Prothom Kolkata

Popular Bangla News Website

পরিচালনা নয়, কেরিয়ারের শুরুটা ছিল অন্য খাতে, শতবর্ষ পেরিয়ে আজও অমলিন মানিক

1 min read

।।  প্রথম কলকাতা ।।

ভারত তথা বাংলার চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্ৰতিম পুরুষ সত্যজিৎ রায়। শুধু সিনেমা নয় বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। শুধু বাঙালির মনে নয় গোটা বিশ্ববাসীর মনে তাঁর একটাই জায়গা। বিশ্বের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে তাঁর নাম আগে আসবেই। একই সাথে ভারতের প্রথম সারিতে থাকা উজ্জ্বল নক্ষত্রদের মধ্যে থেকে একজন তিনি। সামনেই ১৫ অগাস্ট। স্বাধীনতার ৭৫ তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে প্রতিবারের মতোই স্মরণ করা হবে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোল আত্মত্যাগ করা বিপ্লবীদের পাশাপাশি ভারতের সেরা ব্যক্তিত্বদের। আর বিনোদন জগৎ-এ সেই সেরা ব্যক্তিত্বের তালিকায় সবার প্রথমেই আসে সত্যজিৎ রায়ের নাম।

‘পথের পাঁচালী’ থেকে শুরু করে ‘গুপি গায়েন বাঘা বায়েন’, ‘আগুন্তুক’ সহ ৩৫-র বেশি ছবি পরিচালনা করেছেন এই কিংবদন্তী শিল্পী। তবে তিনি কেবলমাত্র সেরা পরিচালকই নন, সেরা চিত্রনাট্যকার, সুরকার, লেখক, প্রযোজক এবং বিখ্যাত গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবেও ভারত তথা বিশ্বের দরবারে পরিচিত। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র আজও বিভিন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনুপ্রেরণা যোগায়। বলাই বাহুল্য তাঁর হাত ধরেই ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে শুরু হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়। শিশুদের জন্য সিনেমা হোক কিংবা স্বপ্নদ্রষ্টা ও চিন্তা-চেতনা মূলক বড়দের জন্য, বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্র নির্মাতারা আজও এই প্রতিভাবানের সামনে মাথা নত করেন।

১৯২১ সালের ২ মে কলকাতার এক বাঙালি পরিবারে জন্ম তাঁর। তবে পৈতৃক ভিটা ছিল ভারতের কিশোরগঞ্জের (বর্তমান বাংলাদেশের) কটিয়াদী উপজেলার মসুয়া গ্রামে। ছোটো থেকেই কলকাতায় পড়াশোনা। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে অর্থনীতি নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। এরপর মায়ের ইচ্ছেয় পাড়ি দেন শান্তিনিকেতনে। সেখানেই নন্দলাল বসুর কাছে শিখলেন ছবি আঁকার প্রাথমিক কলাকৌশল। বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় এর কাছ থেকে শিখেছিলেন ক্যালিগ্রাফি। এরপর ফিরে আসেন কলকাতায়।

কিছুদিনের মধ্যে জুনিয়ার ভিজ্যুয়ালাইজার হিসেবে কাজ শুরু করেন একটি ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থায়। এরপর ১৯৪৩ সালে কাজ করা শুরু করেন ডিকে গুপ্তের প্রকাশনা সংস্থা ‘ সিগনেট প্রেস ‘ এর সঙ্গে। প্রেস থেকে ছাপানো বইগুলোতে  মূলত প্রচ্ছদ আঁকার কাজ করতেন তিনি। ব্যাস একদিন এই প্রচ্ছদ আঁকার কাজ করতে করতেই ‘আম আঁটির ভেঁপু’র স্কেচ করার কাজ আসে সত্যজিতের হাতে। আর সেই গল্প পড়েই তাঁর মনে জাগে মূল উপন্যাসটি নিয়ে কাজ করার সাধ। সেখান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে শুরু করলেন চিত্রনাট্য লেখা। প্রথম চিত্রনাট্য লিখেফেলেন ‘পথের পাঁচালী’। কিন্তু ছবি নির্মাণ শেষ করতে সময় লেগে গিয়েছিল প্রায় তিন বছর। এই সিনেমা নির্মাণের টাকা-পয়সার জোগার করতে কার্যত হিমশিম খেতে হয়েছিল তাঁকে। একসময় আর কোনো উপায় না পেয়ে শেষে তিনি হাত পাতেন বেঙ্গল গভর্নমেন্টের কাছে। সরকারি ঋণের অর্থে সিনেমার বাকি কাজ শেষ হয়। অবশেষে ১৯৫৫ সালে মুক্তি পায় সত্যজিৎ তার স্বপ্নের সিনেমা ‍‍’পথের পাঁচালি‍‍’! তারপর বাকিটা শুধুই ইতিহাস।

