Prothom Kolkata

Popular Bangla News Website

রিক্সাওয়ালাও তাঁর কাছে শার্ট কিনতে আসেন ! বিবি রাসেলের উন্নতির রহস্যটা কী?

1 min read

।। প্রথম কলকাতা ।।

ছোটবেলায় মায়ের সেলাই করা কাপড় তাঁর ঠিক পছন্দ হতো না। মাত্র ১০ বয়সী মেয়ের বায়নাতে বাবা তাঁকে একটি সেলাই মেশিন কিনে দেন। সেখানেই তিনি নিজের পছন্দমত কাপড় সেলাই করতেন। রান্নাঘর থেকে হলুদ এনে কাপড়ে মনের মত রং করতেন। বর্তমানে এই ছোট্ট মেয়েটি এখন বাংলাদেশের বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার। যিনি বিদেশের মাটিতে যশ প্রতিপত্তি ছেড়ে নিজের মাতৃভূমি টানে ফিরে এসেছেন বাংলাদেশে। তিনি চান ফ্যাশন দুনিয়ায় বাংলাদেশকে চিনবে সারা বিশ্বের। এই কাজ করবে দেশেরই সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েরা। তার জন্য প্রয়োজন শুধু একটু অপেক্ষার। ইনি হলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত ফ্যাশন ফেরিওয়ালা এবং শিল্পদূত বিবি রাসেল।

বাংলাদেশের ফ্যাশন সারা বিশ্বের কাছে পরিচিতি এনে দেবে বাইরের কোন মানুষ নয়, বাংলাদেশের সাধারণ ঘরের মানুষ। এমনটাই মনে করেন বিবি রাসেল। ছোট থেকেই তাঁর ইচ্ছা ছিল ফ্যাশন ডিজাইনার হবেন। সেই ইচ্ছা পূরণে পাশে ছিলেন তাঁর বাবা-মা। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাঁর বাবাকে জানিয়েছিলেন ফ্যাশন ডিজাইনার হবেন। বাংলাদেশের মানুষ বিবি রাসেলের নাম এক ডাকে চেনেন।

তিনি পুরস্কার দিয়ে অর্জন মাপেন না। তিনি সবসময় চান দেশের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে সাথে নিয়ে দেশের মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। বিবি রাসেল সব সময় চেয়েছেন বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এবং ফ্যাশন নিয়ে কাজ করবেন। যে কোন নতুন কাজেই ছিল তাঁর অপরিসীম আগ্রহ। সব সময় নিত্য নতুন ভাবে নিজেকে আবিষ্কার করার একটা নেশা কাজ করত।

ইংরেজি সার্টিফিকেট না থাকায় লন্ডনে দুর্ভোগ

নতুন শেখার নেশায় চট্টগ্রামের মেয়ে ১৯৭২ সালে লন্ডন কলেজ অফ ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে যোগ দেন। ক্লাস শুরুর ছমাস আগেই তিনি সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর কোন ইংরেজি পাঠক্রমের সার্টিফিকেট না থাকায় ভর্তি হতে নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তিনি সেখানে ভর্তি হওয়ার জন্য অফিসে প্রতিদিন ফোন করতেন। অবশেষে কয়েকজন প্রার্থীকে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়েছিল। তিনি সেখানে বাংলাদেশের ডিজাইন ফ্যাশন কিংবা পোশাক নিয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিলেও, তাঁর কোন প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা না থাকায় অনেকগুলি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। অবশেষে তাঁকে অতিরিক্ত ক্লাসে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। ভোর চারটা থেকে উঠে সারাদিনের প্রস্তুতি নিতেন, তারপর অতিরিক্ত ক্লাস করে যখন বাড়ি ফিরতেন তখন প্রায় রাত হয়ে যেত।

বিদেশে চিঠি বিলির কাজ করেছেন

অর্থনৈতিক দিক থেকে বাবা মায়ের উপর ভরসা করেননি। বিদেশের মাটিতে তিনি চিঠি বিলির কাজও করেছেন। অথচ এইসব কথা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি তাঁর বাবা-মা। ১৯৭৫ সালে যখন গ্র্যাজুয়েট পাস করেন তখন তাঁর প্রফেসর বিখ্যাত মডেল এজেন্ট ল্যারেইন এশটনের সঙ্গে মডেলিংয়ের কাজ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু বিবি রাসেলের মনে মডেলিং এর বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না। তাঁর একটাই ইচ্ছা, ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের দিক থেকে বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর মানুষকে তিনি বিশ্বের দরবারে তুলে ধরবেন। সেদিন তিনি শুধুমাত্র ফ্যাশন জগত সম্পর্কে জানার জন্য মডেলিংয়ের কাজ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। বিদেশের বিখ্যাত নামিদামি মডেলের সঙ্গে তিনি মডেলিং করেছেন।

