Prothom Kolkata

Popular Bangla News Website

স্বাধীনতার ৫০ বছর: মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সামরিক কৌশলে মাত্র ১৩ দিনে পিছু হটে পাকিস্তান

1 min read

।।প্রথম ভারত।।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার এবার গোল্ডেন জুবিলি। পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দেশের স্বাধীনতা পাওয়ার ইতিহাসে আজকের (৩ ডিসেম্বর) দিনটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে রয়েছে। একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্ব শুরু হয়েছিল আজেকর দিনেই। পঞ্চাশ বছর আগে ৩ ডিসেম্বরের পর মাত্র ১৩ দিনের মধ্যেই ঢাকায় পাকিস্তানি সেনার আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে অবসান হয় পাক শাসন। পৃথিবীর সামরিক ইতিহাসে এতো বড় মাপের কোনও যুদ্ধ এতো অল্প সময়ে নিষ্পত্তির নজির প্রায় নেই বললেই চলে। কীভাবে আর কোন সামরিক কৌশলে সম্ভব হয়েছিল সেটি? আর সেই চূড়ান্ত বিজয়ে মুক্তিবাহিনীই বা কীভাবে অবদান রেখেছিল? দিল্লিতে ভারতীয় সেনা সদর দফতর থেকে তাদের বাহিনীকে কী নেতৃত্ব ও নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল? এই সব তুলে ধরতেই ইতিহাসের সরণি বেয়ে এবার ডুব দেওয়া যাক।

১৯৭১ সালের নভেম্বর থেকেই ভারত দিনাজপুর সীমান্তে ট্যাঙ্ক আর সেনা সমাবেশ শুরু করে। তাদের সঙ্গে ছিল মুক্তি বাহিনী। বর্ডার থেকে মাত্র ছ’কিলোমিটার দূরে জেলা শহরটির দখল তখন ছিল পাক সেনাদের হাতে। অথচ পূর্ব পাকিস্তানে এত বড় মাপের যুদ্ধের পরিস্থিতি এর কয়েক মাস আগেও ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করেই রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তান সেনা ভয়াবহ আক্রমণ শুরু করে সাধারণ মানুষের উপর। তার ফলেই তৈরি হয় যুদ্ধ পরিস্থিতি।

জেনারেল স্যাম মানেকশর ভূমিকা


১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর বিকেল। হঠাৎ করেই ভারতের তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল স্যাম মানেকশর একটি টেলিফোন আসে ভারতের ইস্টার্ন আর্মির চিফ অফ স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জ্যাক জ্যাকবের কাছে।জেনারেল জ্যাকবকে সেনাপ্রধান মানেকশ বলেন, ‘পাকিস্তানী বিমান থেকে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে এয়ারফিল্ডগুলোতে বোমাবর্ষণ করা হয়েছে।’ সে সঙ্গে মানেকশ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে অবহিত করার জন্য জেনারেল জ্যাকবকে পরামর্শ দেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তখন কলকাতা সফরে এসে রাজভবনে অবস্থান করছিলেন। এরপর মানেকশর পরামর্শ মতোই এগিয়ে চলে ভারত।

পাকিস্তান দেশের মাটিতে বোমা ফেলেছে, এই খবর শোনার পরও ভারতীয় সেনা কর্মকর্তারা মোটেও উদ্বিগ্ন হলেন না। বরং ভাবটা এমন দেখালেন যে, এ ধরণের একটি সংবাদের জন্যই তাঁরা অপেক্ষায় ছিলেন। ‘স্যারেন্ডার অ্যাট ঢাকা’ বইতে জেনারেল জ্যাকব লিখেছেন, ‘এই খবর পাওয়ার পর অরোরা (জগজিৎ সিং অরোরা) ছিলেন খুবই উৎফুল্ল। তিনি তার এডিসি-কে মেস থেকে এক বোতল হুইস্কি আনার নির্দেশ দিলেন। আমরা বুঝে নিলাম যে আগামী বেশ কিছুদিন আর বিশ্রামের সুযোগ পাওয়া যাবে না।’এই সেই জেনারেল জ্যাক জ্যাকব, যাঁর রণকৌশলে মাত্র ১৩দিনেই লেজ গুটিয়ে বাংলাদেশ ছেড়েছিল পাকিস্তান।