দেশে-বিদেশে চলচ্চিত্র সমালোচকদের প্রশংসা পাওয়ার পাশাপাশি এই ছবি আর্থিকভাবেও সফল হয়। কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্টারি হিসেবে পুরস্কৃত হওয়া সহ ১১টি আর্ন্তজাতিক পুরস্কার পায় এই ছবিটি। এরপরের ছবি ‘অপরাজিত’, ‘অপুর সংসার’ সত্যজিৎ রায়কে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়।  বিশ্বের দরবারে ‘অপুর ট্রিলজি’ নামে পরিচিতি পায় এই তিন ছবি। যার মধ্যে দ্বিতীয় ছবি ‘অপরাজিত’-এর বেশিরভাগ অংশই সত্যজিৎ রায়ের নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি। এই ছবিই ইতালির ভেনিসের বিখ্যাত গোল্ডেন লায়ন পুরস্কার লাভ করে।

এরপর একে একে তিনি নির্মাণ করেন ‘পরশপাথর’, ‘জলসাঘর’, ‘চারুলতা’, ‘মহানগর’, ‘অভিযান’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘জনারণ্য’, ‘হীরক রাজার দেশ’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’, ‘আগন্তক’, ‍‍’ঘরে ও বাইরে‍‍’ এর মতো বহু বিখ্যাত ছবি। একই সাথে পরিচালনা করেছিলেন বহু ডকুমেন্টারি ফিল্ম, শর্ট ফিল্ম, ফিচার ফিল্ম সহ মোট ৩৭ টি ছবি। যার মধ্যে ১৯৬২ সালে মুক্তি পেয়েছিল তাঁর প্রথম রঙিন বাংলা ছবি ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’।

সত্যজিৎ রায় হলেন দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব যাঁকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ‘ডি লিট’ সম্মানে ভূষিত করেন। প্রথম চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে ‘ডি লিট’ পেয়েছিলেন চার্লি চ্যাপলিন। বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একজন ছিলেন তিনি। পেয়েছিলেন মোট ৩২টি জাতীয় পুরস্কার। ১৯৮৫ সালে পান ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘দাদাসাহেব ফালকে’ অ্যাওয়ার্ড। ১৯৯২ সালে দ্যা অ্যাকাডেমি অব মোশান পিকচার আর্টস অ্যান্ড সাইন্স সত্যজিৎকে সম্মানসূচক অস্কার প্রদান করে। উপমহাদেশের প্রথম নির্মাতা হিসেবে অস্কার পান তিনি। এছাড়াও তিনি পেয়েছেন দেশি-বিদেশি অসংখ্য পুরস্কার-সম্মাননা। ভারত সরকার তাঁকে প্রদান করেন দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’। ১৯৯২ সালে ২৩ এপ্রিল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর। মৃত্যুর পরেও সেই বছর তাকে মরণোত্তর আকিরা কুরোসাওয়া পুরস্কার প্রদান করা হয়। যদিও সত্যজিৎ রায়ের পক্ষ থেকে এই পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন শর্মিলা ঠাকুর।

খবরে থাকুন, ফলো করুন আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায়

সব খবর সবার আগে, আমরা খবরে প্রথম

Categories