টাকা ফেরালে কী লক্ষ্য সফল হবে? দ্বিধাবিভক্ত তৃণমূল

1 min read

।। রাজীব ঘোষ ।।

ত্রাণ এবং ক্ষতিপূরণ নিয়ে কোনো দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবেনা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আমপান ঘূর্ণিঝড়ের পরবর্তী পরিস্থিতিতে রাজ্যজুড়ে ত্রাণ এবং ক্ষতিপূরণের জন্য তালিকা প্রকাশ্যে আসতেই জেলায় জেলায় ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থরা ত্রান পাননি, ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে, স্বজনপোষণ হয়েছে, এই অভিযোগ উঠতে থাকে তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য, পুর প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে।

আমপান ঘূর্ণিঝড়ের ফলে দুই ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সেখানকার প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থরা ত্রাণ না পাওয়ায় কোথাও পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষকে ঘেরাও করেছে মানুষ, কোথাও তৃণমূলের নেতা কে কান ধরে উঠবস করানো হয়েছে, কোথাও পুলিশকে বিক্ষোভ থামানোর জন্য লাঠি চালাতে হয়েছে, কোথাও তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে মানুষের বিক্ষোভ আছড়ে পড়েছে।

ত্রাণ দুর্নীতির সঙ্গে দলের নেতা-নেত্রীরা জড়িত থাকায় তাদের শোকজ করেছে তৃণমূল। কাউকে সাসপেন্ড করা হচ্ছে। অনেককেই এই ক্ষতিপূরণের টাকা অন‍্যায‍্যভাবে নেওয়ায় ফেরত দিতে বলা হয়েছে। এখানেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এতে কি দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে?

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলকে বার্তা দিয়েছিলেন, কাটমানি যদি নিয়ে থাকেন তারা ফেরত দিন। এই বার্তা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধান, সদস্য থেকে পুর প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়। কাটমানি ফেরত চেয়ে মানুষ এই বিক্ষোভ শুরু করে। অনেকে টাকা ফেরাতে শুরু করেছিলেন।

ফের কিভাবে সেই টাকা ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হচ্ছে, দলের ভাবমূর্তি কি ঠিক হবে, তৃণমূলের নেতারা দ্বিধা-বিভক্ত। শাসক তৃণমূলের নেতারা যে ক্ষতিপূরণের টাকা অন্যায়ভাবে নিয়েছেন সেটা আর গোপন থাকলো না। বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস সহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রশ্ন, তারা যে অন‍্যায‍্যভাবে টাকা পেয়েছেন সেটা ফরম ফিলাপ করে স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে এফআইআর হওয়া উচিত। বলেছেন বাম পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী।

বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু বলেছেন, সরকারি টাকা যে লুট হলো সেটা তো অপরাধ। এই সব নেতাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন পদক্ষেপ করুক। এদের গ্রেপ্তার করা হোক। কেন্দ্রীয় সরকার এক হাজার কোটি টাকা দিয়েছিল ৯৫ শতাংশ লুট হয়েছে। ৫ শতাংশ টাকা কি ফিরবে? কজন টাকা ফেরত দিচ্ছেন? ক’জনের দুর্নীতি ধরা পড়েছে? সবই লোক দেখানো।

এই প্রসঙ্গে রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী এবং উত্তর ২৪ পরগনা জেলা তৃণমূল সভাপতি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেন, ভারতে একটাও রাজনৈতিক দল নেই যে স্বচ্ছতার সঙ্গে এরকম পদক্ষেপ করতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন ক্ষতিপূরণ নিয়ে দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না। তার পরেও যারা টাকা নিয়েছেন তাদের ফেরত দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। ঠিক সময়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও হবে।

দলীয় বৈঠকে ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতিপূরণ নিয়ে যারা দুর্নীতি করেছেন তাদের ছাড়া হবে না বলে কড়া বার্তা দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই বিষয়ে সুজন চক্রবর্তী বলেন, ফরম ফিলাপ করিয়ে সরকার টাকা ফেরত নিচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে এই টাকা। কার কাছে জমা থাকছে। সে টাকা পরে কি হবে। এ তো আরো বড় অস্বচ্ছতা। টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে ছিল এই ধরনের বক্তব্য।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তৃণমূলের অন্দরেও এই বিষয় নিয়ে নানা ধরনের মত জানা যাচ্ছে। তাদের অনেকেই বলছেন, তৃণমূল নেতাদের টাকা ফেরত দেওয়ার মাধ্যমে টাকা যে লুট হয়েছিল সেটাই প্রমাণিত হয়ে যাচ্ছে। এর আগে কাটমানি কাণ্ডে দলের ভাবমূর্তি যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফের সেই একইভাবে টাকা ফেরতের প্রক্রিয়ায় রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের দলীয় সাংগঠনিক পরিস্থিতি কি ভালো হবে। প্রশ্ন উঠছে তৃণমূলের অন্দরে।

এটা ঠিক দলের ভাবমূর্তি ফেরানোর জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কড়া বার্তা দিয়েছেন।পাশাপাশি এর আগেও একাধিক বার দলীয় নেতানেত্রীদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। লোকসভা নির্বাচনের পরে দলের সাংগঠনিক পরিস্থিতির পুনরুদ্ধার করতে নির্বাচন কৌশলী প্রশান্ত কিশোর কে নিয়োগ করে তৃণমূল। তারপর থেকে প্রশান্ত কিশোরের নির্দেশেই তৃণমূল কংগ্রেস সাংগঠনিকভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে শুরু করে।

প্রশ্ন উঠছে, ত্রাণ দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ ওঠার পরে প্রশান্ত কিশোরের ভূমিকা কি? পরিস্থিতি ঠিক করার জন্য কি পরামর্শ দিয়েছেন তৃণমূল নেতৃত্ব কে? তবে টিম পিকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে এই সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক। তবে নির্বাচন কৌশলী প্রশান্ত কিশোরকে তৃণমূল কংগ্রেস নিয়োগ করার পর থেকে রাজনৈতিক সাংগঠনিকভাবে সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

তার পরিকল্পনায় দিদিকে বলো এবং বাংলার গর্ব মমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ দুটি কর্মসূচি রাজ্যজুড়ে শুরু করে তৃণমূল। এই কর্মসূচি শুরু করার পরে রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভালো বলেই জানানো হয়েছে। সেখানে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রশান্ত কিশোরের কোনো ভূমিকা আছে কিনা সেই বিষয়ে প্রশ্ন তুলছে রাজনৈতিক মহল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *