Prothom Kolkata

Popular Bangla News Website

২৬/১১ মুম্বই হামলা: ফিরে দেখা হামলার তেরো বছর

1 min read

।।সৌম্য বাগচী।।

কেটে গিয়েছে বারোটি বছর। ২০০৮ সালের ২৬/১১ সন্ত্রাসী হামলার আজ ১৩তম বার্ষিকী। সেই দিনটিতে দেশের আর্থিক রাজদানী মুম্বই-এ এক লহমায় শেষ হয়ে যায় ২৮ জন বিদেশি নাগরিক সহ ১৬৪ জনের প্রাণ। আহতও হন প্রায় ৬০০ মানুষ। সেদিন স্বজনহারার আর্তনাদে ভেঙে পড়েছিল বাণিজ্য নগরী মুম্বই। তছনছ হয় বহু ইমারত। রক্তাক্ত, কলঙ্কিত সে দিনটির কথা ভারত ভোলেনি, ভুলবেও না। নারকীয় সেই জঙ্গি হানার পর কেটে গিয়েছে ১২টি বছর। এবার একটু স্মৃতিচারণ করা যাক। দেখে নেওয়া সেদিনের ঘটনা আর তারপরে কী কী হয়েছে সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে।

২৬/১১, ভারতে প্রবেশ জঙ্গিদের:
লস্কর-ই-তৈবার ১০ জন জঙ্গি করাচি থেকে জলপথে নিরাপত্তা গাফিলতির সুযোগ নিয়ে সশস্ত্র অবস্থায় ঢুকে পড়ে মুম্বইয়ে। ভারতে ঢোকার সময়ে জলপথে কিছু ভারতীয় মৎসজীবীকে মেরে তাদের ট্রলার ব্যবহার করে জঙ্গিরা।

ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাসে হামলা:
মুম্বইয়ে ঢুকেই তারা এলোপাথারি গুলি চালিয়ে শুরু করে রক্তের হোলি খেলা। এখানে শেষ নয় ট্রাইডেন্ট তাজে বিস্ফোরণ চালায় সন্ত্রাসীরা। ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাস (সিএসটি) মুম্বই শহরের সবচেয়ে ব্যস্ততম রেল স্টেশন। সিএসটিতে ঢুকেই গুলি চালাতে শুরু করে দেয় থাকে পাক জঙ্গি অজমল কসাভ সহ বাকিরা। মুহুর্তে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় সব। রক্তের বন্যায় ভাসতে থাকে স্টেশন চত্বর। সেখানে মারা যান ৫৮ জন, আহত হন ১০৮ জন। অবশ্য সিএসটি স্টেশনে রেলওয়ে দফতরে ঢুকতে পারেনি সন্ত্রাসীরা। জঙ্গিদের ঢোকার চেষ্টা ব্যার্থ করে দেন রেলের নিরাপত্তাকর্মীরা।


কামা হাসপাতাল:
এরপরই লস্কর-এর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত জঙ্গিরা হামলা চালাতে থাকে মুম্বইয়ের কামা হাসপাতালে। সেখানেই সশস্ত্র অবস্থায় দেখা যায় একমাত্র ঘৃত জঙ্গি পাক নাগরিক আজমল কাসভকে। কামা হাসপাতালে নিরাপত্তাকর্মীদের গুলিতে তারা প্রাথমিক ভাবে পিছু হটলেও, পরে হাসপাতাল তাক করে গ্রেনেড ছুঁড়তে থাকে। এছাড়া পুলিশ জিপ লক্ষ্য করেও কয়েক রাউন্ড গুলি চালায় কাসভ ও অন্য জঙ্গিরা। তাদের গুলিতে সেখানেই শহীদ হন পুলিশ অফিসার হেমন্ত কারকারে, বিজয় সালাসকার ও অশোক কামতে।

লিওপোল্ড ক্যাফে:
২৬/১১-এর অভিশপ্ত রাতে সাড়ে নটা নাগাদ মুম্বইয়ের ব্যাস্ততম লিওপোল্ড ক্যাফেতে কফিতে চুমুক দিতে দিতে আড্ডা জমিয়েছিলে তখন বেশ কিছু মানুষ। আচমকা নিরীহ মানুষের ওপর সেখানে হামলা চালায় জঙ্গিরা।

