্ছে রতন, সেই সময়ে দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো একটা পুলিশ ভ্যান। রীতিমতো চমকে উঠলো সে। সন্ধ্যের পর সচারাচার গ্রামে কখনও পুলিশ ঢুকতে দেখেনি রতন। হুটপাট করে তিন চারজন কনস্টেবেল জিপ থেকে নেমে সোজা রতনের চায়ের দোকানে ঢুকলো। গোটা চারেক চায়ের অর্ডার দিয়ে একজন রতনকে জিজ্ঞেস করলো, অ্যাই, এখান থেকে বিএসএফ ক্যাম্পে যেতে কতো সময় লাগবে রে?

প্রশ্নকর্তার মুখের দিকে না তাকিয়েই রতন উত্তর দিলো, গাড়িতে মিনিট কুড়ি।

চা খেতে ফের জিপে উঠে গেলো কনস্টেবেলগুলো। মুহুর্তের মধ্যে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে ছুটলো জিপটা। অবাক বিস্ময়ে সুবিমল কাকার দিকে তাকালো রতন।

ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় রাত আটটা। দোল মন্ডবের সিঁড়ি বেয়ে প্রায় বিকে হেঁটে উপরে উঠে এলো সালমান। বড়োভাইয়ের কাছে এসে গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বললো, বড়োভাই গ্রামে পুলিশ ঢুকেছে। তাছাড়া উটকো পাটকা বেশ কিছু লোকজনও গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেটা বলতেই এসেছি। সাবধানে থেলো। ভাঙা একটা গ্লাসে মদ ঢালতে ঢালতে বেশ খানিকক্ষন চুপ করে থাকলো বড়োভাই। সালমান আবার ফিসফিস করে বলে উঠলো, খদ্দরের চাদর গায়ে একটা অচেনা লোককে আজ বিকালে এখান দিয়ে যেতে দেখেছি। খুব একটা সুবিধার মনে হয়নি লোকটার তাকানো টাকানো। সালমানের কথা শুনতে শুনতে জলছাড়া মদের গ্লাসে চুমুক দিয়ে পাশে রাখলো বড়োভাই। তারপর মাথা নীচু করে বেশ খানিকক্ষন ভাবলো। অনেকটা সময় নিয়ে বল্লো, অতো চিন্ত করিস না। ভূতের উপদ্রবটা আবার শুরু হবে। তুই বর্ডার থেকে একটা বেওয়ারিশ মাগী তুলে নিয়ে আয় আজ রাতে।

এবার প্রায় নিঃশব্দে হেসে উঠলো সালমান। তারপর ফলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলো, তুমি একা নাকি, আমরাও ভাগ পাবো?

এবারে আর একবার গ্লাসে রাখা মদটাকে গলায় চালান করে দিয়ে সামলানের পিঠে হাত রাখলো বড়োভাই। বললো, কলজে ফুটো করার আগে তোরাও…।

বড়োভাইয়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই চাপা গলায় খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠলো সালমান। এরপর যেমন নিঃশব্দে উপরে উঠে এসেছিলো, তেমনই নিঃশব্দে নীচে নেমে গেলো।

সালমান, মুস্তাফিকুর, লাল্টু আর ইমরান মিলে কাঁটাতারের এপাশে প্রায় হায়নার মতো শিকারের আশায় ওত পেতে বসে রয়েছে সেই রাত নটা থেকেই। রাত ১১ টা বাজতে চললো অথচ আজ কাউকেই দেখা পাচ্ছে না ওরা। লাল্টু কাঁচা খিস্তি মেরে বললো, ওপারে খানকির পুত বিজিবিগুলো মনে হচ্ছে আজ ঝামেলা পাকাচ্ছে।

কথা শেষ করার আগেই লাল্টুর মুখ চেপে ধরলো ইমরান। কাঁটাতারের ফাঁক গলে পর পর গোটা দশেক ছায়া গুঁড়ি মেরে এপারে ঢুকছে। বুকের মধ্যে আচমকা যেন ধুকপুকানিটা বেড়ে গেলো ওদের প্রত্যেকের। একে একে ছায়াগুলো কাঁটাতার পার হয়ে এপারে বাঁশ বনের জঙ্গলে ঢুকতেই একসঙ্গে হামলে পড়লো ওরা। আগে থেকেই টার্গেট করা দুটো ছায়ামূর্তিটিকে জাপটে ধরে মুখে কাপড় চেপে ধরলো ওরা চারজন। যেন শিকারি হায়না কোন ও শিকার পাকড়াও করলো। তারপর হিড়হিড় করে ছায়ামূর্তি দুটোকে টেনে নিয়ে গেলো বাঁশ বনের গহীনে গ্রামের দিকে। বাকি ছায়ামূর্তিগুলি যে যেদিকে পারলো অন্ধকারের মধ্যেই দৌড় লাগালো। পাকড়াও করা ছায়ামূর্তি দুটো একেবারে ডবকা সাইজের ১৯ থেকে ২৩ বছরের মেয়ে। বোধহয় কাজের লোভেই ইন্ডিয়ায় ঢুকেছিলো। চারজনের হাত থেকে বাঁচতে তীব্র ছটফটানি আর বোবা গোঙানি ছেড়ে আছাড়ি পিছাড়ি খাচ্ছে মেয়ে দুটো। এবারে বিরিক্ত হয়ে সালমান ঠাটিয়ে চড় কষাল মেয়ে দুটোর গালে। তারপরেই একরকম দুই হাত ধরে হিঁচড়াতে হিঁচড়াতে টেনে নিয়ে চললো জঙ্গলে ভরা নির্জন গ্রামের মেঠো পথ ধরে।

