Prothom Kolkata

Popular Bangla News Website

মাটিতে লুটিয়ে নিস্প্রান দেহ, তখনও হাতে ধরা জাতীয় পতাকা, আজও দেশ স্মরণ করে মাতঙ্গিনীকে

।। প্রথম কলকাতা।।

১৯৪২ সালের ২৯ শে সেপ্টেম্বর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়েছে দেশজুড়ে। তমলুক থানার দিকে কয়েক হাজার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে আসছেন এক বর্ষীয়ান মহিলা। পুলিশ ও মিলিটারির অবিরাম গুলি ধেয়ে আসতে শুরু হল। অবিরাম বর্ষার মতো ছুটে আসছে গুলি। ডান হাতে জাতীয় পতাকা বা হাতে বিজয় শঙ্খ নিয়ে এগিয়ে চলছেন সেই বর্ষীয়ান মহিলা মিছিলের পুরোভাগে। মুখে বলছেন “ইংরেজ ভারত ছাড়ো, করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে, বন্দেমাতরম।” গুলি এসে লাগল পায়ে, হাতের শঙ্খ মাটিতে পড়ে গেল, পরের বুলেটের আঘাতে বা হাত নেমে এলো। তখনও তিনি বলছেন, “ইংরেজ তুমি ভারত ছাড়ো।” পরের বুলেট এসে লাগল তাঁর কপালে। প্রাণহীন দেহ পড়ে গেল মাটিতে। কিন্তু জাতীয় পতাকা তখনো হাতের মুঠোতে ধরা। ইনি হলেন মাতঙ্গিনী হাজরা। যাঁর অন্য নাম গান্ধী বুড়ি। স্বাধীনতা আন্দোলনের রক্তাক্ত ইতিহাসে যে সমস্ত নারীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন মাতঙ্গিনী হাজরা।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহাযজ্ঞে যে সমস্ত নারী তাঁদের জীবন উৎসর্গ করে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন মাতঙ্গিনী হাজরা। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তমলুকের কাছে আলিনান গ্রামে ১৯ শে অক্টোবর ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে মাতঙ্গিনী হাজরার জন্ম। অত্যন্ত দারিদ্র্যের কারণে প্রথাগত শিক্ষা লাভের সুযোগ তিনি খুব একটা পাননি। খুব অল্প বয়সে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। মাত্র ১৮ বছর বয়সী তিনি বিধবা হন। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান।

স্বামীর মৃত্যুর পর শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রায় পরিত্যাজ্য হন তিনি। এসময় থেকেই সমাজের বিভিন্ন সেবামূলক কাজে তাঁর আকর্ষণ বাড়তে থাকে। একাধিকবার বসন্ত রোগ মহামারী আকারে দেখা দেয় বাংলা জুড়ে। সে সময় বসন্ত রোগীদের সেবায় প্রাণপাত করেন তিনি। এই সময় কংগ্রেস নেতা গুণধর ভৌমিকের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি হয়। আস্থা বাড়তে থাকে কংগ্রেসে। এরপর ১৯০৫ সালে স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে তিনি যুক্ত হন সক্রিয়ভাবে।

মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ অনুপ্রাণিত ছিলেন মাতঙ্গিনী হাজরা। সে কারণে তাঁর অন্য নাম ছিল গান্ধী বুড়ি। তাঁর বিপ্লবী জীবন ছিল ক্ষুরধার। ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হলে, তিনি আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগদান করেন। কাঁথি থেকে লবণ সত্যাগ্রহ শুরু হয়। তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রামের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে শুরু হয় পুলিশের অত্যাচার। মুক্তি পাবার পর আবার আন্দোলনে যোগদান তাঁর। তাই আবার তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। বহরমপুরের কারাগারে ৬ মাস তিনি বন্দি ছিলেন। মুক্তি লাভের পর নিজের হাতে চরকা কেটে খাদির কাপড় বানানো শুরু করেন। জাতীয় কংগ্রেসের সক্রিয় সদস্যপদ গ্রহণ করেন।

স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল মাতঙ্গিনী হাজরাকে। স্বামী বিবেকানন্দের একটি উক্তি “এখন থেকে আগামী পঞ্চাশ বছর তোমাদের একমাত্র উপাস্য দেবতা হবেন জননী, জন্মভূমি। তাঁর পুজো কর সকলে” তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ১৯৩৩ সালে মাতঙ্গিনী হাজরা শ্রীরামপুরে মহকুমা কংগ্রেসের অধিবেশনে যোগ দিলে পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করে। তিনি আহত হন। এই বছরেই বাংলার গভর্নর স্যার জন অ্যান্ডারসন তমলুক পরিদর্শনে এলে মাতঙ্গিনী হাজরা নিরাপত্তা রক্ষীদের এড়িয়ে তাঁকে কালো পতাকা দেখান।

১৯৪২ সালের ৯ ই আগস্ট ভারতছাড়ো আন্দোলনের ডাক দিলেন গান্ধীজি। এই বছরের ২৯ শে সেপ্টেম্বর সেদিন বিপ্লবের জোয়ার অবিভক্ত মেদিনীপুর জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্বুদ্ধ করছেন মাতঙ্গিনী হাজরা। তমলুক, মহিষাদল, সুতাহাটা, নন্দীগ্রাম থানা দখল করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে মাতঙ্গিনী হাজরা স্বেচ্ছাসেবকদের বোঝালেন গাছ কেটে ফেলে রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিতে, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিতে। পাঁচদিক থেকে এগিয়ে চলল
মিছিল।

জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে হাজার হাজার মানুষ সামিল হলেন আন্দোলনে। সকলের মুখে ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’, ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি। উত্তর দিক থেকে আসছিল মাতঙ্গিনী হাজরার দল। তমলুক থানার কাছাকাছি আসতেই পুলিশ ও মিলিটারির গুলিবর্ষণ শুরু হল। পিছিয়ে গেলেন কয়েকজন বিদ্রোহী। তাঁদের উদ্বুদ্ধ করলেন মাতঙ্গিনী হাজরা। আবার তাঁরা এগিয়ে চলতে আরম্ভ করলেন। দলের একেবারে সামনে রয়েছেন মাতঙ্গিনী হাজরা। ডান হাতে জাতীয় পতাকা বা হাতে বিজয় শঙ্খ।

এরপর একটি বুলেটে বাঁ হাতের শঙ্খ পড়ে গেল। দ্বিতীয় বুলেটে বাম হাত নেমে গেল। তৃতীয় বুলেট কপাল বিদ্ধ করে। প্রাণহীন দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কিন্তু জাতীয় পতাকা তখনও হাতের মুঠোতে ধরা। মাতঙ্গিনী হাজরার এই আত্মত্যাগ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। যেভাবে তিনি ভারত মাতাকে পরাধীনতার শৃংখল মোচন করতে আত্মবিসর্জন দিয়েছিলেন, তা তাঁর সমকালীন ও পরবর্তী সময়ে নারীদের স্বাধীনতা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছিল। আজও তাঁকে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করে ভারতবাসী।

খবরে থাকুন, ফলো করুন আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায়

সব খবর সবার আগে, আমরা খবরে প্রথম

Categories