Prothom Kolkata

Popular Bangla News Website

অভিষেকের মন কি বাত এবং তৃণমূল,পৃথক হওয়ার কথা নয়, আবার সমার্থকও নয়, তবে…?

1 min read

রিয়া পাত্র

|| প্রথম কলকাতা ||

রাজনীতিতে মন কি বাত বললে একজনের মুখ মনে পড়ে, তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মাঝে মাঝেই তিনি জাতির উদ্দেশ্যে নিজের মনের কথা বলেন। শুধু নিজেই বলেন কারণ ভরা সভায় বসে প্রশ্ন শুনে উত্তর দেওয়ার অভ্যেস নেই। তবে মনের কথা বলে এবার চর্চার মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দোপাধ্যায়। ঘটনার আলোচনা করার জন্য একটু পিছিয়ে যাই।

দিন কয়েক আগে কথা, রাজ্যে তখন রীতিমত তোড়জোড় চলছে গঙ্গাসাগর মেলার। মুখ্যমন্ত্রী নিজে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে এসেছেন। এদিকে বিরোধী দলগুলি বারবার বলেছে এই মুহূর্তে করোনার যা বাড়বাড়ন্ত তাতে মেলা বন্ধ থাক, সঙ্গে বন্ধ থাক নির্বাচন। সামনেই চার পুরসভার ভোট। রাজ্য সরকার নির্লিপ্ত ভাবে গোটা ঘটনার বল ঠেলে দিয়েছিল হাইকোর্টের দিকে। উত্তরে বারবার বলা হয়েছিল যা সিদ্ধান্ত নেবে হাইকোর্ট নেবে। আমাদের হাতে কিছু নেই। একদিকে বিরোধী দল, চিকিৎসকদের চিৎকার, এই গেল এই গেল রব। অন্যদিকে প্রস্তুতি। সব চলছিল। বিরোধীরা অহরহ কটাক্ষ করছেন, সরকার পক্ষ ইগনোর করছে। এসবের মধ্যেই আচমকা নিজের মনের কথা বলে বসলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দোপাধ্যায়। অভিষেক শুধু দলের সাধারণ সম্পাদক নন, তিনি ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। মেলার আগে আগেই নিজের এলাকার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে তিনি বৈঠক ডেকেছিলেন। এতদূর পর্যন্ত অতি স্বাভাবিক বিষয়। তিনি বৈঠক করেন সেখানের প্রশাসনিক আধিকারিক এবং বিধায়কদের সঙ্গে। বৈঠক শেষে বেরিয়ে একাধিক কোভিড প্রটোকলের সঙ্গেই বলেন এই পরিস্থিতিতে অন্তত আগামী দু মাস কোনো নির্বাচন হওয়া উচিত নয়। আবার পরের মুহূর্তেই যোগ করেন এটা তাঁর একান্তই ব্যক্তিগত মত। অভিষেকের এই শব্দদ্বয় ব্যবহারের কারণ আছে যথেস্ট। তিনি একটি দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড বলে পরিচিত। সেখানে তিনি আবেগে বা জনগণের কথা ভেবে এমন কিছু বলে বসলেন, তাঁর দল আক্ষকির অর্থে যার উল্টো পথে হাঁটছে সেটা হতে পারেনা। সেই কারণেই অভিষেক অতি সতর্ক ভাবে ব্র্যাকেটের মাঝে উল্লেখ করেছেন ” ব্যক্তিগত মত ” এর কথা। তবে পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে এই ব্র্যাকেটের কথা টুকু রক্ষা কবচের বদলে উপরি সমস্যা ডেকে এনেছে বলেই মনে হচ্ছে।

গত কয়েকদিনে একেবারে তুঙ্গে বিতর্ক এবং তাতে সবথেকে বেশি অংশগ্রহণ করে ফেলেছেন তাঁর দলের নেতারাই। বিতর্ক এবং সেই বিতর্কের পিছনের যুক্তি নিয়ে কটা কথা সাধারণ মানুষের মনে-মাথায় ঘুরছে। অভিষেক বন্দোপাধ্যায় অবশ্যই এবং নিঃসন্দেহে ভালো যুক্তি এবং পন্থার কথা বলেছেন। রাজ্যের এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ভোট বন্ধ করার কথা প্রত্যেকেই বলছেন। সেখানে অভিষেকের এই কথা অবশ্যই এই অসম্ভব ভালো যুক্তি, সমাজের সাধারণ মানুষ থেকে চিকিৎসক মহল তাঁর সমর্থন জানিয়েছেন। কিন্তু বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছেন এবং অবশ্যই আমার আপনার মতো সাধারণ মানুষের মনেও প্রশ্ন উঠছে কিছু। যেগুলি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অভিষেক বন্দোপাধ্যায় একটি দলের নেতা, একটি দলের প্রতীকে জনগণের দ্বারা জয়ী হয়ে এসেছেন একটি বিশেষ এলাকার কাজ করার জন্য। সেখানে তাঁর বলা কোনো কথা স্বাভাবিক ভাবেই সেই দলের কথা হিসেবে প্রকাশিত হবে। হওয়ার কথাই। আর বেশি করে প্রশ্ন উঠছে সে কারণেই।

