Prothom Kolkata

Popular Bangla News Website

দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দুর্বার প্রাণশক্তি দিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন গান্ধীজি

1 min read

।। প্রথম কলকাতা ।।

“তিনি ছিলেন টাটকা বাতাসের একটা প্রবল প্রবাহের মতো, আমাদের তিনি জাগিয়ে দিলেন, গভীর শ্বাস নিলাম আমরা।” জওহরলাল নেহেরু তাঁর ‘ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে মহাত্মা গান্ধী প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে উল্লিখিত উদ্ধৃতিটি করেছেন। ভারতের রাজনীতিতে তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মহাত্মা গান্ধী বা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর উত্থান এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তাঁর নেতৃত্বে জাতীয় কংগ্রেসের ইতিহাসে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দুর্বার প্রাণশক্তি প্রদান করেন তিনি।

ভারতের জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে মহাত্মা গান্ধীর নাম। স্বাধীনতা আন্দোলন নতুন মাত্রা ও বেগ পেয়েছিল তাঁর নেতৃত্বে। তিনি ছিলেন জাতীয় জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ। স্বাধীনতার অর্থ তাঁর কাছে শুধু বিদেশী বিতরণ বা বিদেশি শাসনের অবসান নয়। আন্দোলনের একটি মুখ্য বৈশিষ্ট্য ছিল জনজাগরণ। জনজাগরণের উপর ভিত্তি করে সত্যাগ্রহ। দেশব্যাপী মানুষকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। নতুন আশা, নতুন আদর্শ মানুষের মনে তিনি সঞ্চারিত করেছিলেন, হতাশাগ্রস্ত জাতিকে উঠে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তিনি।

আরো পড়ুন : চিত্রনাট্যে ফুটে উঠেছিল দেশভাগের যন্ত্রনা, ঘটকের পরিচালনায় ছিল অস্বীকৃত ইতিহাসের গল্প

২ রা অক্টোবর ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে গুজরাটের পোরবন্দরে গান্ধীজির জন্ম। ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং ব্যারিস্টারি পাস করেন। রাজকোট ও বোম্বাইয়ে তিনি আইন ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। মামলা লড়তে ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়েছিলেন। সেখানে বর্ণবিদ্বেষ এর বিরুদ্ধে ভারতীয়দের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠান দাবিতে প্রথম সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। সত্যাগ্রহ বলতে বোঝায় সত্যের প্রতি আগ্রহ, অহিংস উপায়ে গণজাগরণ। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে এসে ভারতের জাতীয় আন্দোলনে তাঁর যোগদান। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতে ফিরে আসার পর তাঁর রাজনৈতিক গুরু গোপালকৃষ্ণ গোখলের পরামর্শে তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যোগদান করেন। আমেদাবাদে সবরমতি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন।

সত্যাগ্রহ আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। যার মধ্যে প্রথমটি ছিল বিহারের চম্পারণে কৃষকদের সত্যাগ্রহ আন্দোলন। সালটা ছিল ১৯১৭। পরের বছর গুজরাটের খেদা সত্যাগ্রহে নেতৃত্ব দিয়ে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাঁর দক্ষতার প্রমাণ দেন তিনি। এরপর আমেদাবাদে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে জাতীয় নেতা হিসেবে তিনি নিজেকে তুলে ধরতে সক্ষম হন। রাওলাট আইনের প্রতিবাদে দেশজুড়ে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন গান্ধীজী, ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৩ ই মার্চ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শুরু হয় খিলাফত আন্দোলন। তুরস্কের খলিফাকে তাঁর শাসক পদ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে ভারতীয় মুসলমানরা খিলাফত আন্দোলন শুরু করেন ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে। এই সময় গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলনের পরিকল্পনা করেন। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অসহযোগ আন্দোলন ও খিলাফত আন্দোলনকে একসঙ্গে মিশিয়ে দেন তিনি। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১ লা আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা। সরকারি খেতাব প্রত্যাখ্যান, সরকারি অনুষ্ঠান বর্জন, স্কুল-কলেজ বয়কট, অফিস, আদালত বয়কট, বিদেশী দ্রব্য বর্জন করা হয়। দেশের প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলন। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের চৌরিচৌড়ায় আন্দোলনকারী জনতা পুলিশ ফাঁড়িতে অগ্নিসংযোগ করলে গান্ধীজি আন্দোলন স্থগিত বলে ঘোষণা করেন।

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১২ ই মার্চ ৭৮ জন অনুগামীদের নিয়ে ডান্ডি অভিযান ও লবণ আইন ভঙ্গ করে আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা করেন। এই আন্দোলন সারাদেশে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছিল। বাংলা, মহারাষ্ট্র, উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে এই আন্দোলন ছড়ায় তীব্রভাবে। আন্দোলন থামানোর উদ্দেশ্যে বড়লাট আরউইন গান্ধীজির সঙ্গে এক চুক্তি করেন। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়।

এরপর গান্ধীজির সর্বভারতীয় আন্দোলনের মধ্যে রয়েছে ভারত ছাড়ো আন্দোলন। ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে শুরু হয় ভারত ছাড়ো আন্দোলন। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ৮ ই আগস্ট ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রস্তাব গ্রহণ করে কংগ্রেস। কিন্তু এরপরেই গান্ধীজি সহ সমস্ত জাতীয় নেতৃত্বকে গ্রেফতার করা হলে দেশবাসী ক্ষুব্ধ হয়। ভারত ছাড়ো আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রান্তে প্রান্তে। যার মূল মন্ত্র ছিল করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে। ইংরেজ সরকার তীব্র দমননীতির আশ্রয় নেয়। তার বিরুদ্ধে গান্ধীজি ২১ দিন ধরে অনশন করেছিলেন। অবশেষে ইংরেজ সরকার তাঁকে মুক্তি দিলে আন্দোলনের অবসান ঘটে।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গান্ধীজি ছিলেন অহিংসার মূর্ত প্রতীক, ত্যাগ ও সত্যের আদর্শে যিনি বিশ্বাসী ছিলেন। সমস্ত পরিস্থিতিতেই তিনি অহিংসা ও সত্যের উপরে নিজের বিশ্বাস অটল রেখেছেন। ভারতীয়দের মনে জাতীয়তাবাদের পরিধি প্রসারিত করে তাদের ঐক্যবদ্ধ করে গণ আন্দোলন করেছিলেন তিনি। বৈজ্ঞানিক আইনস্টাইন তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, “Generations to come will scarcely believe that such a man as this over walked earth in flesh and blood.” ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে ৩০ শে জানুয়ারি গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু ঘটে মহাত্মা গান্ধীর।

খবরে থাকুন, ফলো করুন আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায়

সব খবর সবার আগে, আমরা খবরে প্রথম

Categories