মডেল হিসেবে বিবি রাসেল

বাংলাদেশের ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি উচ্চতার ওই তরুণী বিবি রাসেলকে মডেল হিসেবে ফ্যাশন জগতে বেশ পরিচিতি লাভ করতে শুরু করে। সারা বিশ্বের বিখ্যাত সব ডিজাইনের সঙ্গে কাজ করেছেন। মডেলিংয়ের মধ্যে টয়োটা আর জাগুয়ারের জন্য করা কাজ ছিল অন্যতম। একবার শ্যাম্পুর মডেলিংয়ের জন্য তাঁকে সুইমিং পুলের উঁচু জাম্প বোর্ড থেকে লাফ দিতে হয়েছিল। এই কাজের জন্য তাঁকে ১০ দিন ধরে প্র্যাকটিস করতে হয়। কিন্তু এই সবে তাঁর মন টেকেনি। তিনি বারবার চেয়েছিলেন তাঁর ক্যারিয়ার তৈরি করবেন বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আর ফ্যাশন নিয়ে। তিনি যখন বিদেশের মাটিতে তাঁর সহকর্মীদের সেই কথা জানান তখন কেউ পাত্তা দেয়নি। তাকে বারংবার বলা হয়েছিল মডেলিং আর অভিনয় ভালোভাবে করতে। কিন্তু তিনি তাঁর জেদ ছাড়েননি।

দেশে ফিরে শুনতে হয় কটুক্তি

অবশেষে ১৯৯৪ সালের দেশে ফিরে আসেন। সেখানে এসে বাবা-মাকে তাঁর মনের কথা জানাতেই পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে শুনতে হয় নানান কটুক্তি। তিনি প্রায় দেড় বছর ধরে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ঘুরে রিসার্চ করেছেন। রাজশাহীর সিল্ক, কুমিল্লার খাদি, টাঙ্গাইলের কটন প্রভৃতি বিষয়গুলি তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লক্ষ্য করেন। বাংলাদেশের সাধারণ তাঁত শিল্পীদের সঙ্গে গিয়ে কথা বলেন। তাদের মনের বিশ্বাস জয় করে নেন। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত একা হাতেই তিনি সামলে চলেছেন বিবি প্রোডাকশন।

ঝুলিতে একাধিক পুরস্কার

তাঁর ঝুলিতে রয়েছে দেশ-বিদেশের প্রচুর সম্মান এবং স্বীকৃতি। পেয়েছেন বাংলা একাডেমির ‘সম্মানিত ফেলো’ এল ম্যাগাজিনের ‘বর্ষসেরা নারী’ । ২০১০ সালে ‘মনের মানুষ’ সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে নির্বাচিত হয় তখন তিনি সেখানে পোষাক পরিকল্পনা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পান। নারী জাগরণ এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে বড়সড় অবদান রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১৫ সালে বিবি রাসেলকে বেগম রোকেয়া পদকে ভূষিত করেছে।

লক্ষ্য দেশীয় সংস্কৃতিকে বাঁচাবেন

বিবি রাসেলের মত মানুষ হয়ত সারা পৃথিবী ঘুরলে হাতে গুনে কয়েক জনকে পাওয়া যাবে। যিনি বিদেশের মাটিতে চূড়ান্ত সাফল্যের গুন্ডি পেরিয়ে ফিরে এসেছেন দেশে। তাঁর লক্ষ্য একটাই, দেশীয় তাঁতিদের বাঁচানো আর তাঁর নিজের দেশকে ভালবেসে সেই দেশের সংস্কৃতি ঐতিহ্যকে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা। বর্তমানে বিবি প্রোডাকশনের নামক ব্রান্ড বাংলাদেশের গণ্ডি ছড়িয়ে আজ বিদেশেও পরিচিতি লাভ করেছে।

নিজের সমালোচনা নিজে করেন

বিবি রাসেল এমন একজন মানুষ যিনি নিজের কাজের নিজের সমালোচনা করেন। নিজের কাজের ভুল থেকে বারংবার চেষ্টা করেন উপরের দিকে ওঠার। নিজের কাজের মূল্যায়ন তার নিজের কাছেই রয়েছে। বিবি রাসেল মনে করেন তিনি খুব ভাগ্যবান। তিনি যে দেশে জন্ম নিয়েছেন সেই দেশ তাঁকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। একবার এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন ” আমি যদি মনে করি আমি সফল তাহলে সেটা ডাউন ফল”। প্রতিটি কাজের সময় সমালোচনা নিজেই করি করেন। এমনকি নিজের ছেলেদের বিয়ের সময়ও দেশীয় শিল্প জামদানি নিয়ে কাজ করেছেন।

রিক্সাওয়ালাও তাঁর কাছ থেকে শার্ট কেনেন

তিনি খুব একটা এক্সপেন্সিভ জিনিস বানান না। তার কাছ থেকে রিক্সাওয়ালারাও শার্ট কিনতে আসেন। বর্তমানে তিনি থাকেন সাধারণ একটি ভাড়া বাড়িতে, ব্যবহার করেন মায়ের গাড়ি। তিনি শুধু স্বপ্ন দেখছেন আগামী দশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ফ্যাশন জগতে সারা বিশ্বে নাম করবে। আর সেই সাফল্যের কান্ডারী ধরবে বাংলাদেশের সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েরা। বিবি রাসেল বাংলাদেশের ফ্যাশন ফেরিওয়ালা এবং শিল্পদূত।

খবরে থাকুন, ফলো করুন আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায়

সব খবর সবার আগে, আমরা খবরে প্রথম

Categories