অভিষেক বন্দোপাধ্যায় নিজের এলাকার জন্য কাজ করেন, বারবার করেন, আগেও করেছেন, পরেও করবেন। তিনি নিজের কেন্দ্রের জন্য যা পরিকল্পনা ভেবেছেন তা ইতিমধ্যেই মডেল হিসেবে উঠে এসেছে। অবশ্যই তিনি সবকিছু ভেবেছেন। তাহলে এই যে মনের কথা তিনি ডায়মন্ড হারবারে গিয়ে বললেন সেকথা কি তিনি একবারও দলের কাছে বলেছিলেন। জনগণের জন্য , মানুষের প্রাণ আগে, এই যে ভাবনা অভিষেকের সে কথা কি তিনি দলের সামনে একবারও বলেছিলেন? দলে তাঁর পজিশন সম্পর্কে সকলেই জানেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কানে তিনি কথা তুললে তা কি এড়িয়ে যেতেন মুখ্যমন্ত্রী?

আর যদি তাঁর মানুষের জন্য এতো ভাবনা, তিনি মুখ্যমন্ত্রীর থেকেও জনদরদী তাহলে তিনি কেন দলের কাছে সেই আবেদন জানালেন না। বাংলায় তো এখন তার দলই ক্ষমতায়। তারাই মেলা করাচ্ছেন,ভোটের আয়োজন করছেন। একদিকে দলের কর্মীরা সবাই তার কথা মান্যতা দিচ্ছেন। অন্যদিকে সেই ভোট হচ্ছে, সেই মেলা হচ্ছে। এদিকে অভিষেকের বক্তব্যের পর একপ্রকার চিন্তায় পড়ে গিয়েছে তৃণমূল দল। কোনো ছোটখাটো নেতা হলে ম্যানেজ দেওয়া যেতো। কিন্তু তিনি অভিষেক বন্দোপাধ্যায়, ড্যামেজ কন্ট্রোলের জন্য ভাবতে হচ্ছে অনেক। এই যে প্রশ্ন উঠছে অভিষেক এই কথা দলের সঙ্গে আলোচনা করেননি কেনো? তার উত্তরে তৃণমূলের নেতারা ভেবে চিন্তে বলছেন, অভিষেক বলছেন তো এটা নিজের কথা, অনেকেই আবার বলছেন সাংসদ এই কথার মাধ্যমে নাকি উত্তরপ্রদেশ সহ ৫ রাজ্যের ভোটের কথা তুলে ধরতে চেয়েছেন। অনেকেই আবার যুক্তি দিচ্ছেন অভিষেক মনে মনে এই কথা ভাবার আগেই সরকার এবং কোর্ট সিদ্ধান্ত দিয়েছে এবং নিয়েছে। মেলা হবে, ভোট হবে। অনেকেই বলছেন অভিষেক বলেছেন বলেছেন, কিন্তু আসল কথা তো মমতা ঠিক করেন সবকিছু।

যেখানে নেতার কথায়, বিশেষ করে দলের সেকন্ড ইন কম্যান্ড এর মন্তব্যে গোটা দল এভাবে ধোঁয়াশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে বিরোধী দলের কোর্টে বল থাকবেই। দিলীপ ঘোষ বলছেন “যতসব চালাকির রাজনীতি! চালাকির রাজনীতি চলছে এখানে। অভিষেকবাবু তাঁর ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করে বলছেন ভোট হওয়া উচিত নয়, আর তাঁর পিসি ভোট করাচ্ছেন। আসলে লোকের মনও রাখবেন! আর ভোটও খোয়াবেন না! ফাঁকতালে কারচুপি করে ভোট টা করাতে হবে।” তাঁর এই কথাও কিন্তু একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সত্যি তো বারবার একই কথা উঠছে, অভিষেক এতো ভালো একটা সিদ্ধান্ত ভাবলেন, যে ভাবনাকে কুর্নিশ করছে সকলে, তিনি একবার সেই ভাবনা দলের সামনে রাখতে পারতেন না? সেই ভাবনা কার্যকরী করতে পারতেন না বাংলায়। এই ক্ষমতা তার হাতে আছে বলেই কিন্তু প্রশ্ন জোরালো হয়েছে বেশি করে। একথা অভিষেক ছাড়া অন্য কেউ বললে এতোটা জলঘোলা হত না নিশ্চিত। আরও বহু মানুষ সংক্রমিত হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যেতেন। বহু মানুষ প্রাণে বাঁচতেন। কোথাও গিয়ে অধীর চৌধুরী যে বলেছেন, অভিষেক প্রহ্লাদ হতে চাইছেন, সেটাই ঠিক হয়ে যাচ্ছে না তো।