রাত ১২ টা বেজে ১০। প্রায় হাফাতে হাফাতে দুটো নারী শরীর একরকম টানতে টানতে মন্দিরের উপর এনে তুললো সালমানরা। দুটোই ডবকা মেয়ে। বড়োভাই তখম মদের নেশায় চুর। মেয়ে দুটোকে মন্দিরের উপর খোলা চাতা;এ ফেলে দম ভরে শ্বাস নিলো সালমানরা। সারা মুখ আর গলা মিলিয়ে কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে ফেলেছে মেয়ে দুটোর। বেঁচে না মরে তা বোঝা মুশকিল। টালমাটাল পায়ে উঠে দাড়ালো বড়ভাই।

মালগুলো হিঁদু না মোসলমান রে?

এবার সালমান খ্যাঁক খ্যাঁক করে দাঁত কেলিয়ে বললো, মাগী পেয়েছো ব্যাস। তবে খানকি মাগী যে নয় তা গ্যারান্টি আছে। খেদি, পেঁচি, নুরজাহান আসল জায়গায় তো সব সমান। বলেই আবার দাঁত কেলালো সে।

এবার আর মুখে কোনও কথা না বলে একটি মেয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো বড়োভাই। অপর মেয়েটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো সালমানরা। সামান্য গোঙানির শক্তি পর্যন্ত যেন হারিয়ে ফেলেছে মেয়ে দুটো। সামান্য প্রতিরোধ করার শক্তিও শেষ তাদের শরীরে। নিস্তেজ শরীরের উপর একের পর এক পালা করে চললো নির্যাতন। শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ লন্ডভন্ড করে নিজেদের শরীর ঠান্ডা করলো ওরা। শেষ বারের মতো মুস্তাফিকুর নিজের শরীরের উত্তাপ একটা মেয়ের শরীরে ঢালতে গিয়ে যেন চমকে উঠলো। চাপা গলায় চিতকার করে উঠলো, মাগীর সারা শরীর ঠান্ডা রে। টেঁসে গেছে মনে হচ্ছে। মুস্তাফিকুরের কথা শুনে একসঙ্গে হেসে উঠলো সবাই। জড়ানো গলায় বড়োভাই বললো, বোকাচোদা… দেরী করিস না।

আচমকা কাঁচের বোতল ভাঙার শব্দে চমকে উঠলো সালমানরা। বড়োভাই একটা মদের বোতল মেঝেতে ফেলে চৌচির করে দিলো। তারপর নির্দেশের সুরে বললো, মাগী দুটোর পেটে ভাঙা বোতলের টুকরো ঢুকিয়ে ওপর থেকে নীচে ছুঁড়ে ফেলে দে।

মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই নির্দেশ পালনে ঝাঁপিয়ে পড়লো ওরা। ফিনকি দিয়ে ওঠা রক্তে ভেসে গেলো ওদের সারা শরীর। তারপর দোল মন্ডপের ছাদ থেকে পাশের ঝোপের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিলো নিথর দুটো শরীর। তারপরেই সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে নীচে নেমে এলো ওরা। ওদের সঙ্গে নামলো বড়োভাইও। সকলে মিলে অন্ধকারের মধ্যে এগিয়ে গেলো সীমান্তের ধারে কাঁটাতারের দিকে।