এরপর ৩ ডিসেম্বর থেকে বকলমে বাংলাদেশের হয়ে শুরু হয়ে যায় ভারত-পাকিস্তান সর্বাত্মক যুদ্ধ। মাত্র ১৩ দিনের যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় পাকিস্তান। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ভারতের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আর মিশ্রর নেতৃত্বে সৈন্যরা ঢাকায় প্রবেশ করে। এ সময় ঢাকার বাসিন্দারা তাঁদের স্বাগত জানায়। যদিও এর আগে থেকেই ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পশ্চিম সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করে দেয়। যার ফলে পরিস্থিতি এমন হয়েছিল, যে কোনও সময় দুই দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। আর এই আশঙ্কা করা হচ্ছিল ডিসেম্বরের বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই। ভারতের কাছে যুদ্ধে জড়ানো ছিল সময়ের ব্যাপার।

বলতে গেলে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানী বাহিনী ঢাকায় গণহত্যা চালানোর পরই যুদ্ধের বাতাবরণ প্রস্তুত হয়ে যায়। এর কয়েক মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে প্রায় এক কোটি শরণার্থী সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে অবস্থান নেয়। প্রকৃতপক্ষে তখন থেকেই ভারত পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে জড়িয়ে যায়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হবার এক সপ্তাহের মধ্যেই ভারতের স্বীকৃতি চেয়ে চিঠি দেন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। কিন্তু কৌশলগত কারণে ভারত ছিল তখন সাবধানী।

যদিও বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার ভারতের মাটিতে বসেই পরিচালিত হতো। এতে ভারত সরকারের সর্বাত্মক সহায়তাও ছিল। শুধু তাই নয় মুক্তিযোদ্ধারাও প্রশিক্ষণ নিয়েছে ভারতের মাটিতেই। তাঁদের সমস্তরকম অস্ত্র সরবরাহ করেছে ভারত। পাকিস্তানী বাহিনীর গণহত্যা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে বোঝানোর জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জুন মাস থেকে বিভিন্ন দেশে সফর শুরু করেন। পাক সেনা কী ভাবে গণহত্যা চালাচ্ছে এবং এর ফলে ভারত কী ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সে বিষয়টি বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানের কাছে তুলে ধরেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। প্রকৃতপক্ষে, সেসব সফরের মধ্য দিয়ে মিসেস গান্ধী পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপের ভিত্তি তৈরি করেন।

যুদ্ধ নিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর ইঙ্গিত


১৯৭১ সালের ২৪ মে, লোকসভায় নিজের বক্তব্যে মিসেস গান্ধী বলেন, ‘যে বিষয়টিকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসাবে বর্ণনা করা হচ্ছে, সেটি ভারতেরও অভ্যন্তরীণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ সে সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান থেকে যাওয়া শরণার্থীদের কথা উল্লেখ করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘ভারতের ভূমি ব্যবহার করে এবং ভারতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে পাকিস্তান তাঁর সমস্যা সমাধানের করতে পারে না। এটা হতে দেওয়া যায়না।’ ইন্দিরা গান্ধীর সেই মূল্যবান ভাষণ ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসের ওয়েবসাইটে নিবন্ধ করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘সীমান্তে পাকিস্তানের সঙ্গে সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে।’ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সঙ্গেও হোয়াইট হাউজে বৈঠক করেন মিসেস গান্ধী। সেখানে ইন্দিরা গান্ধীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘ভারত পাকিস্তানকে আক্রমণ করতে পারে কি না?’