তবে অভিষেক প্রহলাদ হলেন কী হলেন না সেটা দেখার তর সয়নি অনেকের। একে তো বিরোধীরা কোর্টে বল পেয়েছে, তার মধ্যেই শাসক দলে অভিষেকের বক্তব্য নিয়ে নিজেদের মধ্যে শুরু করেছে বিবাদ। তাতে একেবারে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে দলের ভেতরের অন্তর্দ্বন্দ্ব। অভিষেক নিজের এলাকা ডায়মন্ড হারবারকে মডেল বানাতে চাইছেন বা তাঁর কাজে মডেল হয়ে যাচ্ছে, একদল তাতে সাধু সাধু করলেন, অন্যদিকে বর্ষীয়ান নেতা কল্যাণ ব্যানার্জি মুখ ফস্কে বলে বসলেন তার চোখে তৃণমূলের নেতা একজন আর তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ব্যাস, অন্য পক্ষ ততক্ষণে জন সমক্ষে যুক্তি আর শৃঙ্খলা ভঙ্গ কমিটির পার্থ চ্যাটার্জীকে নিয়ে হাজির। আর শাসক দলের এই ডায়মন্ড ক্ল্যাশের ফায়দা তুলতে চাইবে না এমন বিরোধী দল নিশ্চয় নেই, অন্তত বাংলায় নেই। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী ইতিমধ্যে গ্যারান্টি দিয়ে বলে দিয়েছেন, এবার তৃণমূলে অভিষেক আর মমতা, দই গোষ্ঠী প্রকাশ পাবেই। যুক্তি হিসেবে তিনি বেশ কয়েকটি লাইন বলেছেন, তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল কথা বলতে ভালোবাসা মুখ্যমন্ত্রী এই গোটা ডায়মন্ড হারবার মডেল এবং এই বিতর্ক নিয়ে চুপ করে আছেন কেন। কেন তিনি কিছু বলছেন না? তার থেকেও বড় প্রশ্ন, তৃণমূলে কি সত্যি মমতার মদত ছাড়া অভিষেকের দিকে আঙুল তোলার সাহস আছে কারো? এই জায়গায় সত্যি থেমে যেতে হয়, এবং একটু ভাবতে হয়। গোটা মমতা জামানার দিকে চোখ মেলে তাকালেই কিন্তু স্পষ্ট দেখে যাবে একটা ছবি, তৃণমূল এবংব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, একে অপরের সমার্থক। তার থেকেও বড় কথা তৃণমূলে এই বিবাদ, এত বিতর্ক তা তো মমতার অভিষেককে আগলে রেখে সামনে এগিয়ে দেওয়ার নীতির জন্যই। মুকুল থেকে শুভেন্দু মমতার পাশ থেকে একে একে সরে গিয়েছেন কেন? কারণ মাঝ খানে দাঁড়িয়ে ছিলেন অভিষেক। আজ অভিষেক ব্যানার্জী না থাকলে কিন্তু মুকুল রায় বিজেপিতে যেতেন না, শুভেন্দুও না। এখন সেই অভিষেক যখন রাজনীতিতে পরিনত হয়েছেন, এবং এই সময়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে কেন্দ্র করে একেবারে অযাচিত বিতর্ক হচ্ছে তাহলে কেন শক্ত হাতে হাল ধরছেন না মমতা? তাহলে কি অভিষেক আর তৃণমূল এক থাকছে না, নাকি অভিষেক আর তৃণমূল সমার্থক হওয়ার প্রস্তুতি পিরিয়ড এটা… যেটা অধীর চৌধুরী দাবি করছেন।

খবরে থাকুন, ফলো করুন আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায়

সব খবর সবার আগে, আমরা খবরে প্রথম

Categories