পরদিন সকাল হতেই গ্রাম জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়লো। এক সঙ্গে দু’দুটো মেয়ের লাশ উদ্ধার হয়েছে। ফের গ্রামে ভূতের উপদ্রব শুরু হয়েছে বলে সাত সকালেই গ্রামের মহিলারা যে যার বাড়িতে পুজো পাঠের আয়োজন করতে বসেছে। যে রকম নৃশংসভাবে মেয়ে দুটোকে খুন করা হয়েছে তাতে সাত সকালেই তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে গোটা গ্রামে। একটু বেলা বাড়তেই জিপের পর জিপ করে পুলিশ ঢুকতে আরম্ভ করলো গ্রামে। পুলিশে পুলিশে কার্যত ছয়লাপ অবস্থা গোটা গ্রামে। নাম গোত্র পরিচয়হীন এই লাশ কোথা থেকে এলো তা তদন্তে নেমে রীতিমতো কালঘাম অবস্থা পুলিশের। একের পর এক গ্রামবাসীদের জেরা করে চলেছে পুলিশের তদন্তকারী অফিসারেরা। পুলিশের অযাথা হয়রানীর ভয়ে গ্রামবাদীরা যে যার মতো ঘরের ভিত্র সিটিয়ে গিয়েছে। শেষ মাস তিনেক আগে গ্রামে লাশ পাওয়া গিয়েছিলো এক মহিলার। তারপর থেকে ভুতের উপদ্রব কিছুটা শান্ত থাকলেও ফের এই ঘটনায় মুখে কুলুপ এঁটেছেন গ্রামবাসীরা। অজানা আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে যেন সকলকে। দিনের আলোতেই আর দোল মন্ডবের রাস্তামুখো হতে চাইছেন না কেউই। পুলিশ লাশ তুলে নিয়ে যাওয়ার পর কার্যত থমথমে হয়ে গিয়েছে গোটা গ্রাম।

লাশের দপূলতে এদিন সকাল থেকে বেশ ভালোই বিক্রিবাটরা হয়েছে রতনের। দুপুর হতে না হতেই চায়ের দুধ শেষ। বাধ্য হয়ে বিকালে বোর্ড লিখে রতন দোকানের সামনে ঝুলিয়ে দিয়েছে, লিকার ছাড়া দুশ চা পাওয়া যাবে না।  এদিন সকাল থেকে লাশ নিয়ে নানা কথা শুনেছে রতনও। কিন্ত সুবিমন কাকার কথা শুনে মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছে। যে যা বলছে তা বুঝেশুনে শুধু ঘাড় নেড়ে যাওয়া ছাড়া সকাল থেকে কারো কোনও কথারই উত্তর দেয়নি সে। রতন ভালোই বুঝতে পারছে, গ্রামে আরও বড়ো কোনও ঘটনা ঘটতে চলেছে। কিন্ত সেই ঘটনা কি হতে পারে সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না সে।

এদিন সন্ধ্যের পর কার্যত ফাঁকা চায়ের দোকানে শেষ খরিদ্দার বলতে এলো খদ্দরের চাদর পরা সেই লোকটা। ল্যাম্পের আলোয় লোকটার আজকের চেহারা দেখে কেমন  যেন চমকে উঠলো রতন। চোখ দুটো দেখে মনে হচ্ছে, যেন তীব্র নেশা করে আছে। রাত জাগা শরীরের ক্লান্তি স্পষ্ট। আজ সারাদিন পর এই প্রথম রতনের চায়ের দোকানে এলো সে। লোকটা এসে বাঁশের বেঞ্চে বসতেই কোনও কথা না বলে এককাপ লিকার চা তার দিকে এগিয়ে দিলো রতন। চুপচাপ লিকার চায়ে চুমুক দিলো লোকটা।

সন্ধ্যের পর পরই ফের পুলিশ ভ্যান ঢুকলো গ্রামে। প্রায় জনা ত্রিশের পুলিশ অফিসার ও কনষ্টেবেল। রতনের চায়ের দোকানের সামনে গ্রামে ঢোকার মুখে জনা চারেক কনষ্টেবেলকে নামিয়ে দিয়ে গেলো পুলিশ ভ্যানটি। তারপর বাকিদের নিয়ে সোজা ঢুকে গেলো গ্রামের মধ্যে। লিকার চায়ে চুমুক দিতে দিতে তীঘ্ন দৃষ্টিতে কনষ্টেবেলগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলো লোকটা। রতন আড়চোখে সেটা বারবার লক্ষ্য করে নিয়েছে। রতনের বারবার মনে হচ্ছে, এই বুঝি সেই ‘অনুসন্ধান’ সিনেমার অমিতাভ বচ্চনের মতো পুলিশ কনষ্টেবেলগুলোর সামনে গিয়ে নিজের আইডেন্টটি কার্ড দেখিয়ে ধমক লাগাবে খদ্দরের চাদর পরা লোকটা। কিন্ত সেরকম কিছুই ঘটলো না। চায়ের গ্লাসটা শেষ করে ফের একটা একশো টাকার নোট রতনের হাতে দিয়ে দোকান থেকে উঠে পড়লো সে। লোকটা উঠতেই দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করলো রতন।