জবাবে ইন্দিরা গান্ধী সাফ জানিয়ে দেন, ‘আমি আশা করি ভারত সেটা করবে না। আমরা সবসময় শান্তির পক্ষে। আমরা আলোচনায় বিশ্বাস করি। তবে একই সঙ্গে আমরা আমাদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলতে পারি না।’ সে সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী বেশ জোর দিয়েই বলেন, ‘পাকিস্তান আর আগের মতো হবে না।’ তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশে যা ঘটছে সে ব্যাপারে ভারত চোখ বন্ধ করে রাখতে পারে না।’

কিসিঞ্জারের চীন সফর – গেম চেঞ্জার


এরই মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ ও অস্থিরতা ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। একদিকে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এক কোটি শরণার্থীর চাপ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, এই দুটো কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করতে থাকে। এদিকে, পাকিস্তান সরকারের মনে এই আশংকা বরাবরই ছিল, ভারত যে কোনও সময় পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে। পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের অন্যতম উপদেষ্টা জি ডব্লিউ চৌধুরীর মতে জুলাই মাসেই পাকিস্তান সরকার জানতে পারে যে ভারত সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, মার্কিন বিদেশমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের গোপনে চীন সফর। পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সুসম্পর্ক ছিল। ইয়াহিয়া খানের উপদেষ্টা মি. চৌধুরী তাঁর ‘লাস্ট ডেইজ অব ইউনাইটেড পাকিস্তান’ বইতে লিখেছেন, হেনরি কিসিঞ্জার গোপনে চীন সফরে যাবার পথে রাওয়ালপিন্ডিতে গিয়েছিলেন। কিসিঞ্জার চীন থেকে ওয়াশিংটনে ফিরে যাবার পরে আমেরিকায় নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে বলেছিলেন, ‘ভারত যদি পূর্ব পাকিস্তানের আক্রমণ করে তাহলে চীন হস্তক্ষেপ করবে।’

ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি


হেনরি কিসিঞ্জারের চীন সফরের পরেই ইন্দিরা গান্ধী বেশ বিচলিত হয়ে ওঠেন। এর এক মাস পরেই ভারত-রাশিয়া (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) মৈত্রী চুক্তি সম্পাদিত হয়। জি ডব্লিউ চৌধুরীর বর্ণনায় ভারত-রাশিয়া (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) মৈত্রী চুক্তির পরেই পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। তিনি লিখেছেন, ‘রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের চুক্তির পরেই পাকিস্তানের সামরিক সরকার বুঝতে পারে যে, ভারতের সঙ্গে একটি যুদ্ধ আসন্ন এবং সে যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হবেই।’

এদিকে, ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে সোভিয়েতের সঙ্গে ভারতের মৈত্রী চুক্তি ভীষণ চিন্তায় ফেলে দেয় আমেরিকাকে। তখন আমেরিকার বিদেশমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এই মৈত্রী চুক্তিকে ‘বোম্বশেল’ হিসাবে বর্ণনা করেন। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন চুক্তিকে দায়ী করেন মি. কিসিঞ্জার। ‘হোয়াইট হাউজ ইয়ারস’ বইতে মি. কিসিঞ্জার লিখছেন, ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতকে থামাতে পারত। কিন্তু তারা সেটা করেনি। প্রকৃতপক্ষে মৈত্রী চুক্তির মাধ্যমে সোভিয়েত যুদ্ধকে উসকে দিয়েছে।’ কিসিঞ্জার লিখেছেন, ‘১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানের সীমান্ত রেখা অতিক্রম করে ভেতরে ঢুকেছিল বলে ইন্দিরা গান্ধী স্বীকার করেন। একাজ ভারত একবারই করেছিল বলে মিসেস গান্ধী বলেছেন।’

