Prothom Kolkata

Popular Bangla News Website

ডেডবডি, চারদিকে কান্না,মায়ের- ছেলের… বাংলাতেই দুর্ঘটনার কবলে ট্রেন বারবার

1 min read

|| প্রথম কলকাতা ||

এখনো পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৯, তিন থেকে বেড়ে কয়েক ঘণ্টায় ৯ এ গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আহতদের সংখ্যা গোনা হয়েছে কি? থরে থরে আহত মানুষ, চারপাশে কান্নার রোল…কিন্তু কেনো এই কান্না। দুর্ঘটনা ঘটে, এবং আচমকা ঘটে বলেই সেটাকে দুর্ঘটনা বলা হয়, কিন্তু বাংলায় এই ভয়াবহ ট্রেন অ্যাকসিডেন্ট কি নতুন? এর আগেও বেশ কয়েকবার রেলাইনের ধরে আর্ত চিৎকার উঠেছে। তার আগেও ভোট আসে, পরেও ভোট আসে। রাজ্য এবং দেশ উভয় জায়গার বাজেটে রেল নিয়ে বরাদ্দ অর্থ থাকে, ট্রেনের গতি বাড়ানোর কথা ভাবে সরকার…তার সেই ট্রেন তার আগেই হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। দুপাশ দিয়ে রক্তের দাগ লাগে। প্রশ্ন ওঠে না, কেনো হয় এসব?

গত পরশু বিকেল ৫ টা নাগাদ, উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ির কাছে দোমহনিতে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ১৫৩৬৬ আপ নিউ জলপাইগুড়ি-গুয়াহাটি বিকানের এক্সপ্রেস। ইঞ্জিনের পর থেকে বহু বগি লাইনচ্যুত, একে অন্যের উপরে উল্টে গিয়েছে কয়েকটি বগি। স্থানীয়রা যতক্ষণে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন তখন চারিদিকে হাহাকার আর কান্নার রোল। ময়নাগুড়িতে আজ সন্ধ্যা নেমেছে রক্ত, চিৎকার আর আর্ত চিৎকারের মধ্যে দিয়ে। প্রথমে মৃতের সংখ্যা ছিল ৩, পড়ে বেড়ে হয়েছে ৯। হতাহতের সংখ্যা বহু। ঘটনার পর থেকেই স্থনীয় নেতারা, সব দলের নেতারা নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, চালু হয়েছে হেল্প লাইন নম্বর, চলছে রক্ত দান শিবির…সকলেই নিজদের মতো কাজ করছেন। গতকালই উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। ঘটনাস্থলে আসছেন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী। সরকারের তরফে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হয়েছে ভাগ করে। মৃতেরা পাবে ৫ লাখ টাকা, গুরুতর আহতরা পাবেন ১ লাখ আবার কম আহতরা পাবেন ২৫ হাজার। তার থেকেও বড় কথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থেকে রাজ্য স্তরের মন্ত্রী সকলেই চাইছেন তদন্ত হবে উচ্চ পর্যায়ে। সকলেই প্রবল তৎপর। কেউ কেউ প্রাথমিক ভাবে মনে করছেন লাইন চ্যুত হয়েছে এই ঘটনা ঘটেছে, আবার বিজেপি নেত্রী প্রশ্ন তুলছেন ট্রেন কিভাবে লাইনচ্যুত হয়? সব প্রশ্ন সঠিক, সব প্রশ্নের এবং আশ্বাসের পিছনে যুক্তি আছে। কিন্তু, এই কিন্তু তুলছে আরও একাধিক প্রশ্ন।

একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক, দেখা যাক রেল নিজে লাইনচ্যুত হচ্ছে কী হচ্ছে না সেই উত্তরের আগেই বাংলায় ঘটেছে বেশ কিছু ভয়াবহ দুর্ঘটনার। প্রতিবার রোল উঠেছে কান্নার এর আর্ত চিৎকারের। তাতে কিন্তু পরের বারের দুর্ঘটনা থেমে থাকেনি, তদন্ত হয় এবং পরের বার আবার অ্যাক্সিডেন্ট হয়…

১৯৯৫ সাল, কলকাতা থেকে বেরিয়েছিল জম্মু তাওয়ায় এক্সপ্রেস, দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ৪৫ জন যাত্রী, ভয়াবহতা বোঝা যায় নিশ্চয় মৃতের হারে? ১৯৯৯, ঠিক চার বছর পরের বাংলার এক রেল দূর্ঘটনা। এখনো হয়তো সেখানের মানুষ চোখ বন্ধ করে আঁতকে ওঠেন। মাঝরাতে ভুল সিগন্যালের জন্য একই লাইনে এসে গিয়েছিল অধম অসম এক্সপ্রেস এবং ব্রহ্মপুত্র মেল। দুই ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে মৃত্যু হয়েছিল ২৮৫ জনের। ফের ২০০৭ এ লাইনচ্যুত হয় ব্রহ্মপুত্র মেল, মৃত ১, আহত ৩০ প্লাস। ২০১০, বীরভূমে বনাঞ্চল এক্সপ্রেসের সঙ্গে ধাক্কা হয় উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেসের। ২০১০ এর গ্যানেশ্বরী এক্সপ্রেস লাইনচ্যুৎ হয়। তার পরের ঘটনা তাজা এখনো মেদিনীপুরের মানুষের কাছে। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ১৫০ জন, তার থেকেও বড় কথা এখনো বহু মানুষের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি, তারা কোথায় গেলেন, আদেউ আছেন কিনা…২০১১ মালদহে গুয়াহাটি বেঙ্গালুরু কাজিরাঙা এক্সপ্রেস লাইনচ্যুৎ হয়, মারা যান ৩ জন, আহত ছড়িয়েছিল ২০০।