পুলিশে ছেয়ে নিয়েছে গোটা গ্রামটা। সেই সন্ধে সন্ধ্যার পর দুবার বিএসএফের জওয়ানরাও গ্রামে ঢুলে পায়চারি করে গিয়েছে। ভয়ে সিটিয়ে রয়েছে গ্রামবাসীরা। গ্রামে ঢোকার মুখে রতনের চা দোকান থেকে ঢিল ছোঁড়া দুরত্বে অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করে ফেলেছে পুলিশ। চারী বুটের শব্দে রাতের নিঃস্তব্ধতা বারবার খান খান করে গ্রামের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে টহল দিচ্ছে খাকি উর্দিধারীরা। একদিকে পুলিশের ভয়, অন্যদিকে ভুতের আতঙ্ক। সব মিলিয়ে সন্ধ্যের পর নেহাত প্রয়োজন না পড়লে ঘরের বের হচ্ছে না গ্রামের মানুষজন।

রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে হাতে একটা হ্যারিকেন নিয়ে দোকানে এলো রতন। বাড়ি থেকে সামান্য হাফ কিলোমিটার রাস্তা আসতে এদিন পরপর তিনবার পুলিশ আটকেছে তাকে। একগাদা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে অবশেষে দোকানে এসে ঢুকলো রতন। দোকানের পাশেই পুলিশ ক্যাম্প বসেছে। পুলিশের ওয়্যারলেস সেটের একনাগাড়ে বকবকানি কানে আসছে রতনের। দোকানের মেঝেতে বিছানা পাততে পাততে রোতিমতো বিরক্ত প্রকাশ করলো। আজ রাতে আর নিশ্চিন্তে ঘুমটাই হবে না।

বিছানা পেতে মশারির চারটে কোনা টানিয়ে শুয়ে পড়লো রতন। অন্যদিন হলে শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের দেশে চলে যেত। আজ ঘুম আসছে না। সমানে পুলিশের ওয়্যারলেস সেটের কথাবার্তাগুলো যেন কানে সিসার দানার মতো এসে বিঁধছে। আচমকা ওয়্যারলেস থেকে একটা কথা বারবার বলতে শুনলো রতন। ওয়্যারলেসে সেটের ওধার থেকে কেউ একজন একনাগাড়ে বলে চলেছে, গ্রামে জোরদার তল্লাশি চালায়ে হবে। ঝাড়খন্ড থেকে ফোন ঢুকেছে। ট্র্যাক করা যাচ্ছে না নম্বারটা। সুচ স্টপ হয়ে গিয়েছে। রড়িঘড়ি অ্যাকশান নাও। পরমুহুর্তেই এওরান্ত থেকে ভারী একটা গলায় প্রত্যুত্তর শোনা গেলো, ওকে স্যার, এখুনি ফোর্স ঢুকছে। তারপরেই ধুপধাপ করে একনাগাড়ে পায়ের আওয়াজ কানে এলো রতনের।

মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তারপরেই রতনের চা দোকানের ভাঙা দরজায় সজোরে লাথি কষালো যেন কেউ। লাফ মেরে বিছানার উপর উঠে বসলো রতন। হেঁড়ে গলায় চিতকার দিলো, কে?

দরজার ওপার থেকে ভারী গলা, দোকানের ঝাঁপ খোল, ভিতরে সার্চ করবো। তড়িঘড়ি লুঙ্গির গিঁট বাঁধতে বাঁধতে দোকানের ঝাঁপ খুললো রতন। সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড়িয়ে দুটো দশাসাই সাইজের পুলিশ কনষ্টেবেল দোকানের মধ্যে ঢুকে পড়লো। ছোট্ট দোকানের ভিতরে কোনায় কোনায় টর্চের আলো ফেলে চোখ বুলিয়ে বললো, এবার ঘুমিয়ে পড়। রাতে উঠবি না। তারপরেই বেরিয়ে গেলো তারা।

বুকের ভিতর ধুকপুক করে কাঁপছে রতনের। কোনওমতে দোকানের ঝাঁপটা বন্ধ করে ফের এসে বিছানায় শুয়ে পড়োলো।

এদিন রাতে কাঁটাতারের বেড়া টপকাবার আগে সালমা বারবার করে বারন করতে লাগলো বড়োভাইকে। একইসঙ্গে সালমান, মুস্তাফিকুর, লাল্টু আর ইমরানও বারবার নিষেধ করলো যেতে। ওপারে ভয়ঙ্করভাবে পুলিশের উতপাত শুরু হয়েছে। কটা দিন না যাওয়াই উচিত। কিন্ত কারো কথাতেই কর্নপাত করলো না বড়োভাই। সালমানকে সঙ্গে নিয়ে কাঁটাতারের বেড়া টপকানোর জন্য রওনা দিলো সে। বড়োভাইয়ের সাফ বক্তব্য, আজ শনিবার, আজ ভুতের উপদ্রব না থাকলে ওই তল্লাটে মানুষের আনাগোনা বেড়ে যাবে। ফলে সমস্ত বাধা নিষেধ অমান্য করে কাঁটাতার টপকে জঙ্গলের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলো ওরা।