তাজ হোটেলে হামলা:
মুম্বই শহরের অন্যতম গর্ব তাজ প্যালেস হোটেল। সেখানকার নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা পেরিয়ে জঙ্গিরা হামলা চালাতে শুরু করে। এলোপাথারি গুলি, গ্রেনেড হামলা, বিস্ফোরণে হোটেলে উপস্থিত অনেকেই ঢলে পড়েন মৃত্যুর মুখে।

ওবেরয় ট্রাইডেন্ট:
ওবেরয় টরাইডেন্টে হোটেলেও সেই রাতে মারণযজ্ঞে মেতে ওঠে সন্ত্রাসীরা। ঘটনাস্থলেই মারা যান ৩০ জন নিরীহ নাগরিক। তবে এনএসজি-র তৎপরতায় সেখান থেকে অক্ষত ভাবে সেদিন বার করা গিয়েছিল ২৫০ জনকে।

নারিমাল হাউস:
কোলাবার নারিমন পয়েন্টে ইহুদিদের বাসভূমিও জঙ্গিহামলার হাত থেকে বাদ যায়নি ২৬/১১-এর রাতে। সেখানে ৯ জনকে বন্দি বানায় জঙ্গিরা। এক শিশুর সামনেই তার বাবা মাকে হত্যা করে লস্কর জঙ্গিরা। পরে বেশ কয়েক ঘণ্টার প্রচেষ্টায় বাড়িটি থেকে বাকিদের উদ্ধার করতে সক্ষম হয় এনএসজি।

হামলার ব্লুপ্রিন্ট:
গোট ঘটনার তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা প্রমাণ পান, এর নেপথ্যে রয়েছে পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই- তৈবা। মূলচক্রী হিসাবে বারবার উঠে আসে জাকিউর রহমান লকভির নাম। এদিকে, মুম্বই হামলায় ৯ জন জঙ্গিকে খতম করলেও, প্রাণে বেঁচে যায় এক পাক জঙ্গি আজমল কাসভ। তার স্বীকারোক্ত থেকে জানা যায় সে পাকিস্তানের বাসিন্দা। ফলে গোটা ঘটনার নেপথ্যে পাকিস্তানের হাত থাকার প্রমাণ আরও প্রকোট হয়। যদিও পাকিস্তান তা মানতে চায় নি।

আজমাল কাসভ:
২৬/১১ হামলার একমাত্র জীবিত জঙ্গি আজমল কাসভ ছিল পাকিস্তানের ফরিদকোটের বাসিন্দা। তাকে আটক করে চলতে থাকে মামলা। কাসভ অবশ্য মামলার মোড় ঘোরানোর জন্য এক এক বার এক এক কথা বলতে শুরু করে আদালতে। সে একবার জানায় মুম্বই শহর দেখতেই সে এসেছিল, পরে জানায় বলিউডে অভিনেতা হতে চায় বলেই তার মুম্বইয়ে আগমন। প্রথম দিকে কোনও উকিলই কাসভের পক্ষে দাঁড়াতে চাননি। এরপর বোম্বে হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি জে এন প্যাটেলের নির্দেশে কাসভের হয়ে মামলা লড়েন দুই আইনজীবী আমিন সোলকার এবং ফারহানা শাহ। ২০১০ সালের ৮ জুন তাঁদের নিয়োগ করা হয়। এর আগেই অবশ্য ট্রায়াল কোর্ট কাসভকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল। নিয়োগ পাওয়ার পর সোলকার এবং ফারহানা ট্রায়াল কোর্টের আদেশ নিয়ে বোম্বে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।

কাসাভের বিরুদ্ধে মামলা চলে মুম্বই হাইকোর্টে। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর মামলা সুপ্রিমকোর্টে গেলে সেখানেও সেই নির্দেশ বহাল থাকে। অবশেষে ২১ নভেম্বর ২০১২ সালে পুণের কারাগরে কাসভের ফাঁসি হয়।

এরপর দীর্ঘ বারোটা বছর ক্ষত হলেও মুম্বই শহর সহ গোটা দেশেই দগদগে সেই ক্ষত বিরাজমান। প্রতি বছর আজকের দিনটিতে সেদিনের ঘটনায় শহীদদের স্মরণ করে তাঁদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আসছে গোট জাতি।

আপডেট থাকতে ফলো করুন আমাদের ইউটিউব , ফেসবুক, ট্যুইটার

সব খবর সবার আগে, আমরা খবরে প্রথম