বিকানির এক্সপ্রেস দুর্ঘটনা নিয়ে কয়েকঘণ্টার মধ্যে কয়েক রকমের মত উঠে এসেছে। কেউ বলেছেন ট্র্যাকশন মোটর ভেঙে বিপত্তি, কেউ বলছেন লাইন চ্যুত হয়েছে এই দুর্ঘটনা, কেউ কেউ মত প্রকাশ করে বলেছেন রেলওয়ে যদি ICF কোচ এর বদলে LHB ব্যবহার করা হতো তাহলে দুর্ঘটনায় যা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এতোটা হত না বলে অনুমান করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পুরনো আইসিএফও কোচগুলির ডিজাইনই এমনভাবে করা হয়েছে যাতে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একটি বগি আরেকটির ভেতরে ঢুকে না গিয়ে উপরে উঠে যায়। কেন্দ্রীয় রেল মন্ত্রী ১৪ ঘণ্টার মাথায় বাংলায় এসে গোটা ঘটনা দেখে আরও উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত করতে দিয়ে গিয়েছেন।

তবে প্রশ্ন উঠছে, এটা মাত্র কয়েক বছরের একটা পরিসংখ্যান। শুধু বাংলাতেই এই কয়েক বছরে লাইন চ্যুত হয়েছে বহু ট্রেন? গাফিলতি কার? কেনো বারবার একই ঘটনা ঘটে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে? আর এই প্রশ্ন আবার উস্কে দিয়েছেন খোদ বাংলার বিজেপি নেত্রী। রূপা গাঙ্গুলি, তিনি নিজে সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ” ট্রেন কি নিজে নিজে লাইনচ্যুত হয়, রেল ট্র্যাক কি বাচ্চারা বোঝে? নির্বাচন সামনে, রেল নিয়ে অনেক বছর কোনো বাজে খবর হয়নি, মানুষের প্রাণ নিয়ে ছেলে খেলা।” তার নিচেই তিনি CBI তদন্তের দাবি করেছেন। রূপা দেবীর প্রথম লাইনটির সঙ্গে একেবারে সহমত, রেল কী নিজে নিজে লাইনচ্যুত হয়, আর এখানেই লাখ টাকার প্রশ্ন। ইঙ্গিত তাহলে কার দিকে দিচ্ছেন তিনি, বাংলায় এই প্রথম নয় এর আগেও বারবার লাইনচ্যুত হয়েছে ট্রেন। তাহলে কি বরাবর কোনো বিশেষ কারণে ট্রেন লাইনচ্যুত হয় বাংলায়? কেন্দ্র চালায় আবার রূপা দেবীর দল, কেন্দ্রীয় সরকার কিন্তু উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে, তার মাঝেই আচমকা কেন্দ্রীয় তদন্ত কারী সংস্থার তদন্ত কেন চেয়ে বসলেন রূপা দেবী সেটাও প্রশ্ন তুলছে নতুন করে। অন্যদিকে একেবারে এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না দেবাংশুর কথাও। তৃণমূলের যুব নেতা গতকাল একটা কথা বলেছিলেন, মান্ধাতার আমলের নীল ট্রেনের ওপর হলুদ রং করে যুবক বানানোর চেষ্টা চলে রোজ। ৩০০ কিমি গতির বুলেট ট্রেনের স্বপ্ন দেখা দেশে ৪০ কিমি গতির ট্রেন উল্টে যায়! রামের নামে ভোটের পর ভোট পার হয়, নিরাপত্তা থেকে যায় সেই তিমিরেই! সঙ্গে তিনি নিজের কিছু অভিজ্ঞতার কথাও লিখেছেন। সেই অংশ যদি বাদ দিইও, তবু কোথাও গিয়ে দুই দলের মুখের কথা এক হয়ে যাচ্ছে না? ” ভোট ” কে কার দিকে আঙুল তুলছেন সেটা কথা নয়, কথা একটাই ভোট আসে, ভোট যায়… নেতারাও মনে করছেন ঠিক এই কারণেই ঘটে দুর্ঘটনা। প্রাণ যায় মানুষের? ভোটের আগেও মানুষ মরে, পরেও মরে…কিন্তু ভোট কাদের নিয়ে হয়? এই মানুষ যাঁরা মারা গেলেন কখনো তাঁরাও ভোট দিয়েছেন, গতকাল থেকে যাঁদের মা হন্যে হয়ে ছেলেকে খুঁজছেন তারাও ভোট দেন, বেঁচে থাকলে সেই ছেলেও দেবেন। তাহলে বারবার একই ঘটনা কেনো?

খবরে থাকুন, ফলো করুন আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায়

সব খবর সবার আগে, আমরা খবরে প্রথম

Categories