প্রায় বুক সমান হলুদ খেতের আল বেয়ে বেয়ে নিঃশব্দে দোল মন্ডবের প্রায় কাছাকাছি চলে এলো সুঠাম দেহের মানুষটা। এখানে বট, অশ্বত্থ আর ঘন আমবনে ঘেরা। দিনের বেলাতেও গা ছমছম করে। ভুতের ভয়ে এই তল্লাটমুখো হয়না কেউই। প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে এই অঞ্চলের ধারে কাছে কোনও বসতিও নেই। রাতে শোনা যায়, ভুত, পেত্নী আর অশরীরি সব আত্মাদের আনাগোনা আর চিল চিতকার। নরক গুলজার করা সেই শব্দ কানে পর্যন্ত শুনতে চান না গ্রামের মানুষজন। ওইসব শব্দ শিনলেই নাকি বাড়িতে অমঙ্গল ঘটে। আজ সকালেই দুটো অচেনা মেয়ের লাশ পাওয়া গিয়েছে এখানে। তার উপর আজ শনিবার। সুঠাম শরীরের মানুষটি নিশ্চিত আজ ভুতের দেখা পাওয়া যাবেই। গ্রামে পুলিশে ছয়লাপ থাকলেও এই তল্লাট্র যেহেতু জন-মনিষ্যির বাস নেই তাই পুলিশের টহলদারিও নেই। বহু সময় পরপর একটা করে পুলিশ ভ্যান এই দোল মন্ডবের সামনের রাস্তা দিয়ে চক্কর কেটে যাওয়া ছাড়া জীবন্ত আর কারো দেখা পাওয়া এখানে দুঃস্বপ্নের। একপা, দুইপা করে হলুদের খেত ছাড়িয়ে দোল মন্ডবের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলো সুঠাম দেহের লোকটা। চারপাশে তীব্র ঝি ঝি পোকার ডাক। থেকে থেকে মাথার উপর বট অশ্বত্থের ডালের ফাঁক গলে বাদুড়ের পাখার ঝটপটানির আওয়াজ। থেকে থেকে বিচিত্র সব আওয়াজ ভেসে আসছে। ভয়ঙ্কর সেই ডাক। সারা শরীরে যেন আতঙ্কের শিহরণ জাগিয়ে দিয়ে যায়। আস্তে আস্তে ঝোপ ঝাড় ডিঙিয়ে এগিয়ে চলেছে লোকটা।

বনের আড়াল থেকে একটু একটু করে দোল মন্ডবের উঁচু চুড়াটা সবে উঁকি দিতে আরম্ভ করেছে। সেই দিকে চোখ রেখে কয়েক পা এগোতেই ভয়ে গা হাত পা বরফের মতো হয়ে গেলো তার। কি দেখছে সে! একি সত্যি! নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। মেরুদন্ড বেয়ে ভয়ের ঠান্ডা একটা স্রোত গোটা শরীরের ধমনীতে ধমনীতে কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।

মন্ডবের উপর ছাদে বিশাল লম্বা লম্বা পা ফেলে কে সত্যিকারের পায়চারি করছে। বিশাল বড়ো তার মাথা। জঙ্গলের মধ্যেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সুঠাম দেহী। ভালো করে তাকিয়ে থাকলো ওই বিশাল সাইজের অশরীরীটির দিকে। অত্যন্ত সন্তর্পনে চাদরের নীচ দিয়ে পকেটে হাত ঢোকালো। ধাতব বস্তুটির স্পর্শ নিয়ে যেন ফের শরীরের উত্তাপকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলো সে। সমানে অদ্ভুতুড়ে ওই অশীরিরি মূর্তিটি মন্ডবের ছাদে পায়চারি করে চলেছে। আর দেরী করা ঠিক নয়। একরকম পায়ে হেঁটে হেলানো একটা আমগাছে চড়লো সে। এই আমগাছের ঘন পাতায় ঘেরা ডালগুলো এঁকেবেঁকে মন্দিরের ছাদের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। প্রায় সরিসৃপের মতো চাদরটাকে গায়ের সঙ্গে পেঁচিয়ে নিয়ে আম গাছের ডালের সাথে নিজের শরীরটাকে মিশিয়ে দিতে একটু একটু করে ডাল বেয়ে মন্ডবের ছাদের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলো সে।

