আঁধার পেরিয়ে

1 min read

।। মৌমিতা তালুকদার ।।

আর পাঁচটা দিনের থেকে আজকের দিনটা “আপনজন”-এর সকলের কাছেই একটু আলাদা। বিয়েবাড়ি বলে কথা। সবাই ভীষণ রকম ব্যস্ত। হোক না রেজিস্ট্রি তবুও বিয়ে তো। আর পাত্রী তো যে সে কেউ নয়, এই “আপনজন” বৃদ্ধাশ্রমের সকলের নয়নের মণি, রিসেপশনিস্ট কাম সেক্রেটারি কাম ম্যানেজার তথা শাল্মলি। অনাথিনী মেয়েটির পরিবার এখানকার সদস্যরা। তাই তো কোমর বেঁধে মেয়ে বিদায়ের আয়োজন করতে লেগে পড়েছে দাস দিদা, বোস জেঠু, মিত্র পিসি প্রমুখরা।

যদিও শাল্মলি বিয়ের পরেও এই পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকার প্রতিশ্রুতি আগেভাগেই আদায় করে নিয়েছে হবু বর আর্যষ্মানের কাছ থেকে। “আপনজন” অবশ্য নামেই বৃদ্ধাশ্রম, আদতে বিখ্যাত শিল্পপতি শৈবালশেখর চক্রবর্তীর বসতবাড়ি। ওনার মৃত্যুর পরে বিশাল বাড়ির সতেরোখানা ঘর যেন গিলতে আসছিল বিদ্যুৎপর্ণা চক্রবর্তীকে।একাকীত্বের বোঝা হ্রাস করতে এই পরিকল্পনা।

নিজের মনের সাথে যাদের মিল হয়েছে এমন বারোজনকে নিয়ে দিব্যি দিন কাটে তার। এই বারোজনের একজন, “আপনজন”-এর চিরস্থায়ী সদস্য তথা চিরকুমার ডাক্তার, দেবার্চন ভট্টর ভাইপো আর্যষ্মান। কাকাই এর সূত্রে এখানে যাতায়াত করতে গিয়েই শাল্মলির সাথে আলাপ।এরপর ভালো লাগার বহিঃপ্রকাশ ঘটলেও শাল্মলি যেভাবে নবীন ডাক্তার আর্যষ্মানের বিয়ের প্রস্তাবকে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে দিয়েছে তাতে কাকা-ভাইপোর বিদ্যুৎপর্ণার শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। আসরে নামেন কর্ত্রী। বন্ধ ঘরে অনেক তর্কের পর শাল্মলি হার মানে।

দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে এই অনাথিনীকে যিনি আগলে রেখেছেন পরম মমতায়, অকৃত্রিম ভালোবাসায় অনাথ শব্দটা শাল্মলির জীবন থেকে অনায়াসে যে মুছে দিয়েছে তাকে একা ফেলে যেতে মন সায় না দিলেও, বিদ্যুৎপর্ণার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়। তবে শর্ত দেয় রেজিস্ট্রির আগে সবটুকু সত্যি জানাতে হবে আর্যষ্মানকে। তার পদক্ষেপই চিনিয়ে দেবে মানুষটা কেমন। আর কেউ না জানুক শাল্মলি তো জানে তার বন্ধুর জীবন পথকে মসৃণ করার কারিগর, এই ব্যক্তিত্বময়ী নারী আসলে তার এক্স শাশুড়ি মা!!

নিম্নবিত্ত পরিবারের অপরূপ সুন্দরী বিদ্যুৎপর্ণাকে রাস্তায় এক ঝলক দেখেই দ্বিগুণ বয়সী শৈবালশেখর শুধুমাত্র বাবা-মায়ের ইচ্ছে পূরণ করতে বিনা পণে এক কাপড়ে প্রায় জোর করে বিয়ে করে নিয়ে এসেছিল নিজের প্রাসাদপমো বাড়িতে। শ্বশুর ও শাশুড়ির স্নেহভাজন ছিল বিদ্যুৎপর্ণা। শৈবাল বরাবরই উচ্চাকাঙ্ক্ষী। নিজের ব্যবসায়িক সম্পত্তি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, সামাজিক অবস্থান নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক ছিল। বিদ্যুৎপর্ণার মননশীলতা, চিন্তাভাবনা বা মূল্যবোধের বিন্দুমাত্র কদর ছিল না শৈবালের কাছে।

সেই ফাঁক পূরণের জন্যই একমাত্র সন্তান তূণীরকে আঁকড়ে ধরে ছিল বিদ্যুৎপর্ণা। কিন্তু বিত্তশালী বাবার অসীম প্রশ্রয়ে আর অতুল ঐশ্বর্যের আশ্রয়ে ধীরে ধীরে তূণীর অসামাজিক কার্যকলাপে যুক্ত হতে থাকে। ব্যক্তিত্বময়ী মায়ের সাথে দূরত্ব বাড়তে থাকে। বিদ্যুৎপর্ণা কোনদিনই গলা তুলে কোমরে আঁচল জড়িয়ে পাড়া কাঁপিয়ে বাড়ির সব লোকজনকে শুনিয়ে ঝগড়া করতে পারতো না। মতের অমিল হলে বাবা-ছেলের দিকে একটা ঠান্ডা চাউনি ছুঁড়ে দিয়ে নিজের ঘরে চলে যেত।