কিসিঞ্জারের মতে, মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনের কারণেই ভারত সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে সাহস দেখিয়েছে। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে যায় ভারত। এরপর ৬ ডিসেম্বর ভারতের পার্লামেন্টে দেওয়া এক বিবৃতির মাধ্যমে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেন। এর ঠিক দু’দিন পর, অর্থাৎ ৮ ডিসেম্বর ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ এক রেডিও ভাষণে বলেন, ‘আমাদের যোদ্ধারা এখন ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করছে এবং তাঁদের রক্ত আমাদের রক্তের ধারার সঙ্গে মিশে গিয়ে আমাদের মাটিতে বইছে।’ সেই ভাষণে তাজউদ্দিন আহমেদ ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন। ভারত যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে যাবার পরে মিত্র বাহিনী গঠন করা হয়। এরপর কয়েকদিনের মধ্যেই যশোর, খুলনা, নোয়াখালী অতিদ্রুত ভারতীয় সেনা এবং মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পাক বাহিনীর পরাজয় তখন শুধুই সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ১৪ই ডিসেম্বর মধ্যে ঢাকার কাছে পৌঁছে যায় মিত্রবাহিনী । এদিকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ যতই এগিয়ে যাচ্ছিল, পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ততই বেড়ে চলছিল। রণকৌশল প্রশ্নে একেক জনের মত ছিল একেক রকম।

১৯৭১ সালের যুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যেসব বই লিখেছেন, সেখানে একজন আরেকজনের উপর দোষ চাপিয়েছেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর চীফ অব জেনারেল স্টাফ ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল গুল হাসান খান। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের আগের মাসগুলোতে সেনা হেডকোয়ার্টার যেন অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। পাকিস্তানের তৎকালীন শীর্ষ এই সামরিক কর্মকর্তা ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ঘটনা প্রবাহ নিয়ে ‘মেমোরিজ অব গুল হাসান খান’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন। যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘জেনারেল নিয়াজি কখনও মনে করতেন না যে, ভারত সরাসরি পাকিস্তানকে আক্রমণ করতে পারে।’

তিনি লিখেছেন, ‘আমি অনুভব করলাম যে, আমরা কেউ কারও কথা বুঝতে পারছি না। ভারত পাকিস্তানকে আক্রমণ করবে না- এ রকম আশ্বাস তাঁকে কে দিয়েছে আমার জানা ছিল না।’ যুদ্ধের নীতি ও কৌশল সম্পর্কে পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তারা কতটা অন্ধকারে ছিলেন সেটির ধারণা পাওয়া যায় মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলির বর্ণনা থেকে। ১৯৭১ সালে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছিলেন এবং সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে বেসামরিক প্রশাসনের দেখাশোনা করেছেন। জেনারেল রাও ফরমান আলি লিখেছেন, ‘ভারতীয়দের আক্রমণের খবরটিকে ‘ঠাট্টা’ বলে মনে করেছিলেন সেনা গোয়েন্দা সংস্থার (আইএসআই) প্রধান।

তৎকালীন পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের অন্যতম উপদেষ্টা জি. ডব্লিউ চৌধুরী লিখেছেন, ‘ভারতের পক্ষে সুপার পাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) সবদিক থেকে সহায়তা করেছিল। অন্যদিকে পাকিস্তানের পক্ষে আমেরিকা এবং চীন শুধু নৈতিক সমর্থন দিয়েছিল। এই দুই দেশের কাছ থেকে পাকিস্তান কোনও সামরিক সহায়তা পায়নি।’ তাঁর মতে, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানকে পরাজিত করার পর ভারত এই উপমহাদেশে একটি আধিপত্যবাদী ভূমিকা পালন শুরু করে। তবে বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদানের জন্য ভারতের ভূমিকাকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে আসছে গোটা বাংলাদেশ।স্বাধীনতাযুদ্ধে অবদানের জন্য ২০১২ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা জানানো হয় ৮৩জন বিদেশি নাগরিককে, যাঁদের মধ্যে ৩১ জন ছিলেন ভারতীয়। ইন্দিরা গান্ধীকে মরণোত্তর সম্মাননা জানানোর মধ্য দিয়ে সেই আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল।

আপডেট থাকতে ফলো করুন আমাদের ইউটিউব , ফেসবুক, ট্যুইটার

সব খবর সবার আগে, আমরা খবরে প্রথম

Categories