মাত্র কয়েক হাত উঠে আসতেই প্রায় ১০ মিনিটের মতো সময় লাগলো সুঠামদেহীর। এবারে বেশ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে অশরীরি ওই বিভতস মূর্তিটি। পা থেকে মাথা পর্যন্ত সাদা কাপড়ে ঢাকা তার। সমানে পায়চারী করছে ছাদের পূব থেকে পশ্চিমে। আমগাছের ডালের উপর শুয়ে থেকেই শরীর ছুঁয়ে নিজের হাতটা কোনওমতে পকেটে নিয়ে গেলো সে। ধাতব বস্তুটিকে বের করে নিয়ে এলো হাতের মুঠোয়। এরপর অনেকক্ষন ধরে লক্ষ্য ঠিক করে ট্রিগারে চাপ দিলো সে। অব্যর্থ নিশানা। ছোট্ট একটা শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে মাটির হাঁড়ি গেটে যাওয়ার আওয়াজ। ক্ষীণ একটা আর্তনাদের বৃথা চেষ্টা। পরমুহুর্তেই হুড়মুড় করে লম্বা সেই অশীরীরি মূর্তিটি উলটে পড়ে গেলো মন্ডপের ছাদ থেকে নীচে। সঙ্গে সঙ্গে রণপার বাঁশগুলো হুড়মুড়িয়ে একে অপরের উপর পড়ে গিয়ে রাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে দিলো। চুপচাপ গাছের ডালে শুয়ে থাকলো লোকটা। মনে মনে একটা খিস্তি আওড়ে বিড়বিড় করে বললো, রণপায় চেপে ভুত সাজার শখ মিটিয়ে দিয়েছি বানচোতের।

কিছুক্ষনের মধ্যেই অপর একটি ছায়ামূর্তি মন্ডপের নীচে মাঠের মধ্যে যেখানে সেই অশরীরি নামক লোকটার দেহ এসে পড়েছে সেখানে এসে উপস্থিত হলো। হাতে একটা ব্যাগ ঝোলানো তার। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে রীতিমতো বিচলিত সে। এদিকে সুঠাম দেহের লোকটা গাছের ডালে শুতে নিশ্চিত, দেহটাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে এখুনি। রাই আর দেরী নয়। ফের লক্ষ্য ঠিক করে ট্রিগার চাপলো সে। যেন সে নিশ্চিত ওই ব্যাগে কি আছে। এবারে  লক্ষ্য ওই লোকটার হাতে ঝোলানো ব্যাগটা। ট্রিগারে চাপ দিতেই মুহূর্তে ব্যাগে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। মনে হলো, ব্যাগের মধ্যে রাখা একসঙ্গে পাঁচটির উপর বোমা ফাটলো। গোটা গ্রামের মাটি কেঁপে উঠলো সেই বিস্ফোরণে। ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো দেহটা। তড়িঘড়ি প্রায় চিতার মতো গাছের ডাল থেকে নীচে ঝাঁপ দিলো লোকটা। একরকম দৌড়াতে দৌড়াতে ঢুকে গেলো গহীন হলুদ খেতের ভিতরে।

শেষ রাতের অন্ধকার থাকতেই বিস্ফোরণের আওয়াজে গোটা গ্রাম জেগে উঠলো। ক্রমাগত পুলিশের গাড়ির হুটারের শব্দে শোরগোল পড়ে গেলো গ্রামের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। ভোরের আলো ফোটার আগেই গোটা ঘটনা টিভির পর্দায় দেখে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো গ্রামবাসীরা। খবরে জানানো হলো, সীমান্তের কুখ্যাত মাফিয়া ডন রমজান বিশ্বাস ওরফে জয় ওরফে সম্রাট ওরফে বড়ভাই এবং তার ডানহাত সালমান শেখ নিজেদের মধ্যে মাফিয়া গোষ্ঠী স্বন্ধে আজ ভোর রাতে খুন হয়েছে।

এতো পুলিশ এর আগে আর কোনও দিন গ্রামে ঢূকতে দেখেনি রতন। পুলিশ আর বিএসএফ এদিন সকাল থেকেই গ্রামে ঝাঁকে ঝাঁকে ঢুকে গিয়েছে। এতোবড়ো ঘটনার পরেও অদ্ভূত রকমের নীরব সবাই। কেউ কোনও মুখ খুলছে না। এমনকী সকালে সুবিমল কাকা চা খেতে এসেও একটা শব্দ উচ্চারণ করলেন না । সব কিছুই কেম্ন যেন গোলমেলে ঠেকছে রতনের। ইদানীং সুবিমল কাকাও যেন আর সেই আগের মতো কথা বলতে চান না। নেহাত প্রয়োজন না পড়লে রতনের সঙ্গে কথাই বলেন না। রতনের হঠাত খেয়াল হলো, সেই খদ্দরের চাদর পরা লোকটা তো গতকাল বিকালের পর থেকে আর আসেনি। মনে মনে হেসে উঠলো সে। নিজেকে নিয়ে বেশ গর্ব বোধ হতে লাগলো। রতনের ধারনাই যে ঠিক, তা বুঝে গেছে সে। সুবিমল কাকা ঠিকই বলেছিলো, মালটা নির্ঘাত পুলিশের খোচর ছিলো।

দিনভর গ্রামের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে সমানে ছুটে বেড়িয়েছে পুলিশের একের পর এক জিপ। গত তায় থেকেই গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে বাড়িতে ঢুকে তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ। ঠিক কাকে খুঁজছে বোঝা মুশকিল। তবে এখনও পর্যন্ত গ্রামবাসীদের কাউকেই গ্রেফতার করেনি। আজ সারাটা দিন তীব্র উত্তেজনা আর আতঙ্ক বুকে নিয়ে দিন কাটলো গ্রামবাসীর। প্রত্যেকের মনে একটাই প্রশ্ন, গ্রামে বড়ো বড়ো ঘটনা চলেছে, কিন্ত কেউ আন্দাজ করে পারছে না কি ঘটতে চলেছে। কানাকানি আর ফিসফিসানি গ্রামের অলিতে গলিতে।

বিকালের রোদ কমতেই ফের ঝাঁকে ঝাঁকে পুলিশ ঢুকলো গ্রামে। গ্রামের প্রতিটি অলি গলির মধ্যে রুট মার্চ করে যাচ্ছে তারা। এমনকি যে দোল মন্ডপ এলাকায় সচারাচার পুলিশের দেখা পাওয়া যেতো না, সেখানেও এদিন বসানো হয়েছে পুলিশ পিকেট। দু দুটো পুলিশ পিকেট বসেছে ছোট্ট এই গ্রামের মধ্যে।

একরাশ ভয় আর আতঙ্ককে সঙ্গে নিয়ে ফের আরও একটা দিনের অবসান হলো। ফের সন্ধ্যে নামলো গ্রামের দূরে দিগন্তরেখায়। একে একে শুনশান হতে লাগলো গ্রামের পথঘাট। ভারি বুটের আওয়াজ আর চোঝ ধাঁধানো টর্চের আলোয় শান্ত গ্রামে যেন উত্তাপের পরশ। গ্রামের সীমানা শেষে সীমান্তের ধারে বিএসএফের টহলদারি অনেকটাই বাড়ানো হয়েছে। তবে সেটা আহামরি কিছু না। পুলিশের দেখাও এই তল্লাটে খুব একটা নেই, ফলে সন্ধ্যের অন্ধকার ঘন হতেই সীমান্ত লাগোয়া বাঁশ ঝাড়ের বনে এসে ঘাপটি মারলো লোকটা। উত্তুরে হাওয়ায় ঠান্ডাটা বেশ গায়ে লাগছে। যাতে কাশি না পায় সে জন্য রকমারি চকোলেট ভরা তয়েছে পরনের প্যান্টের পকেটে। গায়ে খদ্দরের চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে পকেট থেকে একটা চকোলেট মুখে পুরলো লোকটা। নজর রয়েছে কয়েক গজ দুরের কাঁটাতারের খোলা জায়গার দিকে। আজও যে বড়োভাই খুনের বদলা প্রতিশোধ নিতে ওতা ঢুকবে সে বিষয়ে নিশ্চিত সে। গতরাতে দুটোকে নিকেশ করেছে।। আজ বাকি তিনটেকে নিকেশ করতে পারলেই ফের ঝাড়খন্ডে।

রাত একটু বাড়তেই আচমকা কাঁটাতারের ওপারে যেন কয়েকটা ছায়ামূর্তি নজরে এলো। একরকম শ্বাস বন্ধ করে বাঁশবনের শুকনো পাতার উপর পা ফেলে ফেলে এগিয়ে যেতে থাকলো। পরপর তিনটে ছায়ামূর্তি কাঁটাতার টপকে ডগুকলো এপারে। ভালো করে অন্ধকারের মধ্যে চোখ দুটো মুছে দেখে নিলো সে। হ্যাঁ, চিনতে ভুল হয়নি। কালবিলম্ব দেরি না করে পকেট থেকে ধাতব বস্তুটা হাতে উঠিয়ে নিলো লোকটা। পরপর ট্রিগারে চাপ দিলো সে। তিনটে আওয়াজ। একটা মহিলা আর্তনাদ। তারপরই প্রায় হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে তিনটে ছায়ামূর্তি উল্টোদিকে ছুট লাগালো। বিদ্যুত গতিতে গুলি খেয়েও তারা পার হয়ে ফেলো কাঁটাতারের সীমানা।

ধুর… বলে সবে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে লোকটা। অমনি ঠান্ডা দুটো হাত ওকে জাপটে ধরলো। বজ্র কঠিন সেই হাতের শক্তি। নড়াচটার আর সুযোগ পেলো না লোকটা। চারিফিক থেকে তখন সমানে টর্চের আলো জ্বলছে আর নিভছে। ভারী বুটের শব্দগুলো যেন দৌড়াতে দৌড়াতে এসে তাকে ঘিরে ফেলে দিচ্ছে। পালাবার আর পথ নেই সেটা বুঝতে পেরেই অগত্যা বাধ্য ছেলের মতোই নিজেকে সঁপে দিলো তাদের কাছে।