শৈবাল আর তূণীর যথারীতি সমীহ করত এই দৃষ্টিকে, যাতে মিশে থাকত একরাশ ধিক্কার। তাই তো যেদিন শাল্মলিকে বাড়ির বৌ করার কথা ঘোষণা করল বিদ্যুৎপর্ণা, শৈবালশেখর পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেই একবারের জন্যও না বলে নি। তূণীর অনিচ্ছা প্রকাশ করতেই শান্ত স্বরে শুনিয়ে ছিল, “এ বাড়ি আমার নামে তৈরি করেছেন তোমার বাবা। তুমি মেয়েটিকে বিয়ে না করলে এই বাড়ি, সম্পত্তি তোমাকে ছাড়তে হবে। আমরা তোমাকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করব।” আর কথা বাড়ায়নি তূণীর। তবে ত্যাজ্যপুত্র তাকে হতেই হয়েছে। শৈবালের মৃত্যুর পরই ড্রাগ পাচারে অভিযুক্ত, সিঙ্গাপুরে জেলবন্দি তূণীরকে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে সব সম্পর্ক থেকে মুক্ত করে বিদ্যুৎপর্ণা। তার মাতৃত্ব যে চোখের জলে নিদ্রাহীন রাত জাগে সে কথা আর কেউ না জানলেও শাল্মলি জানে!!

প্রেগ্ন্যাসির টেস্ট রিপোর্টটা পজিটিভ আসার পরেও এতটা ভেঙে পড়ে নি শাল্মলি, যতটা তূণীরের বিয়েতে অসম্মত হওয়ায় আর গর্ভপাত করার পরামর্শে ভেঙে পড়েছে। নার্সিং পাঠরতা শাল্মলির পড়াশোনার দায়িত্ব অনাথ আশ্রমের ট্রাস্টি বোর্ড ততদিন বহন করবে যতদিন না সে নিজে উপার্জন করতে পারে। হাসপাতালেই তূণীরের সাথে শাল্মলির পরিচয়। সত্যিটা জানার পর শাল্মলি তূণীরের পরিবারের মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু টানা তিন দিন তাকে গেট থেকেই বিদায় নিতে হয়। তূণীরের নির্দেশেই দারোয়ান যে তাকে ভেতরে ঢুকতে দেয় নি একথা বুঝতে ভুল হয় না।

তবুও হাল ছাড়ে না মেয়েটা। অবশেষে ভাগ্য তার সহায় হলো। চতুর্থ দিনও গেটের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা শাল্মলির পাশ দিয়ে একটা গাড়ি প্রবেশ করে বাড়ির ভেতর। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বিফল মনোরথ শাল্মলি পথে পা বাড়ালে তাকে অবাক করে ড্রাইভার ছুটে এসে ডেকে নিয়ে গিয়ে বিশাল লাইব্রেরিতে বসায়। উল্টোদিকে বিদ্যুৎপর্ণা। বাড়ি ঢোকার পথে শ্যামলা গড়নের মায়াময় অথচ জলভরা দুচোখের মেয়েটিকে দেখে কৌতূহলী হয়ে ড্রাইভার হরিদাকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর আসে, “মা জননী, ছোটসাহেবের নেক নজরে পড়েছে। খুব ঘুরত ছোট সাহেব একে নিয়ে। সর্বনাশ হয়ে গেছে মেয়েটার। রোজ ছুটে আসে অধিকার পাওয়ার আশায়। কিন্তু ছোট সাহেব এড়িয়ে যায়।” বিদ্যুৎপর্ণার নরম সুরে কথা বলা আর মাথায় তার স্নেহের স্পর্শ পেতেই কি যেন হয় শাল্মলির। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে নিজের আর তূণীরের সম্পর্কের সব জমানো কথা অনায়াসে বলে যায়। এমনকি তূণীর যে টাকা দিয়ে সন্তান নষ্ট করার প্রস্তাবও দিয়েছিল তাও বলে ফেলে। শাল্মলির হাত ধরে সটান হাজির হয় বিদ্যুৎপর্ণা বাবা-ছেলের মন্ত্রণা কক্ষে।সোজা চার্জ করে তূণীরকে। “ভ্রূণ হত্যা মহাপাপ জানিস?