জটলার আওয়াজে মাঝ রাতেই ঘুম ভেঙ্গে গেলো রতনের। বাথরুম করার জন্য বিছানা থেকে উঠে বসলো সে। কিন্ত বাইরে বের হবে ঠিক করেও শেষে ভোয়ে চেপে গেল। পুলিশগুলো আজ হঠাত  এতো শোরগোল করছে কেন! বিঝে পেলো না সে। মাঝ রাতে একটার পর একটা জিপ গ্রাম ছাড়ার শব্দ শুনতে পেলো। আস্তে আস্তে কমছে জটলার শব্দও। কোনওরকমে অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে হাতড়ে জলের বোতলটা মশারির মধ্যে নিয়ে জল খেলো। তারপর ফের বিছানায় গড়িয়ে পড়লো। বাকি রাতটা আর ঘুম হলো না রতনের। বিছানায় এপাশ ওপাশ গড়িয়েই কেটে গেলো। পুবে ফরসা দেওয়ার আগেই উঠে পড়লো। গত রাতের দোকানে রাখা বাসি বাসন পত্তর ও কাপ প্লেটগুলো ধুয়ে নিতে আরম্ভ করলো। এরপর বাইরে আলো ফুটতেই দোকানের ঝাঁপ খুললো। দোকানের ঝাঁপ খুনেই রীতিমতো চমকে উঠলো রতন। এক রাতেই যেন সব হাপিশ হয়ে গিয়েছে। দোকানের পাশে পুলিশ ক্যাম্পটা আর নেই। দুরের রাস্তায় চোখ বুলালো। ব্যাপারটা কি হলো ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না রতন। সাত সকালেই কেমন সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে ওর। খানিকক্ষন বাইরে ঘোরাফেরা করে ফের দোকানে ঢুকলো সে। দোকান ঝাঁট দিয়ে চায়ের উনুনে আঁচ বসালো।

এরমধ্যেই সূর্যের আলো উঠে গিয়েছে। মিঠে কড়া রোদ্দুর। তালপাতার পাখা দিয়ে উনুনে জোর হাওয়া দিতে লাগলো। আঁচের আগুন জ্বলে উঠতেই এবারে কটু দোকানে এসে বসলো। চায়ের জল ফরম হতে প্রায় মিনিট দশেক নেবে। এরমধ্যে দোকানে চলে এসেছেন সুবিমল কাকা। আজ যেন একটু তাড়াতাড়ি চলে এসেছেন তিনি। চিপচাপ একটা চাফর মুড়ি দিয়ে এসে বসলেন বাঁশের বেঞ্চটার উপর।

দোকানে ঢুকে রোজকার মতো খবরের কাহজটা খুললো রতন। প্রথম পাতায় চোখ রেখেই যেন ভুত দেখার মতোই চমকে উঠলো সে। হাতে ধরা কাহজটা নিয়ে ঠকঠক করে তখনও কাঁপছে রতন। কি দেখছে সে! কাগজের প্রথম পাতায় সেও লোকটার ছবি। সেই খদ্দরেরর চাদর পরা লোকটা। গ্রোগ্রাসে কোনও দিকে না তাকিয়ে পড়তে শুরু করলো নীচে লেখা খবরটা। খবরের প্রথমেই শিরোনামে রয়েছে, সীমান্তবর্তী গ্রাম থেকে পুলিশেত জালে ঝাড়খন্ডের শীর্যস্থানীয় মাও নেতা। এরপরেই লেখা রয়েছে, গত রাতে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মোবাইলের টাওয়ার ধতে পুলিশ গ্রাফতার করে ওই মাও নেতাকে। শরীরের কাঁপুনিটা যেন আরও বাড়লো রতনের। তারমানে……। আর কিছু ভাবতে পারছে না সে।

কাগজটা হাতে নিয়ে সে তাকালো সুবিমল কাকার দিকে। লাল রক্তজবার মতো হয়ে রয়েছে সুবিমল কাকার চোখ দুটো। এ চোখ আগে কখনও দেখেনি রতন। সুবিমল কাকার এই চোখের অর্থ জানে সে। অন্তত সেইটুকু বুদ্ধি তার পেটে রয়েছে। অন্যদিন হলে হয়তো কাগজটা সোজা এফিয়ে দিতো সুবিমল কাকার হাতে। আজ আর সে সেটা করলো না। রতন জানে, কাহজে নয়, সুবিলম কাকা…। আর কোনও কিছুই ভাবতে পারছে না রতন। মাথাটা মুহুর্তে যেন ভার হয়ে উঠলো। ঢপ করে নিজের টুলটার উপরে বসে পড়লচেরবাইরে তখন আঁচের আগুন নীল শিখা নিয়ে জ্বলতে আরম্ভ করে দিয়েছে।

More Stories

Categories