বাবার নীল রক্তে এতটাই বিষিয়ে গেছিস যে মায়ের দেওয়া শিক্ষা আর দুধের ছানা কেটে গেছে না রে?” সরাসরি আক্রমণে বিপর্যস্ত তূণীর যথারীতি আত্মপক্ষ সমর্থনে মরিয়া হয়ে উঠতেই ত্যাজ্যপুত্র হওয়ার হুমকি আসে। পরিস্থিতি বুঝতে ভুল করেন না বর্ষীয়ান শৈবালশেখর। ধুমধাম করে বিয়ে হলেও তূণীর যে এই বিয়ে মেনে নিতে পারছে না সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ ছিল বিদ্যুৎপর্ণা। আর তাই তীক্ষ্ণ নজর ছিল পুত্রবধূর প্রতি। যত্নের ত্রুটি ছিল না তবুও শেষ রক্ষা করতে পারে নি। সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে অনাগত সন্তানকে হারাতে হয়েছিল শাল্মলিকে। যদিও হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা শাল্মলি শাশুড়ি মায়ের বারংবার প্রশ্নের মুখে পড়েও একবারের জন্য বলে নি সে সত্যিই সিঁড়ি থেকে অসাবধানতা বশতঃ পড়ে গিয়েছিল নাকি তাকে ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল!

হাসপাতাল থেকেই বিবাহ বিচ্ছেদের কাগজ তূণীরের নামে বাড়িতে পাঠিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল শাল্মলি। ফিরে আসে নি বিদ্যুৎপর্ণার কাছে। শৈবাল হার্ট অ্যাটাকে নেই, শাল্মলি নেই, তূণীর জেলবন্দি! একের পর এক বিপর্যয়ের কারণে, তীব্র মাতৃত্বের যন্ত্রণাভারে একাকীত্বের বোঝা বইতে থাকা, গভীর অবসাদের শিকার হয়ে যাওয়া বিদ্যুৎপর্ণার পাশে এসে দাঁড়ায় পারিবারিক বন্ধু ও বিশিষ্ট মনোচিকিৎসক ডক্টর দেবার্চন । “আপনজন”-এর গোড়াপত্তন হয়।।

দীর্ঘ এক বছর হন্যে হয়ে খোঁজ লাগিয়ে অবশেষে শাল্মলির খবর পাওয়া যায়।পুরুলিয়ার এক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দায়িত্বে রয়েছে। বিশ্বস্ত হরিদার হাতে এক লাইনের একটা চিঠি দিয়ে পাঠায় বিদ্যুৎপর্ণা যাতে লেখা- “মায়ের বুকে ফিরে আয়।” দৃঢ়চেতা বিদ্যুৎপর্ণার বেদনা বহুল জীবন কাহিনী হরিদার কাছে শোনামাত্রই ফিরে এসেছিল শাল্মলি।পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে গিয়ে কেঁদে ভাসিয়ে ছিল। নিজের আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হওয়ার জন্য যে মা আপন সন্তানকে ত্যাগ করতে পারে সেই মা-ই আবার এক নামগোত্রহীনা অনাথিনীর জীবন গড়ার লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে কত সহজে! মাতৃত্বের এহেন বৈপরীত্যে শ্রদ্ধায় মাথা নিচু হয়ে যায় শাল্মলির।

বিদ্যুৎপর্ণার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে “আপনজন”-এর দায়িত্ব পালন করতে থাকা শাল্মলির তুমুল হর্ষধ্বনির মাঝে রেজিস্ট্রির কাজ আরম্ভ হলে শর্ত অনুযায়ী দেবার্চন এগিয়ে এসে শাল্মলির জীবনের সমস্ত ভাঙা-গড়া ব্যক্ত করেন সকলের সামনে। মুহূর্তে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে। আর্যষ্মান ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে এসে শাল্মলির হাতে হাত রেখে দৃঢ় স্বরে বলে ওঠে, “একসাথে চলার অঙ্গীকার করলাম।” রেজিস্টারের সামনে যথাবিহিত নিয়মানুসারে বিয়ে সম্পন্ন হয়।

আর্যষ্মানের আগমনে শাল্মলির জীবনে যতই বসন্তের সমাগম হোক না কেন,বিদ্যুৎপর্ণার একাকীত্ব নতুন করে তাকে ভাবিয়ে তোলে। ভেতরে ভেতরে ক্ষয় হতে থাকা মানুষটাকে চোখে চোখে রাখার প্রয়োজন যে কতটা তা শাল্মলি জানে।বিদ্যুৎপর্ণাকে খুঁজতে গিয়ে দৃশ্যটা দেখে থমকে দাঁড়ায়। দেবার্চন যত্ন করে খাবার পরিবেশন করছে বিদ্যুৎপর্ণাকে। দুচোখে গভীর প্রশান্তি নামে শাল্মলির।মনে মনে ভাবে, “জীবনের পথে চলতে থাকা দুই পথ হারানো নাবিক আজ দিকশূন্য সাগরের মাঝে একটা ছোট্ট দ্বীপ খুঁজে পেয়েছে নিজেদের জন্য।।